ফায়ার সার্ভিসের নামে জমি দখল
ঢাকা থেকে ৪১৭ কিলোমিটার দূরে কক্সবাজারের ইনানী এলাকা। সমুদ্র সৈকতের কাছেই মেরিন ড্রাইভ সড়কের কোলঘেঁষে বিশাল এলাকায় চলছে কর্মযজ্ঞ। সাইনবোর্ডে লেখা- ‘ক্রয় সূত্রে এই জমির মালিক ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স’। তিনদিকে দেওয়ালে ঘেরা, একদিকে টিন। সেখানেও দেওয়াল তোলার কাজ চলছে। তদারকি করছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।
সামনে এগোতে চোখে পড়ে, বাউন্ডারির ভেতরে মানুষের বাড়ি। জমিতেও আছে ধান। তবে ভেতরে বসবাসকারী নাগরিকদের জন্য যাতায়াতে নেই কোনো পথ। এই প্রতিবেদকের কাছে তারা অভিযোগ করছেন, ‘কিছু জমি বৈধভাবে ক্রয় করেছে ফায়ার সার্ভিস। কিছু অবৈধ দলিল করে নিয়েছে। দুটো মিলিয়ে চার একর। অথচ তারা আমাদেরসহ মোট আট একর জমিতে বাউন্ডারি দিয়েছে। প্রতিনিয়ত শারীরিক নির্যাতনসহ নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে জমির দখল ছেড়ে দিতে। কলেজপড়ুয়া মেয়ে, বয়োবৃদ্ধ নারী-পুরুষও রেহাই পাচ্ছে না ফায়ারকর্মী ও তাদের সহযোগীদের নির্যাতনের হাত থেকে।’
বাউন্ডারির ভেতরেই একটি বাড়িতে কথা হয় খালেদা বেগম নামের একজনের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখানে আমাদের বাড়িঘর ও চাষের জমি আছে। চারদিকে দেওয়াল দিয়ে ঘেরাও করে ফেলছে। বের হতে পারি না। বন্যায় পানির সময় নিচে পড়ে ছিলাম। তারপরও তারা আমাদের বের হতে দেয়নি। আমরা চলাচলের রাস্তার জন্য বিচার চাইলে চেয়ারম্যানসহ সবাই মিলে বসে রাস্তা দিতে বলছে। কিন্তু ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা মানে না।’
বিগত সরকারের আমলে তারা এই লুটপাট করেছে। আমাদের সব দলিল আছে। চৌহদ্দি দেওয়া আছে। খতিয়ান করা আছে। খাজনাও দেওয়া আছে। বাংলাদেশের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাদের কাছে আমরা আমাদের অধিকার চাই। সাম্য ও ন্যায়বিচার চাই। এই সরকারের কাছে আমরা অধিকার না পেলে কখনো অধিকার ফিরে পাবো না।- ভুক্তভোগী শহীদুল্লাহ
তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত সাতবার আমাদের ওপর হামলা করেছে। আমার কলেজপড়ুয়া মেয়ের গায়েও আঘাত করেছে। ইজ্জত নষ্টের হুমকি দিয়েছে। থানায় গেলে মামলা বা অভিযোগ নিতে চায় না। অনেক দেনদরবার করে একবার অভিযোগ নিলেও সামাজিক মর্যাদার কথা ভেবে মেয়ের বিষয়টি উল্লেখ করিনি। মেয়ের বাবাকে কয়েকবার তুলে নিয়ে গেছে। তাকে গুম করার চেষ্টা করেছে। আমরা তাকে লুকিয়ে রাখি। এনিয়ে বিভিন্ন জায়গায় বিচার চেয়েও পাইনি। আমরা আমাদের ভিটেমাটিতে নিরাপদে থাকতে চাই।’

আবুল হোসাইন নামে আরেক ভুক্তভোগীর দাবি, ‘আমাদের এখানে পৈতৃক সূত্রে ৬০ শতক জমি আছে। আমার বড় ভাইয়ের খরিদ সূত্রে জমি আছে ১০ শতক। মোট ৭০ শতক। আমরা এখানে চাষাবাদ করি। এই দেখেন, এখনো ধান আছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তারা (ফায়ার সার্ভিস) জোরপূর্বক দেওয়াল তুলেছে। চাষাবাদ করতে গেলে বাধা দেয়।’
