ব্রডব্যান্ডের প্রকল্পে অনিয়ম, ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৩৮ এএম, ১৯ জুন ২০২৩
ফাইল ছবি

টেলিযোগাযোগ সেবা উন্নয়নে সরকারের নেওয়া ডিজিটাল কানেক্টিভিটি শক্তিশালী করতে সুইচিং ও ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্পের (এসটিএনপি) যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ ঘটনায় প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ৫ জনকে অভিযুক্ত করে মামলার সুপারিশ করেছেন দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা।

কমিশনের অনুমোদন পেলেই অভিযুক্তদের আসামি করে মামলা করা হবে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে। তবে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মামলার সুপারিশ করলেও এখন পর্যন্ত মামলা হয়নি।

অনুসন্ধান ও আইনি কার্যক্রম চলমান থাকায় এ প্রসঙ্গে বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। দুদকের উপ-পরিচালক ও অনুসন্ধান কর্মকর্তা নার্গিস সুলতানা ওই প্রতিবেদন তৈরি করেন এবং মামলার সুপারিশ করেছেন।

যাদের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করা হয়েছে তারা হলেন- টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন লিমিটেডের (বিটিসিএল) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. রফিকুল মতিন, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ও বর্তমানে টেলিটক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম হাবিবুর রহমান, বিটিসিএলের সাবেক উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অর্থ) খন্দকার যুবায়ের হাসান এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের (ডাক-২) এবিএম বদিউজ্জামান।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তর ও বিটিসিএলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এসটিএনপি প্রকল্পের শত কোটি টাকা আত্মসাতের একটি অভিযোগ ২০২১ সালের ১ মার্চ জমা পড়ে দুদকে। অভিযোগপত্রে বিটিসিএল পরিচালনা পর্ষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান নুর-উর-রহমান, টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মহসিনুল আলম, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের যুগ্ম প্রধান মো. মোছলেহ উদ্দিন ও বিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. রফিকুল মতিনের নাম আসে। এরপরে কমিশন অভিযোগ অনুসন্ধানে সংস্থাটির উপ-পরিচালক নারগিস সুলতানাকে দায়িত্ব দেয়। তিনি অনুসন্ধান শেষ করে সম্প্রতি পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশসহ কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন।

এরপর ২০২২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল মতিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। ওই দিন ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, দেশের সর্বত্র ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার প্রকল্পে অনিয়ম, কারসাজির অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। ২০১৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি একনেকে অনুমোদন পায় ‘ডিজিটাল কানেক্টিভিটি শক্তিশালীকরণে সুইচিং ও ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন (এসটিএন)’ প্রকল্প। তখন দরপত্র দলিল ও দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয় প্রস্তুতের জন্য কমিটি গঠন করা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে ওই বছরের ১২ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত বিটিসিএল কর্তৃপক্ষ অনিয়ম ও নিয়মবিধি লঙ্ঘন করেছে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে। প্রকল্পে কাজের জন্য ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাঁচটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়। সাত সদ্যস্যের দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সর্বসম্মতিক্রমে এক্স-ফারকে একমাত্র যোগ্য ও সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ঘোষণা করে। তবে পুনঃদরপত্র আহ্বান কেন্দ্র করে কমিটির সদস্যদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়।

মূল্যায়ন কমিটিতে থাকা বিটিসিএলসহ সরকারি কর্মকর্তারা পুনঃদরপত্র আহ্বানের সুপারিশ করেন।

পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে মূল্যায়ন প্রতিবেদনের বেশ কয়েকটি পৃষ্ঠার নম্বর হাতে কেটে অতিরিক্ত দুই পাতা সংযোজন করেন তারা। কাটছাঁটের বিষয়টি গোপন করতে বোর্ডসভায় মূল্যায়ন প্রতিবেদন ছাড়া শুধু কার্যপত্র উপস্থাপন করা হয়। সভায় বহিঃসদস্যরা দরপত্র বাতিলের বিপক্ষে ও বিটিসিএলসহ সরকারি কর্মকর্তারা বাতিলের পক্ষে মত দেন। পরের বোর্ডসভায় দরপত্র বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এসব ক্ষেত্রে ক্রয় আইন, বিধি ও দরপত্র দলিলের শর্ত লঙ্ঘিত হয়েছে। এরপর দরপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল করে একমাত্র যোগ্য প্রতিষ্ঠানটি। আরও জানা যায়, আপিল নিষ্পত্তির আগেই গত বছরের নভেম্বরে পুনঃদরপত্র আহ্বান করে বিটিসিএল। পুনঃদরপত্রের ভিত্তিতে জিটিইকে কার্যাদেশ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। তবে পরবর্তী সময়ে সেটিও বাতিল করে বিটিসিএল কর্তৃপক্ষ। এসবের ফলে দীর্ঘায়িত হচ্ছে প্রকল্প।

পরবর্তী সময়ে আরও দুইবার দরপত্র আহ্বান করে অনির্দিষ্টকালের জন্য দরপত্র স্থগিত করে বিটিসিএল কর্তৃপক্ষ।

দরপত্র বাতিল আইনসংগত নয় বলে বিটিসিএলের পরিচালনা পর্ষদে উপস্থিত দুজন স্বাধীন সদস্যের সঙ্গে একমত প্রকাশ করে অন্য স্বাধীন সদস্য বুয়েটের উপাচার্য দরপত্র বাতিলের বিপক্ষে মত প্রদান করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। অথচ দরপত্র বাতিলের পক্ষে দেখিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে পরিচালনা পর্ষদের কার্যবিবরণী তৈরি করা হয়। বেআইনি দরপত্র বাতিলে সরকারের গৃহীত প্রকল্পের সুফল প্রাপ্তি থেকে জনগণ বঞ্চিত হয়েছে এবং সরকার ১০৭ কোটি টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হয়েছে।

এসএম/এমএইচআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।