সার্চ কমিটির সঙ্গে বৈঠক শেষে যা বললেন বিশিষ্টজনরা
প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে গঠিত সার্চ (অনুসন্ধান) কমিটির সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিশিষ্টজনরা। শনিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টা ২৫ মিনিটে সুপ্রিম কোর্টের সেমিনার কক্ষে প্রথম দফার বৈঠক শুরু হয়। এরপর দুপুর ১টা ৫ মিনিটে একই স্থানে বিশিষ্ট সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠক করে সার্চ কমটি। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কাছে আলোচনার বিষয়বস্তু তুলে ধরেন বিশিষ্টজনরা।
বৈঠক শেষে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবেই। বিএনপি রাজপথে দাবি-দাওয়া আদায়ে আন্দোলন করবে, সেটা তাদের অধিকার। তবে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিএনপি সংলাপে না বসে ঠিক করেনি। এখন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে যে সার্চ কমিটি কাজ করছে, তাদের সঙ্গে বিএনপির বসা উচিত হবে। একই সঙ্গে সার্চ কমিটিরও উচিত হবে বড় দল হিসেবে বিএনপিকে আবারও বৈঠকে বসার আহ্বান জানানো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, আমরা সবাই কথা বলার সুযোগ পেয়েছি। আমাদের সবারই বক্তব্য ছিল, নির্বাচন কমিশনে যারা সুযোগ পাবেন তারা যেন পূর্বে কোনো সরকারের আমলে বিশেষ সুবিধাভোগী না হন। তিনি বলেন, আগের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা শতভাগ আস্থা রাখতে পারি না। তবে আমরা বলেছি, যে ১০ জনের নাম সার্চ কমিটি রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবে, তাদের নাম যেন আগেই প্রকাশ করা হয়। তারপর হয়তো আস্থা-অনাস্থার বিষয়টি আসবে।
বৈঠকে একই মতামত দিয়েছেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার। বৈঠক থেকে বেরিয়ে তিনি বলেন, কোনো দলীয় সরকারের অধীনে সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি যেন নির্বাচন কমিশনে স্থান না পান, সেই সুপারিশ করেছি। আমার এ দাবির সঙ্গে অনেকেই সমর্থন জানিয়েছেন।
আজকের পত্রিকার সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান বলেন, বিএনপি আলোচনায় না গিয়ে বাইরে থেকে সার্চ কমিটি ও নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করছে। কিন্তু বাইরে থেকে সমালোচনা করলে তা গ্রহণযোগ্য হয় না। তিনি বলেন, বিএনপি এই পদ্ধতির (ইসি গঠনে নেওয়া উদ্যোগের) বাইরে আছে এবং বাইরে থেকেই আলোচনা, সমালোচনা করছে। আমরা বলেছি তাদের যেন এ পদ্ধতির সঙ্গে সংযুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান বলেন, আমি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে বলেছি যে আপনি উদ্যোগ নেন তাদের (বিএনপি) নিয়ে আসার জন্য। তারা অন্তত এ পদ্ধতিতে সম্পৃক্ত হোক। বাইরে থেকে তো অনেকেই সমালোচনা করতে পারেন, কিন্তু তা গ্রহণযোগ্য হয় না। সুতরাং পদ্ধতির আওতায় এসে তারা তাদের অধিকার আদায়ের কথা বলুক, চাহিদার কথা বলুক। এতে তো সমস্যা নেই।
সার্চ কমিটির সঙ্গে কী আলোচনা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা খোলামেলা অনেক আলোচনা করেছি। তবে আমরা জানিয়েছি, যারা যোগ্য, সৎ এবং ন্যায্যতা দিতে পারবে এবং জুডিশিয়াল মাইন্ড আছে তাদের যেন নির্বাচন কমিশনে স্থান দেওয়া হয়।
ইসি গঠনে সার্চ কমিটির সঙ্গে কী আলোচনা হয়েছে জানতে চাইলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, যে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে সেটা যেন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য, সৎ এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হয়। নির্বাচন কমিশন গঠনে যারা থাকবেন, ব্যক্তি বাছাইয়ে যেন এ কাজগুলো তারা করেন।
দৈনিক জাগরণের সম্পাদক আবেদ খান বলেন, বিভক্ত রাজনীতির পরিবেশে একতা তৈরি করা একেবারে মুশকিল। সমাজ এবং রাজনীতির একটি অংশ যখন এই প্রক্রিয়ার বাইরে তখন সার্চ কমিটির দায়িত্ব জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য একটা তালিকা প্রকাশ করা। এই অবস্থায় তাদের আরও সতর্ক হতে হবে, যেন গঠিত নির্বাচন কমিশনের একটি মানুষও প্রশ্নবিদ্ধ না থাকেন। এছাড়া যাদের তালিকা করা হবে তাদের নাম যেন অন্তত কয়েকদিন আগে গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। যাতে সাধারণ মানুষ সেটা দেখতে পারে এবং তাদের বিরুদ্ধে যদি কোনো মন্তব্য থাকে তাহলে সেটা দেখা যাবে।
এছাড়া যারা ধর্মীয় এবং জাতিগত দিক থেকে সংখ্যায় কম, তাদের মধ্য থেকে প্রতিনিধি দেওয়া দরকার। কারণ সেখানে তাদের প্রতিনিধি থাকলে তারা ভোটদানে সাহস পাবে। এছাড়া আমরা পুলিশ ও প্রশাসনে না গিয়ে ও বুদ্ধিজীবী, লেখক, সাহিত্যিক এবং অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে ১০ জনের নাম রাখার জন্য আহ্বান জানিয়েছি- যোগ করেন আবেদ খান।
তিনি আরও বলেন, গণমাধ্যম থেকেও দু-একজনকে রাখার জন্য বলেছি। কারণ গণমাধ্যম নির্বাচন এবং নির্বাচন প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত কাছ থেকে দেখে। এছাড়া নারী প্রতিনিধিত্ব যেন বেশি থাকে সেজন্য বলেছি।
ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন, আমরা নির্দিষ্ট কারও নাম বলিনি এজন্য যে, নির্বাচন কমিশনারের ওপরে অত্যন্ত গুরুদায়িত্ব। কারণ অগে যারা নির্বাচন কমিশনার ছিলেন তারা অত্যন্ত বিতর্কে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। আগামী নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারে এমন একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন দরকার।
তিনি বলেন, যেকোনো নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভিকটিম হয় সংখ্যালঘু। আমরা বলেছি তাদের থেকে প্রতিনিধি নিতে, গণমাধ্যম এবং সমাজের অবহেলিত জনগোষ্ঠী থেকে প্রতিনিধি নিতে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা নিয়ে যাদের মধ্যে বিতর্ক আছে, আমরা বলেছি তাদের যেন কোনো প্রতিনিধি না নেওয়া হয়।
চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ বলেন, আমরা বলেছি যে ১০ জনের নাম প্রস্তাব করা হবে তাতে সার্চ কমিটি যেন যোগ্য ও বিতর্কমুক্তদের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে দেন। তাদের নাম যেন গণমাধ্যমেও প্রকাশ করা হয়।
এএএম/কেএসআর/জেআইএম