প্রতিকার চেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা এসিল্যান্ডের কাছে গেছি। তিনি আমাকে বলেছেন, আমাদের ওপর চাপ আছে। আমরা পারছি না। আপনারা আদালতে যান। পরে আমরা কোর্টে মামলাও করেছি।’
মেয়েকে পরীক্ষা দিতে যেতে দেয়নি
বাউন্ডারির ভেতরের বাড়িওয়ালা আবদুল মাজেদ বলেন, ‘১৯৪৩ সাল থেকে পৈতৃকভাবে আমরা এখানে জমির মালিক। বসবাস ও চাষাবাদ করি। আমার দাদার দুই একর জমি ছিল। সেখান থেকে বাবা ভাগ পায় ৪০ শতক। ক্রয় সূত্রে আমার বাবা ৭৬ শতকের মালিক। বাবা থেকে আমি এসব সম্পত্তি (১১৬ শতক) পাই। ১৬ শতকে বাড়ি করে বাকিটুকুতে ধান চাষ করি। তারা হুমকি-ধমকি দিয়ে আমার থেকে দখল নিয়ে যায়, আমি আবার লড়াই করে চাষ করি। এভাবে চলছে। চারদিক থেকে বন্ধ করে আমাদের চলাচল করতেও দেয় না। দেওয়াল দিয়ে আটকে রাখছে। আমার একটা মেয়ের অনার্স পরীক্ষা ছিল, তাকেও যেতে দেয়নি। পরে থানায় গিয়ে অভিযোগ দিয়ে তার যাতায়াতের পথ খুলেছি।’
তিনি বলেন, ‘আমাকে সাতদিনের মধ্যে জায়গা থেকে দখল ছেড়ে উঠে যেতে হুমকি দিয়েছে। মারধর করেছে। দেওয়াল করার সময়ও মারধর করেছে। ফায়ার সার্ভিসের ট্রেনিংয়ের নামে শত শত লোক এসে আমাদের ওপর হামলা করেছে। আমরা অসহায় মানুষ। আমাদের কাগজ আছে, পৈতৃক ভিটায় নিরাপদে থাকতে চাই।’

শহীদুল্লাহ নামে এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘পৈতৃক সূত্রে ১৯৮৪ সাল থেকে আমরা এখানে থাকি। এখানে এমন কোনো দাগ নেই যেখানে আমাদের জমি নেই। আমার নিজের তিন একর এবং আত্মীয়-স্বজনের অংশ মিলে প্রায় চার একর ৮৮ শতাংশ জমি এখানে। আমাদের থেকে এক শতাংশ জমি না কিনে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বাউন্ডারি দিয়েছে। সাড়ে তিনশ ফায়ার কর্মকর্তাকে ট্রেনিংয়ের নামে এখানে এনে, পতিত সরকারের ক্ষমতা ব্যবহার করে, জোরপূর্বক আমাদের লোকদের মেরে, নারীদের গায়ে হাত দিয়ে, চেঁচিয়ে এখান থেকে বের করে দিয়ে ওরা এ জমি দখল করেছে। র্যাবের সহযোগিতা নিয়েছে। ১৪৪ ধারাও তারা তোয়াক্কা করেনি। আমরা একটা শোকজ নোটিশ পাঠিয়েছি, এটাও তোয়াক্কা করেনি। বাংলাদেশ সরকারের কোনো নির্দেশনা-আইন মানেনি।’
তিনি বলেন, ‘বিগত সরকারের আমলে তারা এই জুলুম করেছে। আমাদের সব দলিল আছে। চৌহদ্দি দেওয়া আছে। খতিয়ান করা আছে। খাজনাও দেওয়া আছে। আমরা আমাদের নাগরিক অধিকার চাই। বাংলাদেশের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাদের কাছে আমরা আমাদের অধিকার চাই। সাম্য ও ন্যায়বিচার চাই। এই সরকারের কাছে আমরা অধিকার না পেলে কখনো অধিকার ফিরে পাবো না।’
প্রতিকারের কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন কি না? জবাবে শহীদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা দুদক, ভূমি মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ফায়ার সার্ভিস হেড অফিস, স্থানীয় জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস অফিসসহ সব জায়গায় এ বিষয়ে অভিযোগ করেছি। সবগুলো রিসিভ কপি আছে। ফায়ার সার্ভিস আমাদের বলেছে, আপনাদের জমি আমরা নেবো, তবে মিডিয়ার (দালাল) মাধ্যমে আসেন। আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে তো জমি দেবো না। কারণ মিডিয়া আমাদের খুবই নিম্ন রেট বলে। বিঘা ২০-৩০ লাখ টাকা দিতে চায়। অথচ ফায়ার সার্ভিসের কাছে তারা বিঘাপ্রতি ২-৩ কোটি টাকায় বিক্রি করে।’
