ভয়মুক্ত সাংবাদিকতা: সত্যের পথে নির্ভীক যাত্রা
একটি সচল ও কার্যকর গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যমকে বিবেচনা করা হয়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেবল সাংবাদিকদের অধিকার নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের ‘জানার অধিকার’র সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তবে এই স্বাধীনতার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে দায়বদ্ধতা। স্বাধীনতা যদি দায়বদ্ধতাহীন হয়, তবে তা অনেক সময় জনস্বার্থের বিপরীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বলতে বোঝায় কোনো সেন্সরশিপ বা বাধা ছাড়াই তথ্য সংগ্রহ, প্রকাশ এবং প্রচারের অধিকার। ২০২৫ সালের ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স’-এ বাংলাদেশের অবস্থান ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৪৯তম, যা গত বছরের তুলনায় কিছুটা উন্নত হলেও পরিস্থিতি এখনো ‘ভীষণ গুরুতর’ ক্যাটাগরিতে রয়ে গেছে। গণমাধ্যম যখন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তখন সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয় এবং দুর্নীতির চিত্র জনসমক্ষে আসে।
বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ৫০ সদস্যের একটি শক্তিশালী মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, মঙ্গলবার বিকেলে মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের পরদিন বুধবার দুপুর সোয়া ১টার মধ্যেই নতুন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন সচিবালয়ে তার কার্যভার গ্রহণ করেন। প্রশাসনের এই দ্রুত তৎপরতা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে নতুন সরকারের অগ্রাধিকার ও রাজনৈতিক সদিচ্ছারই বহিঃপ্রকাশ। একজন মিডিয়া স্টাডিজ গবেষক হিসেবে আমি মনে করি, এই পরিবর্তন কেবল ব্যক্তিবদলের নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভকে পুনর্গঠনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ।
এই নতুন নেতৃত্বের সূচনালগ্নেই সংবাদমাধ্যমের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট ও বৈপ্লবিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যা আমাদের গণমাধ্যম সংস্কৃতির খোলনলচে বদলে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনই ‘ভয়মুক্ত সাংবাদিকতা’র একটি নতুন আখ্যান তৈরি করেছেন। এটি কেবল কোনো রাজনৈতিক অলঙ্কার নয়, বরং এটি পেশাদার সাংবাদিকতার জন্য একটি সুরক্ষিত ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে নিরাপদ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার অঙ্গীকার। সচিবালয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি তার দর্শনের মূল কথাটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন-
‘আমরা বাংলাদেশে একটা ভয়মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরি করব, ইনশাল্লাহ।’ একজন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে মন্ত্রীর এই প্রতিশ্রুতির পেছনে রয়েছে গভীর ‘অভিজ্ঞতালব্ধ প্রজ্ঞা’। তার এই অঙ্গীকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মন্ত্রী নিজে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নজরদারি ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করেছেন। এই ব্যক্তিগত দহন তাকে সাংবাদিকদের ‘মানসিক যন্ত্রণা’ বুঝতে এক অনন্য সক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতা দান করেছে।
তিনি বিশ্বাস করেন, একজন সাংবাদিক যদি সারাক্ষণ ব্যক্তিগত ও পেশাগত নিরাপত্তার শঙ্কায় থাকেন, তবে তার পক্ষে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করা অসম্ভব। তাই তার প্রতিশ্রুতিটি সরাসরি সাংবাদিকতার নৈতিক মানের উন্নয়ন ঘটানোর লক্ষ্যে নিবেদিত। তবে এই উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে বর্তমানে কিছু সুগভীর প্রাতিষ্ঠানিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাধা বা চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান রয়েছে।

