কারাগারে মৃত্যু

রাষ্ট্র দায় এড়াতে পারে না

আমীন আল রশীদ
আমীন আল রশীদ আমীন আল রশীদ , সাংবাদিক, কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১০:১৪ এএম, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন কারাবন্দি অবস্থায় মারা গেছেন। গণমাধ্যমের খবর বলছে, শনিবার (৭ জানুয়ারি) সকাল ৯টায় দিনাজপুর জেলা কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক সকাল সাড়ে ৯টায় তাকে মৃত ঘোষণা করেন। রমেশ চন্দ্র সেনের বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর ওই বছরের ১৭ আগস্ট নিজ বাড়ি থেকে রমেশ চন্দ্র সেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি হত্যাসহ ৩টি মামলায় কারাগারে ছিলেন।

অভ্যুত্থানের পরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের গত দেড় বছরে এরকম আরও অনেক আওয়ামী লীগ নেতার কারাগারে মৃত্যু হয়েছে।

গত ২৪ জানুয়ারি মেহেরপুর জেলা কারাগারে বন্দী গোলাম মোস্তফা (৫৫) নামের এক আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু হয়। এই মৃত্যুর খবরেও বলা হয়, কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয় এবং সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ২০১৩ সালে ‘কথিত বন্দুকযুদ্ধে’ জামায়াত নেতা তারিক মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ নিহত হওয়ার ঘটনায় হওয়া হত্যা মামলা ও সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল।

গত ২২ সেপ্টেম্বর গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবু বক্কর সিদ্দিক মুন্নার (মুন্না চেয়ারম্যান) মৃত্যু হয় গাইবান্ধা জেলা কারাগারে। হঠাৎ তার এ মৃত্যুতে জেলায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এই মৃত্যুর খবরটিও এরকম যে, সকালে মুন্না চেয়ারম্যান কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত তাকে গাইবান্ধা সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।

এর ঠিক দুই মাস পরে এই গাইবান্ধা জেলাতেই তারিক রিফাত নামে এক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু হয়। গোবিন্দগঞ্জে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানোর কিছুক্ষণ পরেই অসুস্থ হয়ে মারা যান তিনি। কারা কর্তৃপক্ষের দাবি, তাকে গাইবান্ধা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। যদিও দায়িত্বরত চিকিৎসক জানান, হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।

ঢাকা উত্তরের ১৯ নম্বর ওয়ার্ড মহিলা লীগের সভাপতি মনোয়ারা মজলিশ গত ২৬ নভেম্বর ঢাকা মেডিকেলে মারা যান। পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতালে দুইদিন রেখে ঠিকমতো চিকিৎসা না দিয়ে তাদের জানানো হয়। মৃত মনোয়ারার স্বামী মজলিস মিয়ার অভিযোগ, কিডনির সমস্যা থাকলেও হাসপাতালে কোনো চিকিৎসা দেয়া হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের চার মাসের মাথায় ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর ডয়েচেভেলের একটি খবরের শিরোনাম: কারাগারে চার আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন। খবরে বলা হয়, বগুড়া জেলা কারাগারে এক মাসে চার আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু হয়েছে। জেল সুপার বলেছেন, চারজনই হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন।

কারা কর্তৃপক্ষের দাবি, সবাই হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। তাদের প্রত্যেকের ময়না তদন্ত হয়েছে এবং থানায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। কোনো নির্যাতন বা অবহেলায় কেউ মারা যাননি। তাদের সবাই বয়স্ক এবং নানা রোগে ভুগছিলেন। যদিও আওয়ামী লীগ নেতা শহিদুল ইসলাম ওরফে রতনের তার স্ত্রী শাহিদা বেগম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘আমার মনে হয় কিছু করেই মেরে ফেলেছ। তা না হলে এত অল্প সময়ে এতগুলো মানুষ মরবে কেন?’

আরেক আওয়ামী লীগ নেতার স্ত্রী বলেন, ‘আমার স্বামীর হার্টের কোনো রোগ ছিল না। অথচ কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, তিনি হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। আমরা কিছু ভাবতে পারছি না। এখন যা পরিবেশ-পরিস্থিতি তাতে আমরা অভিযোগ করার কথা চিন্তা করতে পারছি না। এখন আমাদের টিকে থাকাই কষ্ট।’

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী ১৫ মাসে ১১২ জন কারা হেফাজতে মারা গেছেন।