পুরো ৮ একর সম্পত্তি নিজেদের দাবি করে সাঁটানো ফায়ার সার্ভিসের সাইনবোর্ড। ছবি জাগো নিউজ
তিনি একটি ম্যাপ দেখিয়ে বলেন, ‘এখানে বাউন্ডারিতে জমি আছে আট একর। কিন্তু ফায়ার সার্ভিস কিনেছে তিন একর। এর মধ্যেও ঝামেলা আছে। ভুয়া মালিক দেখিয়ে দলিল নিয়েছে। অনৈতিক প্রক্রিয়ায় তিন একর দলিল করে নিলেও দখল করছে আট একর।’
আরও পড়ুন
- জমি দখল-জালিয়াতি প্রতিকারে আইন হচ্ছে
- সরকারি জমি দখল করে ইকোপার্ক, গুঁড়িয়ে দিলো প্রশাসন
- অন্যের জমি দখল করার শাস্তি
সরকারি প্রতিষ্ঠান তো জমি অধিগ্রহণ করে, কেনে না। এটা কেনার কারণ আপনাদের কাছে কী মনে হয়েছে? জবাবে শহীদুল্লাহ বলেন, ‘এটা আমরা তাদের কাছে জানতে চেয়েছি। তারা সদুত্তর দিতে পারেনি। তবে আমরা দেখছি, জমি কেনে কল্যাণ তহবিলের নামে। আবার এখানে সাইনবোর্ড দিচ্ছে ফায়ার সার্ভিসের। কাজও করে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পোশাক পরে। এখানে একটা সূক্ষ্ম প্রতারণা আছে।’
রেকর্ডে যা আছে
জমির মালিকদের অভিযোগ ও দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি বুঝতে সেখানকার (উখিয়া) সহকারী কমিশনারের (ভূমি) দপ্তরে যায় জাগো নিউজ। সরকারি রেকর্ড, সৃজিত খতিয়ান, দলিল ও খাজনাখারিজের তথ্য ঘেঁটে পাওয়া গেছে, ‘মহাপরিচালক, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর ও সভাপতি, কেন্দ্রীয় কমিটি, কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ তহবিল’র নামে ০৫/০৪/২০২৩ ইং তারিখে ৭৯৮, ৭৯৯ ও ৮০০ নম্বর দলিল মূলে তিন একর ১৯ শতক জমি কেনা হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন দাতা একই জমি যথাক্রমে ১৪ বছর, ৬ মাস আগে বিক্রি করেন। একজন তো বাবার হেবা করা জমি আগে একজনের কাছে বিক্রি করে আবার ওয়ারিশ সূত্রে একই জমির মালিক দেখিয়ে ফায়ারের ক্ষমতায় খতিয়ান সৃজন করে দলিল দিয়েছেন। নানান অনিয়মের এই দলিল দিয়ে ভূমির জমাখারিজ হওয়ার সুযোগ না থাকলেও এসিল্যান্ডকে চাপ দিয়ে খতিয়ান সৃজন করেছে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ। যার নম্বর ৯০৫৪।
এ বিষয়ে উখিয়ার বর্তমান সহকারী কমিশনার (ভূমি) যারীন তাসনিম তাসিন তার সহকর্মীদের মাধ্যমে সব নথি ঘেঁটে দেখে স্বীকার করে বলেন, ‘জমির মালিকানা নেই বা আগেই বিক্রি করা হয়েছে, এমন জমিও কিনেছে ফায়ার সার্ভিস। তাদের নামে নামজারি খতিয়ানটিও নিয়মমাফিক হয়নি। বিষয়টি আমার নজরে আসছে। এটা আমার আগের অফিসারের সময়ে হয়েছে।’
দখলি জমির এ অংশটির দলিল দেখাতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। ছবি জাগো নিউজ
