নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ
খেজুরের কাঁচা রস পান পরিহার করুন
নিপা ভাইরাসের ইতিহাস : নিপাহ ভাইরাস হচ্ছে জুনোটিক ডিজিজ, যা প্রাণীর দেহ থেকে মানব শরীরে সংক্রমিত হয়। ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ার ‘সুঙ্গাই নিপাহ’ গ্রামে প্রথম এই ভাইরাসের প্রকোপ দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে ঐ গ্রামের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় ‘নিপাহ’ ভাইরাস। সেখানে বাড়ির পোষ্য কুকুর, বিড়াল, ঘোড়া, ছাগলের দেহে এই ভাইরাসের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। ঐ অঞ্চলে প্রতিটি বাড়িতেই শূকর প্রতিপালিত হয়। গবেষণায় দেখা যায়, শূকর থেকেই নিপাহ ভাইরাস ছড়িয়েছে পোষ্যদের দেহে। ১৯৯৯ সালে শূকরের শরীরে ভাইরাসটি আবিষ্কার করেন ড. কো বিং চুয়া।
বাংলাদেশে নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ : বাংলাদেশে নিপা ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় ২০০১ সালে, এরপর থেকে প্রায় প্রতি বছরই শীত মৌসুমে কমবেশি এর সংক্রমণ দেখা যায়। এ পর্যন্ত প্রায় ৩৪৭ জন নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ২৪৯ জন মারা গেছে। সর্বশেষ ২০২৪ ও ২০২৫ সালে যথাক্রমে ৫ ও ৪ জন আক্রান্ত হয় এবং তাদের সবাই মারা গেছেন। যদিও প্রতি বৎসর আক্রান্তের সংখ্যা খুব বেশি নয়, তবুও বাংলাদেশকে এ রোগের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ভাইরাসের বাহক এবং কীভাবে ছাড়ায় : ভাইরাসটির প্রধান বাহক হলো বাদুড়, যা থেকে মানুষ এ রোগে সংক্রমিত হয়। বাদুড়ের লালা এবং মলমূত্র থেকে ভাইরাসটি অতি সহজেই মানুষের দেহে প্রবেশ করে। এটি শুকরের বর্জ্য থেকেও ছড়াতে পারে। প্রাণীর দ্বারা দূষিত খাবার বা আক্রান্ত ব্যক্তি থেকেও এটি ছড়াতে পারে। আক্রান্ত মায়ের বুকের দুধ পান করলে শিশুও আক্রান্ত হতে পারে। বাংলাদেশে শীত মৌসুমে, ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। সাধারণত খেজুরের কাঁচা রস পানের মাধ্যমে এ ভাইরাস সংক্রমিত হয়। কারণ এ সময়টাতেই খেঁজুরের রস সংগ্রহ করা হয়। আর বাদুড়, গাছে বাঁধা হাঁড়ি থেকে রস খাওয়ার চেষ্টা করে বলে ওই রসের সঙ্গে তাদের লালা মিশে যায়। এমনকি রস খাওয়ার সময় বাদুড় মলমূত্র ত্যাগ করলে, সে রসে ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। বাদুড়টি নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে থাকলে এবং সেই রস পান করলে মানুষের মধ্যেও এ রোগ ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া বাদুড়ে আংশিক খাওয়া ফলমূল খেলেও এ রোগ ছড়াতে পারে।
রোগের লক্ষণ : ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশের ৫ থেকে ১৪ দিন পর রোগের লক্ষণ দেখা দেয়। কেউ কেউ উপসর্গহীন থাকতে পারে। কারও আবার শুধু সাধারণ জ্বর-কাশি দেখা দিতে পারে। লক্ষণ প্রকাশ ছাড়াও ৪৫ দিন পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় এটি শরীরের মধ্যে থাকতে পারে। শুরুতে প্রচণ্ড জ্বর, মাথা ও পেশিতে ব্যথা, খিঁচুনি, শ্বাসকষ্ট, কাশি, পেট ব্যথা, বমি, দুর্বলতা ইত্যাদি দেখা দিতে পারে। এ রোগে মস্তিষ্কে এনসেফালাইটিস জাতীয় ভয়াবহ প্রদাহ দেখা দেয় এবং রোগী অসংলগ্ন আচরণ, প্রলাপ বকা, ঘুমঘুম ভাব, মানসিক ভারসাম্যহীনতা, খিঁচুনি এবং অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে রোগী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। আর যারা বেঁচে যান তারা অনেকেই স্মৃতি হারিয়ে ফেলেন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন না, এমনকি পঙ্গু হয়ে যেতে পারেন চিরতরে।
নিপা শনাক্তকরণের পরীক্ষা : এলাইজা টেস্ট, পিসিআর, সেল কালচার প্রভৃতি পরীক্ষার মাধ্যমে এ ভাইরাস শনাক্ত করা সম্ভব।
চিকিৎসা : এখন পর্যন্ত নিপাহ ভাইরাসের কোনো ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। রোগের লক্ষণ দেখামাত্রই রোগীকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে, প্রয়োজনে আইসিইউও লাগতে পারে। সাধারণত লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে হয়। আক্রান্ত রোগীর দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থা করলে জীবন রক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
সেবাদানকারী স্বাস্থ্যকর্মীদের সতর্কতা : এ রোগে আক্রান্তদের পরিচর্যা করতে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। রোগীর চিকিৎসায় নিয়োজিত ডাক্তার, নার্সদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। যেমন-মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভ্স, সারা শরীর আবৃত করে গাউন বা পিপিই ব্যবহার করতে হবে। রোগী দেখার পর হাত ভালোভাবে ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করা খুবই জরুরি। রোগীর ব্যবহার করা কাপড় ও অন্যান্য সামগ্রী ভালোভাবে পরিষ্কার না করে আবার ব্যবহার করা যাবে না। রোগীর কফ ও থুতু যেখানে-সেখানে না ফেলে একটি পাত্রে রেখে তা মাটির নিচে পুঁতে বা পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
