কাউন্সিলরের ‘দখলে’ হাট, গরু এনে বিপাকে বিক্রেতারা

আবু আজাদ
আবু আজাদ আবু আজাদ , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:৫২ পিএম, ১৩ জুন ২০২৪

চট্টগ্রামের দ্বিতীয় বৃহত্তম পশুর বাজার বিবিরহাট। জেলা ছাড়িয়ে সারাদেশেই একসময় নামডাক ছিল এ বাজারের। দুই বছর আগেও দূরদূরান্ত থেকে মানুষ কোরবানির পশু কিনতে আসতেন এ হাটে। সারাদেশ থেকে আসতেন বিক্রেতারা। কিন্তু এবার সেই ঐতিহ্যবাহী বাজার ‘মৃতপ্রায়’। ক্রেতা উপস্থিতি নেই বললেই চলে। এতে বিপাকে পড়েছেন উত্তরাঞ্চলসহ সারাদেশ থেকে গরু নিয়ে হাটে আসা কয়েকশ বিক্রেতা।

অভিযোগ আছে, স্থানীয় কাউন্সিলরের নেতৃত্বে প্রভাবশালীরা দখলে রেখেছে এই ঐতিহ্যবাহী পশুর বাজারটি। ফলে তিন তিনবার টেন্ডার আহ্বান করা হলেও বাজারটি ইজারা নিতে আগ্রহ দেখাননি কোনো ব্যবসায়ী। এতে দেড় কোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারাতে বসেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। এরপরও যেসব বিক্রেতা এসেছেন, ক্রেতা না থাকায় তাদেরও মাথায় হাত।

এ নিয়ে মুরাদপুরের স্থানীয় বাসিন্দা সারওয়ার আলম জাগো নিউজকে বলেন, জন্মের পর থেকে বিবিরহাটে কোরবানির বাজার দেখে আসছি। ঐতিহ্যবাহী এই বাজারে পশু বেচাকেনার জন্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামের বাইরে থেকে লাখো মানুষ আসতেন। হাট ছাড়িয়ে পশু বিকিকিনি হতো আশপাশের দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে। কিন্তু এবার কোরবানির ঈদের তিনদিন বাকি থাকলেও বাজারে কোনো আমেজ নেই। ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি একেবারেই কম।

হাটের পাশেই কাউন্সিলর মোবারক আলীর অফিসহাটের পাশেই কাউন্সিলর মোবারক আলীর অফিস

বুধবার বিবিরহাট বাজার ঘুরে দেখা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, যশোর, কুষ্টিয়া, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অন্তত দুইশ ব্যাপারী গরু নিয়ে এসেছেন। কিন্তু শনিবার থেকে শুরু হওয়া বাজারে বিক্রি নেই বললেই চলে। অধিকাংশ ব্যাপারী অলস সময় কাটাচ্ছেন। বিক্রি না থাকায় ক্ষতির আশঙ্কার চিন্তার ছাপ ছিল প্রায় সবার মুখে।

আরও পড়ুন

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল থেকে ২১টি গরু নিয়ে শনিবার বিবিরহাট বাজারে এসেছেন জায়েদ আলী। পাঁচদিনে মাত্র একটি গরু বিক্রি হয়েছে তার।

জায়েদ আলী জাগো নিউজকে বলেন, ৫০ হাজার টাকা দিয়ে ‘খুঁটি কিনে’ এখন গরু নিয়ে বসে আছি। শনিবার থেকে একটি মাত্র গরু বিক্রি করেছি। ক্রেতা আসছে কম, বিক্রিও কম। মঙ্গলবার এখানে হাটবার ছিল। কিন্তু সারা হাটে গরু বিক্রি হয়েছে মাত্র দশটি।

কুমিল্লার চান্দিনা থেকে গরু নিয়ে এসেছেন আতিকুর রহমান। তিনি বলেন, ২০টি গরু নিয়ে এসেছি। এখানো কোনো ক্রেতা নেই। দু-একজন এলেও দাম বলছে খুব কম। আমরা এখানে এসে বিপদে পড়ে গেছি। ‘খুঁটি’র টাকা দিয়ে ফেলায় চলে যেতেও পারছি না।