কারাগারে মৃত্যু হলেও কারা কর্তৃপক্ষ সেটি সাধারণত স্বীকার করে না। বরং দাবি করে যে, কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে হাসপাতালে নেয়া হয় এবং সেখানে তার মৃত্যু হয়। অর্থাৎ কারা কর্তৃপক্ষ মৃত্যুর দায় গ্রহণ করে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একজন প্রবীণ মানুষ এবং যিনি স্বাভাবিকভাবেই নানাবিধ রোগে আক্রান্ত এবং কারাগারের অস্বাভাবিক পরিবেশে থাকতে থাকতে যিনি আরও বেশি অসুস্থ হয়ে গেছেন—তার উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা কারাগারে হয় না। যদিও টাকা থাকলে কারাগারে সব সুবিধাই মেলে—এমন অভিযোগও বেশ পুরোনো। কারাগারে বসে স্মার্টফোন চালানো এবং ব্যবসার সকল কাজকর্ম করা—কোনো কিছুই থেমে থাকে না। কিন্তু এই সুযোগ সবার ক্ষেত্রে হয় না। বিশেষ করে এই সরকারের আমলে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতারা এই সুযোগ পাবেন না বা কারা কর্তৃপক্ষ তাদেরকে এই সুযোগ কেউ করে দেবে না। ফলে কারো যদি সত্যিই উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, সেটি তারা পাবেন না—এটিই এখন স্বাভাবিক হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এমনকি বিনা চিকিৎসায় বা পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে কারাগারে কারো মৃত্যু হলে তাতে সরকারের কিছু যায় আসে বলে মনে হয় না, বা বলা যায় যে, সরকার এগুলো আমলে নেয় না। কারণ সরকার জানে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কোনো নেতার কারাগারে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু হলেও তার প্রতিবাদে বড় কোনো মিছিল হবে না।

কারা হেফাজতে মৃত্যু (Custodial Death) আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুতর একটি বিষয়। জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী, যখন কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় হেফাজতে (জেল বা পুলিশি হেফাজত) থাকেন, তখন তার জীবনের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়ভার রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়। সেই হিসাবে কারাগারে প্রত্যেক বন্দির চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এমনকি ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিও কারাগারে বিনা চিকিৎসায় মারা যাবনে না, এটাই কাঙ্ক্ষিত। এটাই একটি আধুনিক ও মানবিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য। যদিও এই ধরনের রাষ্ট্র এখনও আমাদের জন্য স্বপ্ন।

ম্যান্ডেলা রুলস নামে জাতিসংঘের একটি নিয়মে বলা হয়েছে: বন্দিদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা; যদি কোনো বন্দী মারা যান, তবে কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে তার পরিবারকে জানাতে হবে; প্রত্যেকটি মৃত্যুর ক্ষেত্রে একটি নিরপেক্ষ এবং স্বাধীন তদন্ত হতে হবে, যাতে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং কোনো অবহেলা বা নির্যাতন ছিল কি না তা বেরিয়ে আসে। কিন্তু বাংলাদেশের কারাগারে বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে থাকা অবস্থায় কারো মৃত্যু হলে তার কোনো সঠিক তদন্ত হয় না। এমনকি মৃত অথবা নিহতদের পরিবারও সরকারের সঙ্গে ঝামেলায় জড়ানোর ভয়ে এসব নিয়ে সাধারণত আদালতেরও শরণাপন্ন হয় না।

জাতিসংঘের ১৯৮৪ সালের নির্যাতন বিরোধী কনভেনশন (Convention against Torture) অনুযায়ী হেফাজতে থাকা অবস্থায় কোনো ব্যক্তির ওপর শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন চালানো আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। যদি নির্যাতনের কারণে মৃত্যু ঘটে, তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশেও হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইনে স্পষ্ট বলা আছে যে, হেফাজতে থাকা অবস্থায় তার পূর্ণ নিরাপত্তা ও সুরক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের এবং হেফাজতে থাকা অবস্থায় কারো মৃত্যু হলে দায়িত্বরত প্রত্যেকে বিচারের সম্মুখীন হবে। কিন্তু বন্দি থাকা অবস্থায় কারো মৃত্যু হলেই সেটিকে হার্ট অ্যাটাক বা পুরোনো অসুখে মৃত্যু বলে চালিয়ে দেয়া হয়। এমনকি সঠিক তদন্তও হয় না।

দীর্ঘদিন অচল থাকার পরে সম্প্রতি হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতির মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন করা হয়েছে। মইনুল অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত গুম কমিশনেরও চেয়ারম্যান ছিলেন। নবগঠিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে আরও আছেন গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্য মো. নূর খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম, গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্য নাবিলা ইদ্রিস ও মানবাধিকার কর্মী ইলিরা দেওয়ান। সদস্যদের মধ্যে নুর খানা দীর্ঘদিন আইন ও সালিশ কেন্দ্রেও কাজ করেছেন। মানবাধিকারকর্মী হিসেবে তার সুনাম আছে। সুতরাং এই কমিশন সাম্প্রতিক সময়ে কারাগারে মৃত্যুর ঘটনাগুলোর তদন্তে উদ্যোগ নেবে এবং কারো মৃত্যুর পেছনে সত্যিই যদি কারা কর্তৃপক্ষের গাফিলতি বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে সরকারকে সুপারিশ করবে—এটিই প্রত্যাশা।

আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক।

এইচআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।