শাহজালাল বিমানবন্দর

বৈদেশিক মুদ্রা ‘চুরি করতে’ ব্যাংককর্মীদের সার্ভার ডাউন নাটক

সাইফুল হক মিঠু
সাইফুল হক মিঠু সাইফুল হক মিঠু
প্রকাশিত: ০৪:৩২ পিএম, ৩০ মার্চ ২০২৪
প্রতীকী ছবি

দীর্ঘদিন ধরেই দেশে ডলার সংকট। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করলেও খুব বেশি কাজ হয়নি তাতে। বরং আমদানি কমায় উল্টো বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম। এমন পরিস্থিতিতেও প্রতিদিন দেশ থেকে পাচার হচ্ছে কোটি কোটি টাকা মূল্যের ডলার। সম্প্রতি এমন এক চক্রের সন্ধান পায় দুদক। যারা প্রতিদিন শত কোটি টাকা মূল্যের ডলার বা বৈদেশিক মুদ্রা অবৈধভাবে দেশের বাইরে পাচার করছিল।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিদিন শত শত প্রবাসী দেশে ফেরেন। এছাড়া বাংলাদেশ ভ্রমণ বা কোনো কাজে আসেন অনেক বিদেশি। এসব প্রবাসী ও বিদেশি তাদের সঙ্গে থাকা ডলার বা বিদেশি মুদ্রা বিমানবন্দরে থাকা ব্যাংকের বুথ ও মানি চেঞ্জার থেকে বাংলাদেশি টাকায় এনক্যাশমেন্ট করেন। এক্ষেত্রে ব্যাংক বা মানি চেঞ্জার থেকে ভাউচার দেওয়ার নিয়ম থাকলেও চক্রটি তা দেয়নি। কেউ ভাউচার চাইলে সার্ভার ডাউনের অজুহাত দেখাতেন অভিযুক্ত ব্যাংককর্মীরা।

গত ২৭ মার্চ শাহজালাল বিমানবন্দরে ডলার ও অন্য বিদেশি মুদ্রাবিনিময় কারসাজিতে জড়িত থাকার অভিযোগে ২১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। এ মামলায় ১৯ ব্যাংকার ও দুই মানি চেঞ্জারের মালিককে আসামি করা হয়েছে। তবে অনুসন্ধানের জানা গেছে, এসব ঘটনা সম্পর্কে আগেই ওয়াকিবহাল ছিল ব্যাংকগুলো। দুদকের মামলার আসামিরা আগেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হন। তবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি ব্যাংক। এ ঘটনায় সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে বলে দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।

আইন অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট প্রদর্শন এবং ভাউচার বা এনক্যাশমেন্ট স্লিপ প্রদান, লেজার সিস্টেমে এন্ট্রি করে যথাযথ হিসাব রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে ব্যাংকের অধিকাংশ বুথ এবং মানি চেঞ্জারের বুথের অসাধু কর্মকর্তারা তা মানছেন না।

দুদকের মামলার আসামিরা হলেন- জনতা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার মো. সুরুজ জামাল, অমিত চন্দ্র দে, মো. মানিক মিয়া, সাদিক ইকবাল, মো. সুজন আলী, মো. সোহরাব উদ্দিন খান, মো. শরীফুল ইসলাম, মো. হুমায়ুন কবির। এছাড়া রয়েছেন ব্যাংকটির প্রিন্সিপাল অফিসার শামীম আহমেদ, মো. আশিকুজ্জামান এবং সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার আনোয়ার পারভেজ।

মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার কামরুল ইসলাম, মোহাম্মদ সবুজ মীর, খান আশিকুর রহমান, এবিএম সাজ্জাদ, অফিসার সামিউল ইসলাম, সাপোর্টিং স্টাফ মো. মোশারফ হোসেন। এছাড়াও আছেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের অফিসার মো. আবু তারেক প্রধান ও অগ্রণী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার মো. আব্দুর রাজ্জাক। ইম্পেরিয়াল মানি এক্সচেঞ্জের পরিচালক কেএম কবির আহমেদ এবং এভিয়া মানি চেঞ্জারের কাস্টমার সার্ভিস ম্যানেজার মো. আসাদুল হোসেনকেও মামলায় আসামি করেছে দুদক।

