পিকআপ-ট্রাকে ঢাকা টু রংপুর ১ হাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:০৪ পিএম, ১২ মে ২০২১

রাজধানী থেকে ঈদযাত্রা মানেই গাবতলী টার্মিনালে উপচেপড়া ভিড়। আর হাজারো মানুষের অপেক্ষা। তবে এবারের চিত্রটা একেবারেই উল্টো। টার্মিনাল থেকে বাস না ছাড়ার কারণে এবার ভিড় দেখা যাচ্ছে মূল সড়কে। আর গাবতলী থেকে বাস না থাকায় তিনগুণের অধিক ভাড়া নিয়ে যাত্রী পরিবহন করতে দেখা গেছে ছোট-বড় পিকআপে। মালবাহী এসব পিকআপ ভ্যান ডেকে ডেকে যাত্রী পরিবহন করলেও পুলিশকে কিছু বলতে দেখা যায়নি।

বুধবার (১২ মে) দুপুরে গাবতলী থেকে ট্রাক, পিকআপ, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, সিএনজি এমনকি মোটরসাইকেলে যাত্রীদের ডেকে তুলতে যায়। সরাসরি রংপুরের বাস না থাকায় পিকআপে করে যেতে দেখা যায় যাত্রীদের।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী আমানুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আজ সকালে অফিসে হাজিরা দিয়ে ছুটি নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছি। কিন্তু গাবতলী এসে দেখি পিকআপগুলো ডাকছে রংপুর এক হাজার টাকা করে। কোনো গাড়ি না পেয়ে বাড়িতে যেতে হবে এ কারণে অনেকটা বাধ্য হয়েই এক হাজার টাকা দিয়ে উঠলাম।’

ছোট দুই বাচ্চা এবং সঙ্গে স্ত্রীকে নিয়ে রংপুরের মিঠাপুকুরের উদ্দেশ্যে যেতে মোনিমুর রহমান গাবতলী এসে অনেকক্ষণ কোনো গাড়ি না পেয়ে পিকআপে উঠবেন বলে মন স্থির করেন।

pickup-4.jpg

তিনি বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে সন্তান-স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ধানমন্ডির বাসা থেকে গাবতলীতে এসেছি। কিন্তু গাড়ি পাচ্ছি না। কেউ কেউ পিকআপে যাচ্ছে। কিন্তু স্ত্রী-সন্তান নিয়ে পিকআপে যাওয়া রিস্ক।’

করোনার মধ্যেও কেন এত ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি যাচ্ছেন- এমন প্রশ্নের তিনি বলেন, ‘করোনার মধ্যে বেতন পেয়েছি অর্ধেক। বোনাসও দিয়েছে নাম-সর্বস্ব। ঢাকায় কীভাবে থাকব, কী খাব, তাই বউ-বাচ্চা নিয়ে ঝুঁকি নিয়েই বাড়ি যাচ্ছি। এছাড়াও বৃদ্ধ মা-বাবা আমাদের পথ চেয়ে রয়েছেন। তাদের সঙ্গে ঈদ করতে পারলে সব কষ্ট পানি হয়ে যাবে।’

মফিজুল হক নামের ষাটোর্ধ বয়সের একজন গাবতলী ব্রিজের পাশে বসে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘ঢাকায় একটি সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করেন। চারদিনের ছুটি পেয়ে স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে ঈদ করতে রংপুরের কাউনিয়ায় যাবেন। কিন্তু কীভাবে যাবেন তা নিয়ে তিনি সংশয়ে রয়েছেন। এক হাজার টাকা দিয়ে যেতেই যদি হয় তাহলে ঢাকায় আসার জন্যও গুণতে হবে হাজার টাকা।’