শুধু তাই নয়, উক্ত দলিল ও খতিয়ানের বাইরে আরও দুটি আলাদা খতিয়ান মূলে বেশকিছু জমির মালিকানা দাবি করছে ফায়ার সার্ভিস। তাদের দাবি করা পুরো জমির পরিমাণ চার একর। নিজেদের দাবি করা চার একর জমির কাগজ নিয়ে এত প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও সেটি মীমাংসা না করে বরং জোরপূর্বক দখলে নিয়েছে আট একর। এর মধ্যে স্থানীয় শহীদুল্লাহর ১২০ শতক, ফজলুল হকের (পাওয়ারে মনিরা বেগম) ১০৬ শতক, আবুল হোসেনের ৪০ শতক, আব্দুর রশিদের ৪০ শতক, আবুল হোসাইন গংদের ৭০ শতক, আব্দুল মাজেদের ৪০ শতক, গোলাম নবীর ৩২ এবং মৌলভি মাহবুব গংদের ৪০ শতাংশ। মোট ৪ একর ৮৮ শতাংশ। এসব ভুক্তভোগী নানান সময়ে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেও প্রতিকার পায়নি।
শুনানি করে চুপসে যায় দুদক
ভুক্তভোগী শহীদুল্লাহর বক্তব্যের আলোকে দুদকেও খোঁজ নেয় জাগো নিউজ। তারা জানিয়েছে, দুদকের তৎকালীন কমিশনার জহুরুল হক উপস্থিত থেকে সব পক্ষকে নিয়ে শুনানি করেন। কমিশনার জহুরুল হক বলেন, ‘যাদের বিরুদ্ধে সত্য অভিযোগ করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে যেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়, এটা আমরা বলেছি। দুদক অফিসকেও জানিয়ে দিয়েছি। ডিসির রিপোর্ট পাওয়ার পর দুদক অফিস একত্র করে ডেকে নেবে।’
আরও পড়ুন
- কক্সবাজারে কর্মচারী সমিতির নামে গণপূর্তের ৩০ শতাংশ জমি দখল
- হোটেল কক্স টুডের দখল থেকে ৩ কোটি টাকার জমি উদ্ধার
- কক্সবাজারে ৫০ কোটি টাকার সরকারি জমি দখলমুক্ত
দুদকের সেই শুনানির একটি ভিডিও ফুটেজও জাগো নিউজের হাতে এসছে। সেখানে ফায়ার সার্ভিসের কক্সবাজার অফিসের তৎকালীন প্রধান অতীশ চাকমা দাবি করেন, “কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে ডুবুরি সেবা দেওয়ার জন্য ডিজি মহোদয় একটা জমির ব্যবস্থা করতে বলেন। আমি ইনানীতে জমি দেখে প্রস্তাবনা দেই। সেটি একনেকে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার জন্য অধিগ্রহণ বাতিল হয়ে যায়। পরে স্বরাষ্ট্র সচিব মহোদয় নিজেই জমি পরিদর্শনে যান। তিনি সেখান থেকেই ‘কল্যাণ তহবিল’র নামে কিনতে বলেন। আমরা জমি যাচাই-বাছাই করে ছয় একর কেনার প্রক্রিয়া করেছি।”
জমির মালিকানা নেই বা আগেই বিক্রি করে ফেলা হয়েছে, এমন জমিও কিনেছে ফায়ার সার্ভিস। এবং তাদের নামে নামজারি খতিয়ানও নিয়মমাফিক হয়নি। বিষয়টি আমার নজরে আসছে। এটা আমার আগের অফিসারের সময়ে হয়েছে।- উখিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) যারীন তাসনিম তাসিন
অনুসন্ধানে ফায়ার সার্ভিসের ১৮/০১/২৪ এর একটি সভার কার্যবিবরণী জাগো নিউজ সংগ্রহ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তা/কর্মচারী কল্যাণ তহবিলের অর্থ থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কল্যাণার্থে কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলার ইনানী মৌজায় এরই মধ্যে ৪ দশমিক ৭৪ একর জমি কেনা হয়েছে।’ ওই সভায় অবশিষ্ট জমি কিনতে ৯ দফা নির্দেশনা দিলেও সেটি প্রতিপালন করা হয়নি।