বিক্রেতারা অভিযোগ করেন, হাট পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা ব্যাপারীদের কাছ থেকে খুঁটি ও জমির ভাড়া আদায় করলেও কাঙ্ক্ষিত প্রচার-প্রচারণা চালাননি। এ কারণে ক্রেতারা বাজারে আসছেন না। মূলত বাজারের নির্দিষ্ট কোনো ইজারাদার না থাকায় হাট ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হয়েছে।

সরেজমিন পরিদর্শনে বিক্রেতাদের অভিযোগের সত্যতাও মেলে। চট্টগ্রামের অন্যান্য পশুর বাজারগুলোয় যেখানে রাতদিন প্রচার-প্রচারণা চলেছে, করা হচ্ছে আলোকসজ্জা, সেখানে বিবিরহাটে সে ধরনের কোনো কিছুই চোখে পড়েনি। পশুর হাট নিয়ে সরকারি নির্দেশনার কোনোটাই বাস্তবান হচ্ছে না। বাজারে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে একটি মাত্র পথ। বৃদ্ধ ও শিশুদের পশুর হাটে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়নি কোনো ব্যবস্থা।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সাবেক ইজারাদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুই বছর ধরে চট্টগ্রামের দ্বিতীয় বৃহত্তম পশুর বাজারটি দখলে নিয়ে নিজস্ব বলয় গড়ে তুলেছেন কাউন্সিলর মো. মোবারক আলী ও তার লোকজন। নিজ কার্যালয়ের পাশের বাজারটির জায়গা ভাড়া দিয়েছেন কয়েকটি এগ্রো ফার্মের কাছে। এ কাজে তাদের সহায়তা করছেন চসিকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা। ফলে সরকার রাজস্ব হারালেও পকেট ভারী হচ্ছে ওই কর্মকর্তাদের।

আরও পড়ুন

পশুর হাটের ওই জায়গায় দেখা যায়, ব্যবসা পরিচালনা করছে খাজা গরিবে নেওয়াজ ডেইরি ফার্ম, হযরত সলিমউল্লাহ শাহ ডেইরি ফার্ম ও মেসার্স সামির অ্যান্ড সামিরা এগ্রো ফার্ম। মূলত সিটি করপোরেশন পরিচালিত বাজারের জায়গা এভাবেই ভাড়া দিয়ে রাখা হয়েছে কিছু ব্যবসায়ীর কাছে। এ কারণে অন্য কোনো ইজারাদার হাটটি ইজারা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। কারণ বাজারের ভেতর একটি পক্ষের অবস্থান থাকায় অন্য কোনো ইজারাদারের পক্ষে বাজার পরিচালনা অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

এ অবস্থায় সিটি করপোরেশনও ইজারাদার না পেয়ে বাজার ‘দেখভালের দায়িত্ব’ দিয়েছে সেই কাউন্সিলরকেই। এভাবেই নগরের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজারটি কুক্ষিগত রাখতে বিবিরহাট বাজারে ইজারাদার নিয়োগ ঠেকিয়ে দেওয়া হচ্ছে কৌশলে।

গরুর বাজার কেন এগ্রো ফার্মকে ভাড়া দেওয়া হলো, জানতে চাইলে চসিকের সহকারী এস্টেট অফিসার আবদুল্লাহ আল মামুন জাগো নিউজকে বলেন, ‘ইজারাদার না পেলে আমরা কি করবো? আমাদের টার্গেট হলো রেভিনিউ সংগ্রহ করা। সেটা যে কোনোভাবে হোক। এছাড়া সরকার এগ্রো ফার্মকে উৎসাহ দিচ্ছে।’

