হাম প্রতিরোধে সরকারের সাড়া জাগানো পদক্ষেপ

আহসান হাবিব বরুন
আহসান হাবিব বরুন আহসান হাবিব বরুন , সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা
প্রকাশিত: ০৭:৩৫ পিএম, ০৬ এপ্রিল ২০২৬

একটি জাতির সার্বিক অগ্রগতি বহুলাংশে নির্ভর করে সেই জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কতটা নিরাপদে বেড়ে উঠছে তার ওপর। অথচ আজ দেশজুড়ে হাম আক্রান্ত শিশুদের কান্না শোনা যাচ্ছে। হাসপাতালের বিছানায় নিথর হয়ে পড়ছে একের পর এক নিষ্পাপ শিশুর প্রাণ।

এক সময় বাংলাদেশ হামমুক্তির পথে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। টিকাদান কর্মসূচির সফলতা, জনসচেতনতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ফলে এই প্রাণঘাতী রোগটি কার্যত বিদায় নিয়েছিল দেশ থেকে। গ্রামীণ জনপদ থেকে শহরের বস্তি—সবখানেই মা-বাবার মধ্যে ছিল টিকা নিয়ে সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর্মীদের ছিল নিরলস প্রচেষ্টা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই অর্জন টেকসই হয়নি।

বিগত সরকারগুলোর অব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি, এবং নীতিনির্ধারণের ধারাবাহিক ব্যর্থতা ধীরে ধীরে এই অর্জনকে ভেঙে দিয়েছে। টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়েছে, অনেক এলাকায় টিকার সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে, আবার কোথাও কোথাও ভুয়া প্রতিবেদন দিয়ে প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল করা হয়েছে। ফলে যে রোগ একসময় নিয়ন্ত্রণে ছিল, তা আজ আবার ভয়াবহ রূপে ফিরে এসেছে।

বর্তমান বাস্তবতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশব্যাপী হাম আক্রান্তের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়েছে, এবং দুঃখজনকভাবে শতাধিক শিশুর মৃত্যু ঘটেছে—যাদের অধিকাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী। অনেকের কাছে হয়তো এই সংখ্যা কেবল একটি পরিসংখ্যান। কিন্তু যাদের বুক কালি হয়েছে। তাদের কাছে প্রতিটি সংখ্যা একটি পরিবার, একটি মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ। একটি অপূর্ণ ভবিষ্যতের গল্প।

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যার লক্ষণ হিসেবে জ্বর, চোখ লাল হওয়া, কাশি এবং সারা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা যায়। কিন্তু সময়মতো চিকিৎসা ও টিকাদান না হলে এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য এটি আরও মারাত্মক হয়ে ওঠে।

এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকারের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী এবং আশাব্যঞ্জক। ৫ এপ্রিল থেকে ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় শুরু হওয়া বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর ধারাবাহিকতায় ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনসহ ময়মনসিংহ ও বরিশালে এবং ৩ মে থেকে সারা দেশে একযোগে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হওয়ার ঘোষণা নিঃসন্দেহে একটি সুসংগঠিত পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের বক্তব্যে যে জরুরিতা ও দায়বদ্ধতার প্রতিফলন দেখা গেছে, তা এই সংকট মোকাবিলায় সরকারের আন্তরিকতার প্রমাণ বহন করে। তিনি যথার্থই উল্লেখ করেছেন যে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী একটি শিশুও যেন চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুবরণ না করে—এই লক্ষ্য সামনে রেখেই কাজ করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই কর্মসূচির দ্রুত বাস্তবায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে একটি কার্যকর ও ফলপ্রসূ উদ্যোগ গ্রহণ করা সহজ নয়। কিন্তু এই উদ্যোগ প্রমাণ করছে যে, সঠিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে সংকট মোকাবিলা সম্ভব।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৮২ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী। এই তথ্যকে ভিত্তি করে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের অগ্রাধিকার দিয়ে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে—যা একটি বৈজ্ঞানিক ও বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে অন্যান্য বয়সী শিশুদেরও এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে বলে জানানো হয়েছে।

বর্তমান সরকারের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এটি যেন একটি সাময়িক প্রতিক্রিয়া হয়ে না থাকে, বরং একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য নীতির অংশ হিসেবে গড়ে ওঠে—তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, একটি শিশুর জীবন বাঁচানো মানে একটি জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। সুতরাং আবারো হাম মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের সবাইকেই দায়িত্বশীল হতে হবে।

এখানে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ। ইউনিসেফ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতি ও সম্পৃক্ততা এই কর্মসূচির গ্রহণযোগ্যতা ও কার্যকারিতা বাড়াবে বলেই প্রত্যাশা করা যায়।

তবে শুধু টিকাদান কর্মসূচি শুরু করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। এর সাফল্য নির্ভর করে বাস্তবায়নের উপর। প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিকার সঠিক সরবরাহ নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, এবং সর্বোপরি জনসচেতনতা বৃদ্ধি—এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

গ্রামের মা-বাবাদের বোঝাতে হবে যে, টিকা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি শিশুর মৌলিক অধিকার। ধর্মীয় বা সামাজিক কুসংস্কার, গুজব কিংবা ভুল তথ্য যেন এই কর্মসূচির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে না পারে, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি। দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি অতীতে যে অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে আমরা আজকের এই অবস্থায় পৌঁছেছি, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে যেন একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

আজকের এই টিকাদান কর্মসূচি কেবল একটি স্বাস্থ্য উদ্যোগ নয়; এটি একটি জাতীয় অঙ্গীকার—আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার অঙ্গীকার। প্রতিটি শিশুর জীবন মূল্যবান, প্রতিটি মায়ের চোখের জল আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা।

যদি এই কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে খুব শিগগিরই আমরা আবারও হামমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে পারব। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন সরকারের পাশাপাশি সমাজের সকল স্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ।

পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান সরকারের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এটি যেন একটি সাময়িক প্রতিক্রিয়া হয়ে না থাকে, বরং একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য নীতির অংশ হিসেবে গড়ে ওঠে—তা নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ, একটি শিশুর জীবন বাঁচানো মানে একটি জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। সুতরাং আবারো হাম মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের সবাইকেই দায়িত্বশীল হতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
[email protected]

এইচআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।