নিজ কৃষি জমিতে দাঁড়িয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলছেন খালেদা বেগম। ছবি জাগো নিউজ
নেপথ্যে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও আওয়ামী লীগ নেতা
জাগো নিউজের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ফায়ার সার্ভিসের ফিল্ড অফিসার মামুন ও সংস্থাটির ক্রয় কমিটির সভাপতি ইকবাল বাহার বুলবুল এই কাজে সম্পৃক্ত। তাদের সঙ্গে সহযোগী জালিয়া পালং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু তাহের ও তার ছেলে ইউসুফ নূর এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা কালো জমির ওরফে মানবপাচারকারী জমির। এছাড়া জমির দালাল মোস্তাক ও জসিম মাস্তান। এরা মূলত একটি সিন্ডিকেট। ৫ আগস্টের পর এদের কারও খোঁজ নেই। ফায়ার সার্ভিসের ক্ষমতা ব্যবহার করে ভয়ভীতি, মারধরসহ নানানভাবে চাপ প্রয়োগ করে কম মূল্যে (ন্যায্য দামেরও অর্ধেক) গ্রাহক থেকে জমি নিয়ে চড়া মূল্যে (দ্বিগুণ-তিনগুণ) ফায়ার সার্ভিসের কাছে বিক্রি করে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই চক্রটি নিজেদের পকেট ভারী করতে ভুল বুঝিয়ে ফায়ার সার্ভিসের তৎকালীন ডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মইন ও আইসিটি প্রতিমন্ত্রী পলককেও ব্যবহার করেছে। ডিজি ও প্রতিমন্ত্রীর প্রভাব এবং তদবিরে সায় দিয়েছেন সুরক্ষা সেবা বিভাগের তৎকালীন একজন উপসচিব, তৎকালীন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক, কক্সবাজার জেলা ভূমি কর্মকর্তা, তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ফায়ার সার্ভিসের কক্সবাজার প্রধান অতীশ চাকমা।
কর্মকর্তাদের সরল স্বীকারোক্তি
এনিয়ে নানান সময়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা গণমাধ্যমে নানান রকম কথা বলেন। এমনকি চরম অনিয়ম ও নির্যাতনকে তারা সহজভাবেই দেখছেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে সংস্থাটির ক্রয় কমিটির সভাপতি (সহকারী পরিচালক) ইকবাল বাহার বুলবুল বলেন, ‘জমি তো কক্সবাজারের ইনানীতেই রয়েছে। জমি তো এমন নয় যে, আমরা প্লেনে করে উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। তাতে সমস্যা কী? আমরা শুধু আমাদের ডিমারকেশন (সীমানির্ধারণ) বসাচ্ছি, তাতে মহল্লার লোকজন বুঝতে পারবে, এতটুকু জমি ফায়ার সার্ভিস নিচ্ছে। তখন তাদের মধ্যে যারা ভেতরে পড়বে, তারা আসবে, কাগজ দেখাবে যে আমারটা ভেতরে পড়ছে, আমার কাগজ এই, আমারটা নিয়ে নেন।’
জমি তো কক্সবাজারের ইনানিতেই রয়েছে। জমি তো এমন নয় যে, আমরা প্লেনে করে উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। তাতে সমস্যা কী? আমরা শুধু আমাদের ডিমারকেশন (সীমানির্ধারণ) বসাচ্ছি, তাতে মহল্লার লোকজন বুঝতে পারবে, এতটুকু জমি ফায়ার সার্ভিস নিচ্ছে। তখন তাদের মধ্যে যারা ভেতরে পড়বে, তারা আসবে, কাগজ দেখাবে যে আমারটা ভেতরে পড়ছে, আমার কাগজ এই, আমারটা নিয়ে নেন।- ফায়ার সার্ভিসের ক্রয় কমিটির সভাপতি সহকারী পরিচালক ইকবাল বাহার বুলবুল
