বাগেরহাটের ঘটনা : অমানবিকতার বিরুদ্ধে জাগরণ

ড. হারুন রশীদ
ড. হারুন রশীদ ড. হারুন রশীদ , ডেপুটি এডিটর (জাগো নিউজ)
প্রকাশিত: ০৯:৫৪ এএম, ১২ এপ্রিল ২০২৬

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও দেখে শিউরে উঠেছে গোটা দেশ। বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হজরত খানজাহান আলী (রহ.) মাজারের দিঘির ঘাটে একটি অসহায় কুকুরকে কুমিরের মুখে ঠেলে দেওয়ার দৃশ্য—যেখানে কুমিরটি কুকুরটিকে জীবন্ত গিলে খাচ্ছে, আর মানুষ দাঁড়িয়ে তা দেখছে, ভিডিও করছে। এই ঘটনা কি শুধুই একটি দুর্ঘটনা? নাকি মানুষের ভেতরের 'পশুত্ব'র চরম বহিঃপ্রকাশ?

ঘটনাটি গত ৮ এপ্রিল বিকেলে ঘটেছে। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী, মাজারের খাদেম ও নিরাপত্তাকর্মীদের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি অসুস্থ বা পাগলা কুকুর মাজার এলাকায় এসে শিশুসহ বেশ কয়েকজনকে কামড় দেয়। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয়রা কুকুরটিকে তাড়ানোর চেষ্টা করে। একপর্যায়ে কুকুরটি মাজারের প্রধান ঘাটে গিয়ে নিরাপত্তাকর্মী ফোরকান হাওলাদারকে আঁচড় দেয়। ফোরকান জানান, আত্মরক্ষার্থে তিনি পা ঝাড়া দিলে কুকুরটি ভারসাম্য হারিয়ে পানিতে পড়ে যায় এবং নারীদের ঘাট সংলগ্ন শ্যাওলাযুক্ত সিঁড়ি দিয়ে উঠতে না পেরে কুমিরের শিকার হয়।

প্রথম দৃষ্টিতে এটি একটি 'দুর্ঘটনা' মনে হলেও, ভাইরাল ভিডিওটি মানুষের যে রুদ্ররূপ দেখিয়েছে, তা ভাবনার বিষয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই দাবি করেছেন, কুকুরটিকে পা বেঁধে ইচ্ছাকৃতভাবে কুমিরের খাবার হিসেবে দেওয়া হয়েছে। যদিও প্রত্যক্ষদর্শীরা এই তথ্য অস্বীকার করেছেন, কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো—একটি অসহায় প্রাণী যখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছে, তখন সেখানে উপস্থিত মানুষগুলো কেন কুকুরটিকে রক্ষার ন্যূনতম চেষ্টাও করল না? কেন তাদের কাছে ভিডিও করাটা একটা প্রাণ বাঁচানোর চেয়ে বড় মনে হলো?

ঐতিহাসিক এই দিঘির কুমিরগুলো খানজাহান আলীর (রহ.) স্মৃতি হিসেবে শ্রদ্ধার পাত্র। কিন্তু তাই বলে, কোনো প্রাণীকে, সে যত হিংস্রই হোক না কেন, এভাবে মৃত্যুর মুখে ফেলে দেওয়া কি মানবিক? তাছাড়া মাজার কর্তৃপক্ষ বলছে, সম্প্রতি একটি কুমির ডিম পাড়ায় সেটি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক ছিল। এমন একটি বিপজ্জনক এলাকায় মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং পশু-পাখির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কি প্রশাসনের দায়িত্ব নয়?

এই ঘটনার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানাচ্ছেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শোবিজ তারকারা। গায়ক তানজীব সারোয়ার লিখেছেন, "মৃত্যুর আগপর্যন্ত তাকিয়ে ছিল। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ভেবেছিল, ওর এই বিশ্বস্ত লোকটা তাকে বাঁচাবে।" অভিনেত্রী জয়া আহসানও এই ঘটনার প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন।

দুই.

খুলনার বাগেরহাটে অবস্থিত ঐতিহাসিক খানজাহান আলী মাজার–কে ঘিরে বহু কিংবদন্তি ও লোকবিশ্বাস প্রচলিত আছে। বিশেষ করে মাজারের পুকুরে থাকা কুমিরগুলো নিয়ে নানা রহস্যময় গল্প মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বলে আসছে। এগুলোর অনেকটাই বিশ্বাস, আধ্যাত্মিকতা ও লোককথার মিশ্রণ—যার সঙ্গে বাস্তবতার সরাসরি মিল সবসময় পাওয়া যায় না।

প্রচলিত কিছু মিথ-

১. “কুমিরগুলো অলৌকিক—হুজুরের দোয়ায় বেঁচে আছে”

অনেকেই বিশ্বাস করেন, এই কুমিরগুলো সাধারণ কুমির নয়; তারা নাকি খান জাহান আলী–এর অলৌকিক শক্তির ফল। বলা হয়, তিনি নিজেই এগুলো এনে পুকুরে ছেড়েছিলেন এবং তার দোয়ার কারণেই তারা শত শত বছর ধরে টিকে আছে।

