ঘাটতি বাড়ছে লবণের

নাজমুল হুসাইন
নাজমুল হুসাইন নাজমুল হুসাইন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:১৩ এএম, ১৬ জানুয়ারি ২০২২
ফাইল ছবি

একটা সময় দেশে চাহিদার চেয়ে বেশি লবণ উৎপাদন হতো। পরে শিল্পখাতে লবণের ব্যবহার খুব বেশি বাড়তে থাকে। এতে চাহিদার সঙ্গে আর তাল মেলেনি উৎপাদনের। শুরু হয় ঘাটতি। এভাবেই কাটছে বেশ কয়েক বছর। দিন দিন বড় হচ্ছে ঘাটতির পরিমাণ।

দেশে লবণের চাহিদা, উৎপাদন ও আমদানির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে এমন চিত্র। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) তথ্য বলছে, দেশে ঠিক এক যুগ আগে লবণের উৎপাদন ছিল চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি।

তথ্যানুসারে, ২০০৯-১০ অর্থবছরে দেশে সাড়ে ১৩ লাখ টন লবণের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ছিল ১৭ লাখ ৪ হাজার টন। গত একযুগে এ চাহিদা ক্রমাগত বেড়ে হয়েছে ২৩ লাখ ৫২ হাজার টন। কিন্তু শেষ গত অর্থবছর লবণের উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৯৯ হাজার টন। অর্থাৎ ঘাটতি প্রায় সাড়ে তিন লাখ টন।

তথ্য বলছে, একযুগের এ মধ্যবর্তী সময়ে ২০১৫-১৬ অর্থবছর পর্যন্ত লবণের তেমন ঘাটতি ছিল না। বেশিরভাগ সময় উৎপাদনই বেশি ছিল। কিন্তু এর পরের বছর (২০১৬-১৭ অর্থবছরে) ১৬ লাখ ৭৬ হাজার টন লবণের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ছিল ১৩ লাখ ৬৪ হাজার টন। তার পরের বছরেও একই অবস্থা। দেড় লাখ টন ঘাটতি হয় ওই বছর। এরপর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে উৎপাদন বাড়লেও পরের বছরই উৎপাদন কমে সাড়ে তিন লাখ টনের ঘাটতি হয়।

jagonews24ফাইল ছবি

এমন পরিস্থিতিতে বাজার সামাল দিতে ওই বছরগুলো লবণ আমদানির অনুমতি দিতে হয়েছে সরকারকে। অনুমোদিত আমদানির তথ্য বলছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টন লবণ আমদানির প্রয়োজন হয়। গত অর্থবছরে আমদানি করা হয় ৩ লাখ টন লবণ।

লবণের এ ঘাটতির কারণে বাজারে বিগত কয়েক বছরে কয়েক দফা সরবরাহ সংকট হয়েছে। এতে বাজারে লবণের দাম বেড়েছে স্বাভাবিকভাবে। আবার এ সংকটের কারণে বেড়েছে লবণের অবৈধ আমদানিও।

কারণ দেশের আইনে খাওয়ার লবণ আমদানি নিষিদ্ধ। প্রয়োজন হলে সরকার অনুমোদন দিয়ে এ লবণ আমদানি করেছে। কিন্তু শুল্ক দিয়ে শিল্পখাতের কাঁচামাল হিসেবে লবণ আমদানি উন্মুক্ত রয়েছে। যে সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেসরকারিখাতেও প্রচুর খাওয়ার লবণ আমদানি হয়েছে, যা মূলত শিল্প লবণ (সোডিয়াম সালফেট)।

jagonews24ফাইল ছবি

কিন্তু লবণ পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলো বারবার দাবি করেছে, শিল্পের নামে এসব লবণ খাওয়ার লবণ হিসেবে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এগুলো পরিশোধন ছাড়াই প্যাকেটজাত করে বাজারে ছাড়েন অসাধু ব্যবসায়ীরা। কারণ আমদানির তুলনায় দেশে লবণের দাম বেশি।

সরকারের অনুমোদনহীন এমন প্রচুর লবণ আমদানির তথ্য ও প্রমাণ দিচ্ছে সে অভিযোগের। বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বলছে, দেশে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৭ লাখ ৫৮ হাজার টন, পরের অর্থবছর ১১ লাখ ২১ হাজার এবং গত অর্থবছর ৪ লাখ ৮৯ হাজার টন লবণ আমদানি করেছে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।

শেষ অর্থবছরে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২ হাজার ৭৭৭টি। এসব লবণ বেশিরভাগ শিল্প লবণ হিসেবে আনা হয়েছে। কিন্তু এসব ভুতুড়ে আমদানি ও প্রতিষ্ঠানের খোঁজ নেই কোনো সংস্থার কাছে।

এসব বিষয়ে লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি নুরুল কবির জাগো নিউজকে বলেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় নানাভাবে পণ্য বাজারে আসে। অবৈধপথে চীন থেকে সোডিয়াম সালফেট, টলোমাইন পাউডারের নাম দিয়ে এসব বাজারে আসছে। এসব ফিনিশ লবণ, যা আমরা খাই।

jagonews24ফাইল ছবি

তিনি বলেন, চাহিদা ও উৎপাদনের ঘাটতি এ অবৈধ আমদানির প্রধান কারণ। এসব লবণ আনতে ১০ টাকা খরচ হয়, যা বাজারে তিনগুণ দামে বিক্রি করা যায়।

দেশের চাহিদা ও ঘাটতির ফারাক কেন বাড়ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রকৃত লবণচাষিরা দাম পাচ্ছেন না। দিন দিন লবণের জমি কমছে। অনেক কলকারখানাও অবৈধ আমদানির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বাড়তি চাহিদা যদি অবৈধপথে পূরণ হয় তবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক।

এদিকে দেশে ক্রমাগত লবণ চাষের জমি ও চাষির সংখ্যা কমছে- এমন তথ্য দিচ্ছে বিসিকও। এক যুগ আগে (২০০৯-১০ অর্থবছর) যেখানে দেশে নিবন্ধিত লবণচাষির সংখ্যা ছিল ৪৩ হাজার ৩৫৩ জন, সেখানে বর্তমানে চাষির সংখ্যা ২৭ হাজার ৬৯৭ জন।

একই সঙ্গে দেশে ওই সময় ৬৭ হাজার ৭৫১ একর জমিতে লবণ চাষ হতো। এখন হচ্ছে ৫৪ হাজার ৬৫৪ একরে। লবণ চাষের জমিতে এখন চিংড়ি চাষে ঝুঁকছেন চাষিরা।

এনএইচ/এমআরএম/এএ/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]