ঘটনাস্থলে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় ইনানী প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক ও ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার সাফায়েত হোসেনের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা যেখানে বাউন্ডারি দিয়েছি, সে জায়গাটি আমাদের। আমরা যাচাই করেই কিনেছি। তবে মাঝখানে কিছু জায়গা আছে ভিন্ন মালিকের। তাদের কেউ দেশের বাইরে আছে। কেউ দেশে। তারা চাষবাস করে খাচ্ছে। তাদের আমরা বলেছি, তারা কাগজপত্র আনলে ফায়ার সার্ভিস উপযুক্ত দাম দিয়ে নিয়ে নেবে।’
নিজ জমির সামনে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলছেন ভুক্তভোগী শহীদুল্লাহ। ছবি জাগো নিউজ
এ বিষয়ে একই সুরে কথা বলেন ফায়ার সার্ভিস কক্সবাজারের উপ-সহকারী পরিচালক মো. তানহারুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘জমিজমা তো সরাসরি কেনা যায় না। ব্রোকার (দালাল) লাগে। আমি যতটুকু জানি জমির নামে একজনের সঙ্গে আমাদের ক্রয় কমিটির চুক্তি হয়েছে। আমাদের এত শতাংশ বা একর জমি এত টাকার বিনিময়ে দেবে। সে কত দিয়ে নেবে, সেটা আমাদের বিষয় নয়। সেভাবেই ওই লোক আমাদের জমি কিনে দিয়েছে। আমরা কিনেছি। এখানে কিছু লোকের মালিকানা নিয়ে সমস্যা আছে, সেটা কেনা যাচ্ছে না। এগুলো নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।’
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহ্উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি যতটুকু জানি ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ তহবিলের নামে জমি কিনছে। তবে, কাউকে মারধর করা বা জোর করে নেওয়া তো যে কারও জন্যই বৈধ নয়। এটা অন্যায়।’
চাপের মুখে নামজারির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সেটা মিসকেস করার সুযোগ আছে। তবে, আমি বিষয়টি শুনবো। দেখবো আমাদের কিছু করার আছে কি না।’
নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করলেও ঘটনার শান্তিপূর্ণ সমাধান চান ফায়ার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহেদ কামাল। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এটা আমাদের কল্যাণ তহবিল থেকে কেনা হচ্ছে। ওখানে আট একর জায়গা ঘেরাও করা হয়নি। যতটুকু কেনা হয়েছে, ততটুকু ঘেরাও করা হয়েছে। যে জায়গায় বিতর্ক আছে, সেখানে বাউন্ডারি দেওয়া হয়নি। যারা মালিক তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলছে।’
তার দাবি, ‘অনার্স পড়ুয়া ছাত্রীকে আটকে দেওয়ার ঘটনা ঘটেনি। আর জমির মালিকদেরও মারধর করা হয়নি। বরং ওনাদের (জমির মালিকদের) হামলায় আমাদের কিছু কর্মী আহত হয়েছে। এ ঘটনায় ফৌজদারি মামলাও আমাদের পক্ষ থেকে করা হয়েছে। ওখানকার যে সমস্যা, সেটার শান্তিপূর্ণ সমাধান আমরা চাই। সেজন্য একটা কমিটিও করে দেওয়া হয়েছে। কমিটি কাজ করছে।’