আরও পড়ুন

যেভাবে প্রবাসীদের বৈদেশিক মুদ্রা কুক্ষিগত করে চক্রটি

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে আসা প্রবাসী ও বিদেশিরা সঙ্গে আনা বিদেশি মুদ্রা বিমানবন্দরে থাকা ব্যাংকের বুথ ও মানি চেঞ্জারের মাধ্যমে বাংলাদেশি টাকায় এনক্যাশমেন্ট করেন। আইন অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট প্রদর্শন এবং ভাউচার বা এনক্যাশমেন্ট স্লিপ প্রদান, লেজার সিস্টেমে এন্ট্রি করে যথাযথ হিসাব রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে ব্যাংকের অধিকাংশ বুথ এবং মানি চেঞ্জারের বুথের অসাধু কর্মকর্তারা তা মানছেন না। তারা ভাউচার না দিয়ে বা জাল ভাউচার দিয়ে সরাসরি বিদেশি মুদ্রা গ্রহণ করে তার বিনিময়ে টাকা দিয়ে দেন। কাউকে কাউকে আবার সইবিহীন, ভুয়া ভাউচার বা এনক্যাশমেন্ট স্লিপ দেন। এভাবে কেনা বিদেশি মুদ্রা ব্যাংক ও মানি চেঞ্জার তাদের মূল হিসাবে বা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত অ্যাকাউন্টে অন্তর্ভুক্ত করতেন না।

যেভাবে হয় অনিয়ম

দুদক সূত্র জানায়, এভিয়া মানি চেঞ্জারের কর্মকর্তা মো. আসাদুল হোসেন ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তাদের দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা কিনতে ব্যাংকের বুথে প্রতিদিন প্রতি শিফটের জন্য ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা রেখে যেতেন। ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তারা ওই টাকা দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা কিনে নির্দিষ্ট কমিশনের বিনিময়ে তা আসাদুলকে সরবরাহ করেন। এরপর ওই বিদেশি মুদ্রা বিমানবন্দরের বাইরে কার্ব মার্কেটে বিভিন্ন মানি চেঞ্জারে চড়া দামে বিক্রি করতেন আসাদুল।

ডলার, দুদক, শাহজালাল বিমানবন্দর, বিশেষ প্রতিবেদন, ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থপাচার, দুর্নীতি, মামলাশাহজালাল বিমানবন্দর, বৈদেশিক মুদ্রা ‘চুরি করতে’ ব্যাংককর্মীদের সার্ভার ডাউন নাটক
ডলার কারসাজি নিয়ে ব্রিফ করেন দুদক সচিব মো. মাহবুব হোসেন

ইম্পেরিয়াল মানি এক্সচেঞ্জও এভাবে ভাউচার ছাড়া বিদেশি পর্যটক ও প্রবাসীদের কাছে বিদেশি মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয় করতো। তবে কখনো কখনো ডলার কেনাবেচায় তারা ভুয়া ভাউচার দিতো। দুদকের অনুসন্ধানে ওই প্রতিষ্ঠানের ভাউচারে পাসপোর্ট নম্বর, নাম, জাতীয়তা, রিসিভারস সিগনেচার পাওয়া যায়নি।