এ রোগে আক্রান্তদের পরিচর্যা করতে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। রোগীর চিকিৎসায় নিয়োজিত ডাক্তার, নার্সদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। যেমন-মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভ্স, সারা শরীর আবৃত করে গাউন বা পিপিই ব্যবহার করতে হবে। রোগী দেখার পর হাত ভালোভাবে ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করা খুবই জরুরি। রোগীর ব্যবহার করা কাপড় ও অন্যান্য সামগ্রী ভালোভাবে পরিষ্কার না করে আবার ব্যবহার করা যাবে না। রোগীর কফ ও থুতু যেখানে-সেখানে না ফেলে একটি পাত্রে রেখে তা মাটির নিচে পুঁতে বা পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
প্রতিরোধে করণীয় : শীতের সময় খেজুরের রস পান করা খুবই জনপ্রিয়। কিন্তু পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন জরুরি।
(১) খেজুরের কাঁচা রস কোনোভাবেই পান করা উচিত নয়। পান করতে হলে টগবগ করে ফুটিয়ে নিতে হবে। তবে খেজুরের রসের তৈরি গুড় ক্ষতিকর নয়। এমনকি খেজুরের রসের রান্না করা পায়েস, পিঠা খাওয়া নিরাপদ।
(২) গাছ থেকে রস সংগ্রহের ঝোলানো হাঁড়ি বা রস সংগ্রহের স্থানে নেট, পলিথিন বা বাঁশের বানা দিয়ে হাঁড়ি ঢেকে রাখতে হবে, যাতে বাদুড় রসে মুখ দিতে না পারে। কোনোভাবেই যেন বাদুড়ের লালা, মলমূত্র, রসের সঙ্গে মিশে না যায়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
(৩) যারা রস সংগ্রহ করেন, তারা যেন সতর্ক থাকেন। কারণ হাঁড়ির আশপাশে বাদুড়ের লালা লেগে থাকতে পারে। মাস্ক পরতে হবে এবং রস সংগ্রহের পর সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিতে হবে।
(৪) খেজুরের রস বিক্রেতারা যেন কাঁচা রস বিক্রি না করেন।
(৫) ফলমূল পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে খেতে হবে। পাখি বা বাদুড়ে খাওয়া আংশিক ফল যেমন-আম, লিচু, জাম, জামরুল, গোলাপজাম, কাঁঠাল, ডেউয়া, পেঁপে, পেয়ারা, বরই ইত্যাদি না খাওয়াই ভালো।
(৬) হাতের মাধ্যমে ভাইরাসটি ছড়াতে পারে, তাই নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস করতে হবে।
(৭) আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে এবং রোগীর পরিচর্যা করার সময় যথোপযুক্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। পরে সাবান ও পানি দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুতে হবে।
(৮) আক্রান্ত মা বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করতে হবে।
সাবধানতা : এ রোগের কোনো টিকা আবিষ্কার হয়নি। তাই ব্যক্তিগত সচেতনতা এবং সাবধানতা অবলম্বন করা খুবই জরুরি। নিচে কিছু টিপস দেওয়া হলো :
(১) নিপাহ ভাইরাস শরীরে প্রবেশের ৫ থেকে ১৪ দিন পর রোগের লক্ষণ প্রকাশ হয়। তাই আক্রান্ত এলাকায় যারা খেজুরের রস পান করেছেন, তাদের সবাইকে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।
(২) আক্রান্ত মানুষ থেকে মানুষেও ছড়াতে পারে এ রোগ। তাই যারা রোগীদের সেবা দিয়েছেন এবং মৃতদের সৎকার করেছেন, তাদেরকেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
(৩) নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর কাছে বিনা প্রয়োজনে কারো না যাওয়া ভালো।
(৪) রোগীর সঙ্গে একই পাত্রে খাওয়া বা একই বিছানায় ঘুমানো যাবে না।
(৫) রোগীর ব্যবহার করা কাপড় ও অন্যান্য সামগ্রী ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে।
(৬) যে এলাকায় নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, সে এলাকায় নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ বন্ধ হওয়ার পর আরও অন্তত ২১ দিন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যেতে হবে এবং যে এলাকায় প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, সেখানে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
(৭) খেজুরের কাঁচা রস খেয়ে যে কোনো রোগী জ্বরে আক্রান্ত হয়ে শ্বাসকষ্ট বা অজ্ঞান হলে দেরি না করে কাছের ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ এবং প্রয়োজনে হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে। তাছাড়া নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়া কোনো দেশ থেকে কেউ বাংলাদেশে এলে তাকে অবশ্যই পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
নিপাহ ভাইরাসের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা বা ভ্যাকসিন নেই, তাই আতঙ্কিত না হয়ে সচেতনতা ও প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হবে। কাঁচা রস পান বন্ধে প্রয়োজনে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে।
লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।
এইচআর/এমএস