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অগ্নি অনুবিভাগের (ফায়ার সার্ভিসের তদারক) দায়িত্বে নিয়োজিত অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ সরকার জাগো নিউজকে বলেন, ‘ভূমি অধিগ্রহণের বাইরে কিনতে হলে আমাদের অনুমতি নেওয়ার কথা। নিয়েছে কি না আমার জানা নেই। আমি নতুন আসছি। খোঁজ নেবো।’
বাড়িওয়ালা আব্দুল মাজেদ তার কৃষি জমিতে দাঁড়িয়ে, অথচ পেছনে সাইনবোর্ড ফায়ার সার্ভিসের। ছবি জাগো নিউজ
‘কাজটি বেআইনি, ফাঁসবে সংশ্লিষ্টরা’
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘যে কোনো সম্পত্তি তার মালিকের ভোগ-দখলের অধিকার আছে। এটা সংবিধান স্বীকৃত। শুধু সরকার জনস্বার্থে অধিগ্রহণ করতে পারে। সেক্ষেত্রে মালিককে টাকা দিয়ে অধিগ্রহণ করতে পারবে। কিন্তু জোর করে পরের জমিতে প্রতিষ্ঠান তৈরি করবেন, এটা সম্পূর্ণ বেআইনি। যারা করছে, তারা সার্ভিসের লোক হলে সার্ভিস রুলস ভঙ্গের কারণেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। মালিকরা বিষয়টি কোর্টের নজরে আনতে পারেন।’
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ও দুদক সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান ইফতেখারুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিস জাতীয় স্বার্থে কর্মরত একটা বাহিনী। তারা যে কাজটা করছে, তারা শুধু আইনের লঙ্ঘনই করছে তা নয়, বহুমাত্রিক অনিয়মের মাধ্যমে মানুষের ওপর অত্যাচার করছে রীতিমতো। ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। যার অপর নাম দুর্নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। ফায়ার সার্ভিসের মতো সংস্থার এমন কার্যক্রম যে কোনো প্রেক্ষিতেই অগ্রহণযোগ্য।’
তিনি বলেন, ‘কর্তৃত্ববাদী সময়ে কোনো কারণে তৎকালীন মহাপরিচালক বা ফায়ার সার্ভিস যদি করে, সেটার দায় আমরা তাদের দিতে পারতাম। কিন্তু এখন পট পরিবর্তনে পরও যেহেতু বর্তমান কর্তৃপক্ষ একই ধারা অব্যাহত রেখেছে, মানুষের ওপর অন্যায় করছে, মানুষের অধিকার খর্ব করছে। এটা বৈষম্যবিরোধী চেতনার পরিপন্থি এবং এটা তাদের (ফায়ার সার্ভিস) মূল ম্যান্ডেটের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এর সঙ্গে যারা জড়িত, ফায়ার সার্ভিসের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ এর দায় এড়াতে পারে না। এমনকি তাদের পর্যবেক্ষক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও দায় এড়াতে পারে না কোনোভাবেই।’
কক্সবাজার-ইনানী মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশে সাঁটানো ফায়ার সার্ভিসের সাইনবোর্ড। ছবি জাগো নিউজ
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘আমি মনে করি, এখানে সার্বিকভাবে অনিয়ম করা হচ্ছে। মানুষের ওপর অনাচার ও অধিকার খর্ব করা হচ্ছে, এটার সুস্পষ্ট জবাবদিহি ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া উচিত। যাদের জমি দখল করা হয়েছে, তাদের ক্ষতিপূরণসহ জমি ফেরত দিতে হবে। ক্ষতিপূরণ ফায়ার সার্ভিসকেই দিতে হবে।’
এসইউজে/এএসএ/এমএস/এএসএম