একাডেমিক দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংবাদমাধ্যমের ওপর রাষ্ট্রীয় বা অন্য কোনো গোষ্ঠীর অদৃশ্য ‘নজরদারি’ কেবল তথ্যের প্রবাহই রোধ করে না, বরং এটি সাংবাদিকদের মধ্যে এক ভয়াবহ ‘চিলিং’ তৈরি করে। ফলে সাংবাদিকরা স্ব-নিয়ন্ত্রণ করতে বাধ্য হন, যা গণতন্ত্রের জন্য আত্মঘাতী। তথ্যমন্ত্রী সঠিকভাবে এই মানসিক যন্ত্রণাকে চিহ্নিত করেছেন।
যখন একজন সংবাদকর্মী জানেন যে তার প্রতিটি শব্দ ও পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, তখন তিনি সত্য প্রকাশের চেয়ে আত্মরক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দেন, যা 'চতুর্থ স্তম্ভ' হিসেবে সংবাদমাধ্যমের মর্যাদা ধূলিসাৎ করে।
‘ভয়ের সংস্কৃতি’ পেশাদার সাংবাদিকদের মধ্যে গভীর ‘মানসিক যন্ত্রণা’ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে। এই মনস্তাত্ত্বিক বৈকল্য সাংবাদিকতাকে একটি সৃজনশীল পেশার বদলে একটি ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্লান্তিকর কাজে পরিণত করে।
তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনই ‘ভয়মুক্ত সাংবাদিকতা’র একটি নতুন আখ্যান তৈরি করেছেন। এটি কেবল কোনো রাজনৈতিক অলঙ্কার নয়, বরং এটি পেশাদার সাংবাদিকতার জন্য একটি সুরক্ষিত ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে নিরাপদ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার অঙ্গীকার। সচিবালয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি তার দর্শনের মূল কথাটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন- ‘আমরা বাংলাদেশে একটা ভয়মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরি করব, ইনশাল্লাহ।’ একজন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে মন্ত্রীর এই প্রতিশ্রুতির পেছনে রয়েছে গভীর ‘অভিজ্ঞতালব্ধ প্রজ্ঞা’। তার এই অঙ্গীকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার জন্যই নতুন প্রশাসন একটি সমাধানমুখী ও সংস্কারপন্থি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে। সংবাদমাধ্যমের এই প্রস্তাবিত সংস্কার কেবল কোনো একক মন্ত্রীর সদিচ্ছা নয়, বরং এটি বর্তমান সরকারের একটি সুসংগত ‘রাষ্ট্রীয় দর্শন’। এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি ও আইনি বৈধতা আসছে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থেকে। তথ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মূল রাষ্ট্রীয় রূপরেখার মধ্যেই সংবাদমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা কোনো করুণা নয়, বরং এটি প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় সংস্কার পরিকল্পনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তথ্যমন্ত্রীর লক্ষ্য হলো এই রাজনৈতিক দর্শনকে আমলাতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক স্তরে একটি দৃশ্যমান বাস্তবে রূপদান করা। সরকারের এই উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত পরিকল্পনা সংবাদমাধ্যমকে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের পথ প্রশস্ত করছে, যা শেষ পর্যন্ত দেশ ও জনগণের বৃহত্তর কল্যাণ বয়ে আনবে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এবং বাংলাদেশেও গণমাধ্যম নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। একদিকে ডিজিটাল নিরাপত্তা বা সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো কঠোর আইনের ভীতি, অন্যদিকে কর্পোরেট মালিকানার প্রভাব সাংবাদিকদের স্বাধীনতায় বাধা সৃষ্টি করছে। এর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার বা ‘ফেক নিউজ’র ভিড়ে মূলধারার গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতা একটি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। স্বাধীনতা ছাড়া গণমাধ্যম পঙ্গু, আবার দায়বদ্ধতা ছাড়া তা বিপজ্জনক। একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে রাষ্ট্রকে যেমন গণমাধ্যমের ওপর থেকে অযাচিত নিয়ন্ত্রণ সরিয়ে নিতে হবে, তেমনি সাংবাদিকদেরও পেশাদারত্ব ও নৈতিকতার সর্বোচ্চ মানদণ্ড বজায় রাখতে হবে। জনগণের নিকট দায়বদ্ধতা না থাকলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শেষ পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে পড়ে।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]
এইচআর/এমএফএ/এমএস