জানা গেছে, ২০২৩ সালে নগরের মুরাদপুরে রাস্তা ও ব্রিজের উন্নয়ন কাজ শুরুর পর প্রায় ছয় মাস বন্ধ থাকে মুরাদপুর-অক্সিজেন সড়ক। ফলে সে বছর বাজারটিতে ইজারাদার নিয়োগ সম্ভব হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাজারটির ন্যূনতম দর হওয়ার কথা ছিল ২ কোটি ২৭ লাখ ৯৬ হাজার ৭৭৭ টাকা। কিন্তু ইজারাদার নিয়োগ না হওয়ায় বাজারটি থেকে খাস সংগ্রহের উদ্যোগ নেয় চসিক। দায়িত্ব দেওয়া হয় ৭ নম্বর পশ্চিম ষোলশহর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোবারক আলীকে। মূলত এ পরিস্থিতিকে পুঁজি করে বিবিরহাট গরুর বাজার নিয়ন্ত্রণে নেন কাউন্সিলর মোবারক আলী। বাজার ব্যবস্থাপনার সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ চলে যায় তার হাতে। চলতি বছরও অনেকটা বাধ্য হয়েই ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে বাজার ‘দেখভালের’ দায়িত্ব দেওয়া হয়।

হাটের প্রবেশপথ, নেই কোনো আলোকসজ্জা বা প্রচারণার ব্যবস্থাহাটের প্রবেশপথ, নেই কোনো আলোকসজ্জা বা প্রচারণার ব্যবস্থা

তবে বাজারের সাবেক এক ইজারাদার নাম না প্রকাশের শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, বিবিরহাট বাজারটি এখন স্থানীয় কাউন্সিলর ও তার লোকজনের হাতে জিম্মি। এ অবস্থায় বাইরে থেকে গিয়ে কোনো ব্যবসায়ীর পক্ষে এ বাজার পরিচালনার অবস্থা নেই। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ঐতিহ্যবাহী বাজারটিকে নিষ্প্রাণ করে রেখেছেন যাতে বাজার নিজস্ব বলয়ের বাইরে না যায়।

তিনি আরও বলেন, এ অবস্থায় কেউ ইজারা নিলেও স্থানীয় সন্ত্রাসীদের মোকাবিলা করে বাজার পরিচালনা সম্ভব নয়। তাই জেনে শুনে কেউ ক্ষতির সম্মুখীন হতে চাইছে না।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সালে চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুরে বিবিরহাট পশুর বাজারটি উদ্বোধন করেন তৎকালীন সিটি মেয়র প্রয়াত মহিউদ্দিন চৌধুরী। টানা ২২ বছর নিয়মিত ইজারদার নিয়োগের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় করে আসছিল সিটি করপোরেশন।

২০২০ সালে বিবিরহাট গরুর বাজারের ইজারা হয় ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকায়। পরের বছর বাজারটি ইজারা হয় ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকায়। ২০২২ সালে ২ কোটি ১৪ লাখ টাকায় বাজারটি ইজারা হয়। তবে দুই বছর ধরে ইজারাদার পাচ্ছে না সিটি করপোরেশন। এবারও তিন দফা চেষ্টা করে বিবিরহাট বাজারের জন্য ইজারাদার পাওয়া যায়নি। ফলে স্থানীয় কাউন্সিলরের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয় বাজার।

এর আগে ২০২৩ সালে মাত্র ৫০ লাখ টাকায় সিটি করপোরেশনের সঙ্গে রফাদফা হয় কাউন্সিলর মো. মোবারকের। এবার সেটি ৬০ লাখ টাকা নির্ধারণ হয়েছে বলে জানা গেছে। বিপরীতে একেকজন বিক্রেতার কাছ থেকে বাজারের ভাড়া আদায় করা হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। এছাড়া ক্রেতাদের কাছ থেকে হাসিল আদায় করা হচ্ছে ৫ শতাংশ হারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাউন্সিলর মো. মোবারক আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা কাউকে বাজার ভাড়া দিইনি। এখন যারা আছেন তারা বাজারের স্থায়ী বিক্রেতা। ইজারাদাররা কেন বাজার ইজারা নিচ্ছেন না, সেটি আমার জানা নেই। তবে সিটি করপোরেশন থেকে বাজারটি দেখভালের জন্য আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমি সিটি করপোরেশনকে সহায়তা করার চেষ্টা করছি মাত্র।’

এএজেড/এমএইচআর/এমএমএআর/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।