তিনি বলেন, ‘সরকার যদি বাস চালু রাখত তাহলে আমাদের মত গরিবদের জন্য একটু উপকার হত। এক হাজার টাকা দিয়ে বাড়ি যাওয়া আমাদের জন্য অনেক কষ্টের। এরপর তো আরও খরচ আছেই।’

pickup-4.jpg

গাবতলী বাস টার্মিনালে গাড়ির জন্য অপেক্ষমাণ যাত্রী রাজীব বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে এখানে দাঁড়িয়ে আছি। শুনেছিলাম বাস না চললেও এখান থেকে মাইক্রোবাস চলে, কিন্তু আজ দেখছি মাইক্রোবাসও পাওয়া কষ্ট। মাইক্রোবাস আসা মাত্রই হুমড়ি খেয়ে পড়ছে লোকজন।’

তিনি বলেন, ‘যারা যারা বাড়িতে যাবে তারা তো যাবেই, যেকোনো ভাবেই হোক তারা যাবে। ঈদের আগ মুহূর্তে দূরপাল্লার বাস বন্ধ করে দেয়া এটা একটা বড় ভোগান্তি।’

পিকআপচালক জামিল শেখ জাগো নিউজকে বলেন, ‘সকালে কারওয়ান বাজারে মাল নামিয়ে আবার রংপুর ফিরে যাচ্ছিলাম। গাবতলী এসে দেখি হাজারো মানুষ পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। আমার হেলপার রংপুর এক হাজার বলে ডাক দিতেই মুহূর্তেই পিকআপ ভরে যায়। ২০ জনকেও যদি পিকআপে নেয়া যায় তাদেরও বাড়ি যেতে সুবিধা হলো, অন্যদিকে আমাদের মত পিকআপ ড্রাইভারদের ঈদও ভালো কাটবে।’

পিকআপে যাত্রী নিলে রাস্তায় পুলিশ চেক করে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন ঈদের সময় গাড়ির চাপ থাকে। এজন্য হয়তো চেক করে না। তবে কোথাও কোথাও চেক করে।’

pickup-4.jpg

এদিকে, আমিনবাজার সেতুর ঢাকাপ্রান্তে নিয়ম মানার যে কড়াকড়ি ছিল, সেতু পার হতে না হতেই সব ঢিলেঢালা। গাবতলীর দিকে দারুসসালাম থানার পুলিশ ও ট্রাফিক পুলিশের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মত। সেতু পার হতেই একজনকেও দেখা গেল না।

সেতুর ওপরই তিন টনের ট্রাক থামিয়ে যাত্রী তুলছিলেন চালক ও সহকারী। যাবেন কোথায় জিজ্ঞেস করতেই সহকারী এগিয়ে এসে বললেন, ‘ঘাট একদাম দুইশ। আমার চাইতে কম আর পাইবেন না।’

ট্রাকচালক হাকিম জানান, কুষ্টিয়া থেকে কাঁচামাল নিয়ে এসেছিলেন। পাটুরিয়া ঘাটে গিয়ে রাতের ফেরি ধরবেন। যে কয়জন যাত্রী তুলতে পারেন সেটাই লাভ।

আমিনবাজার সেতু পার হওয়ার পর সড়কের দুই পাশেই সারি সারি বাস, লেগুনা, কার, মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোর চালকরা ডাক দিচ্ছেন, ‘নবীনগর, বাইপাইল, চন্দ্রা’ বলে। আর আশপাশের এলাকায় যাওয়ার জন্য মানুষ রিকশা ভাড়া করছেন। তবে ভাড়া বেশি।

পিকআপ-ট্রাকে যাত্রী বহনের বিষয়ে জানতে চাইলে গাবতলী ট্রাফিকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘একদিকে রোজা অন্যদিকে ঈদে বাড়ি যাওয়ার জন্য শত শত মানুষের উপচেপরা ভিড়। কিছুটা মানবিক দিক বিবেচনা করলেও ঘরমুখো মানুষের ঈদ যাত্রায় ছাড় দেয়া দরকার। যে যেভাবে পারছে সেভাবেই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছে, তবে গাবতলী থেকে কোনো বাস ছেড়ে যাচ্ছে না বলে তিনি নিশ্চিত করেন।’

টিটি/জেডএইচ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]