বাগেরহাটের ঘটনাটি আমাদের বুঝিয়ে দেয়, মানুষ হিসেবে আমরা কতটা সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলছি। পশুত্ব যখন মানবিকতার ওপর চেপে বসে, তখন সমাজ থেকে ভালোবাসা আর সহানুভূতি হারিয়ে যায়। মানুষ হিসেবে  প্রয়োজন—আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন। শুধু ভিডিও ভাইরাল করে কোনো সমাধান আসে না। আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে একটি অবলা প্রাণীর করুণ মৃত্যু দেখে আমরা শুধু 'লাইক-কমেন্ট' আর 'শেয়ার' বাড়াবো? এই ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। পশু-পাখির প্রতি নিষ্ঠুরতা একটি সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না। দোষীদের শাস্তির পাশাপাশি, মাজার এলাকায় দর্শনার্থী এবং প্রাণী—উভয়ের নিরাপত্তার জন্য প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এখন সময়ের দাবি।

বাস্তবতা: কুমিরের দীর্ঘায়ু হতে পারে, কিন্তু শত শত বছর বেঁচে থাকা বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্ভব। এগুলো প্রজন্ম ধরে বংশবৃদ্ধির মাধ্যমেই টিকে আছে।

২. “কুমির ডাকলেই আসে—এটি অলৌকিক ঘটনা”

মাজারে খাদেমরা নির্দিষ্ট নামে ডাকলে কুমির ভেসে ওঠে—এটিকে অনেকে অলৌকিক বলে মনে করেন।

বাস্তবতা: এটি মূলত প্রশিক্ষণ ও অভ্যাসের ফল। নিয়মিত খাবার দেওয়ার কারণে কুমিরগুলো নির্দিষ্ট শব্দ বা ডাকে সাড়া দিতে শিখে গেছে।

৩. “কুমির কখনও কাউকে ক্ষতি করে না”

একটি জনপ্রিয় বিশ্বাস হলো, মাজারের কুমিরগুলো ‘পবিত্র’, তাই তারা মানুষকে আক্রমণ করে না।

বাস্তবতা: কুমির স্বভাবগতভাবে হিংস্র প্রাণী। সাধারণত তারা মানুষের কাছাকাছি আসে না, কিন্তু সুযোগ পেলে আক্রমণ করতেই পারে। তাই নিরাপত্তা সবসময় জরুরি।

বাগেরহাটের ঘটনা : অমানবিকতার বিরুদ্ধে জাগরণ

৪. “মানত করলে কুমির দেখা দেয়”

অনেকে মনে করেন, মানত বা দোয়া করলে কুমির নিজে থেকেই সামনে এসে দেখা দেয়—যেন তা মানত কবুলের ইঙ্গিত।

বাস্তবতা: কুমিরের আচরণ মূলত খাদ্য, পরিবেশ ও অভ্যাস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত; মানতের সঙ্গে এর কোনো বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক নেই।

৫. “এই কুমির অন্য কোথাও বাঁচতে পারে না”

ধারণা আছে, মাজারের পুকুর ছাড়া এই কুমিরগুলো অন্য কোথাও টিকে থাকতে পারবে না।

বাস্তবতা: এটি বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে কুমির অন্য জায়গাতেও বেঁচে থাকতে পারে।

তিন.

মিথের পেছনের বাস্তবতা-

এই কুমিরগুলো আসলে একটি বিরল প্রজাতির—বাংলাদেশে পাওয়া মার্শ ক্রোকোডাইল (Mugger Crocodile)। এরা সাধারণত মিঠাপানির জলাশয়ে বাস করে এবং দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যায়।

খানজাহান আলীর মাজারের পুকুরে তাদের উপস্থিতি ঐতিহাসিক ও পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এগুলোকে ঘিরে তৈরি হওয়া অলৌকিক গল্পগুলো মূলত মানুষের বিশ্বাস ও সংস্কৃতির অংশ।

মিথ, বিশ্বাস ও লোককথা একটি সমাজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ—এগুলো মানুষকে ঐতিহাসিক স্থান ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আবেগগতভাবে যুক্ত করে। তবে সেই সঙ্গে বাস্তবতা জানা এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি রাখা জরুরি।

খানজাহান আলী মাজারের কুমিরগুলো তাই একদিকে যেমন রহস্য ও বিশ্বাসের প্রতীক, অন্যদিকে তেমনি প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

চার.

বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন জাগো নিউজের স্থানীয় প্রতিনিধিকে গতকাল বলেন, মাজারের ঘাটে কুকুরটি কুমির টেনে নিয়ে যাচ্ছে এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। বিষয়টি নজরে আসায় আমরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তদন্তে আসল ঘটনা উঠে আসবে। তবে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি কুকুরটি অসুস্থ ছিল। কেউ তাকে বেঁধে কুমিরের সামনে ফেলেনি।

পাঁচ.

বাগেরহাটের ঘটনাটি আমাদের বুঝিয়ে দেয়, মানুষ হিসেবে আমরা কতটা সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলছি। পশুত্ব যখন মানবিকতার ওপর চেপে বসে, তখন সমাজ থেকে ভালোবাসা আর সহানুভূতি হারিয়ে যায়।

তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে ভালো কথা। আশা করি সময় মতো কমিটির রিপোর্ট পাওয়া যাবে। এবং তাতে আসল বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

তবে মানুষ হিসেবে  প্রয়োজন—আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন। শুধু ভিডিও ভাইরাল করে কোনো সমাধান আসে না। আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে একটি অবলা প্রাণীর করুণ মৃত্যু দেখে আমরা শুধু 'লাইক-কমেন্ট' আর 'শেয়ার' বাড়াবো?

এই ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। পশু-পাখির প্রতি নিষ্ঠুরতা একটি সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না। দোষীদের শাস্তির পাশাপাশি, মাজার এলাকায় দর্শনার্থী এবং প্রাণী—উভয়ের নিরাপত্তার জন্য প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এখন সময়ের দাবি।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]

এইচআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।