হোয়াটসআ্যপে ঠিক হয় রেট, সার্ভার ডাউনের অজুহাত

বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের কাছ থেকে বাজার মূল্যের চেয়ে কম দামে বৈদেশিক মুদ্রা কিনে নেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। এজন্য গ্রাহককে দেওয়া হয়নি কাস্টমার কপি। এমনকি এনক্যাশমেন্ট তথ্য করা হয়নি এন্ট্রি। কাস্টমার কপি চাইলে দেওয়া হয় সার্ভার ডাউনের অজুহাত। এছাড়া ব্যাংকাররা কত টাকায় বৈদেশিক মুদ্রা কিনবেন তা মানি চেঞ্জার কোম্পানি আগে থেকে ঠিক করে পাঠিয়ে দিতেন ব্যাংকারদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম সরেজমিনে দেখতে পায়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবস্থিত মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) বুথে যাত্রীদের অনেক ভিড়। সেদিন অন্তত সাতজন বিদেশ ফেরত ওই কাউন্টারে বৈদেশিক মুদ্রা এনক্যাশমেন্ট করেন। তবে ওইদিন বুথের কাস্টমার কপিতে কাস্টমার এবং এনক্যাশমেন্ট কর্মকর্তার কোনো সই পাওয়া যায়নি। ব্যাংকের অনলাইন এন্ট্রিতেও কোনো এন্ট্রি পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে বুথ ইনচার্জ মো. আবু তারেককে এনফোর্সমেন্ট টিম জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি সার্ভার ডাউন আছে বলে মিথ্যা তথ্য দেন।

ওই সময়ে বুথের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা মো. আল-আমিন জানান, ইন্টারনেটের সার্ভার ডাউন থাকার কারণে এন্ট্রি দেওয়া সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে সার্ভার ঠিক হলে তিনি ব্যাংকের মূল রেজিস্ট্রারে এন্ট্রি করবেন। তবে অপর বুথের দায়িত্বে থাকা এমটিবির আরেক কর্মকর্তা জানান, তার বুথের সার্ভারে কোনো সমস্যা নেই।

বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় ইন্টারনেট সার্ভার ডাউন হওয়া অস্বাভাবিক। এছাড়া কাস্টমার কপি কাস্টমারকে বুঝিয়ে না দিয়ে নিজের কাছে রাখাও বিধি পরিপন্থি।

জিজ্ঞাসাবাদে আব্দুর রাজ্জাক তার সঙ্গে আসাদুলের কথোপকথনের বিষয়ে স্বীকার করলেও বিদেশি মুদ্রা লেনদেনের বিষয় এড়িয়ে যান। তিনি আরও জানান, এ কাজ করতে তাকে বিভিন্ন সময় ভয়ভীতি দেখিয়েছে এভিয়া মানি চেঞ্জার।

অগ্রণী ব্যাংকের বুথেও দেখা যায় একই চিত্র। সেখানে এভিয়া মানি চেঞ্জারের আসাদুলের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে অগ্রণী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার মো. আব্দুর রাজ্জাকের কথোপকথন পাওয়া যায়। এতে তারা বিদেশি মুদ্রা লেনদেনের বিষয়ে কথা বলেন। জিজ্ঞাসাবাদে আব্দুর রাজ্জাক তার সঙ্গে আসাদুলের কথোপকথনের বিষয়ে স্বীকার করলেও বিদেশি মুদ্রা লেনদেনের বিষয় এড়িয়ে যান। তিনি আরও জানান, এ কাজ করতে তাকে বিভিন্ন সময় ভয়ভীতি দেখিয়েছে এভিয়া মানি চেঞ্জার।

এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদে এভিয়া মানি চেঞ্জারের কাস্টমার সার্ভিস অফিসার আসাদুল হোসেন দুদক টিমকে জানান, বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বিদেশি মুদ্রা সংগ্রহ করে তা বিমানবন্দরের বাইরে বিভিন্ন মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের কাছে উচ্চ দরে বিক্রি করতেন। তিনি মূলত অগ্রণী, জনতা ও সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে লেনদেন করতেন।

এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে। তবে বিষয়টি দুদকের তদন্তাধীন থাকায় মন্তব্য করতে চাননি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মুখপাত্ররা।

দুদক সচিব খোরশেদা ইয়াসমীন জাগো নিউজকে বলেন, ‘অবৈধভাবে ডলার কেনাবেচার ফলে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল থেকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। এসব বিদেশি মুদ্রা দেশের বাইরে পাচারও হতে পারে। এখন থেকে এসব বিষয়ে নিয়মিত তদারকি করবে দুদক।’

এসএম/কেএসআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।