নীরব ঘাতক উচ্চ রক্তচাপ: সচেতনাতেই জীবনরক্ষা

অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ
অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ , বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
প্রকাশিত: ০৩:২৩ পিএম, ১৭ মে ২০২৬

১৭ মে বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তত্ত্বাবধানে World Hypertension League ও International Society of Hypertension এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে— “একসঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করি, নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করুন, নীরব ঘাতককে পরাজিত করুন”।

অসংক্রামক ব্যাধির মধ্যে অন্যতম হলো উচ্চ রক্তচাপ, যা প্রায়ই একটি স্থায়ী রোগ হিসেবে বিবেচিত। এর চিকিৎসা ও প্রতিরোধ অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে বিভিন্ন জটিলতা, এমনকি হঠাৎ মৃত্যুরও ঝুঁকি থাকে।

উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন কী?

স্বাভাবিক রক্তচাপ হলো সেই চাপ, যার সাহায্যে রক্ত শরীরের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছায়। হৃদ্‌পিণ্ডের পাম্পিং ক্রিয়ার মাধ্যমে রক্তচাপ সৃষ্টি হয়। রক্তচাপের কোনো নির্দিষ্ট মাত্রা নেই। বয়সভেদে মানুষের রক্তচাপ ভিন্ন হতে পারে এবং একই মানুষের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময়ে রক্তচাপ কমবেশি হতে পারে। উত্তেজনা, দুশ্চিন্তা, অধিক পরিশ্রম, কম ঘুম ও অতিরিক্ত ব্যায়ামের ফলে রক্তচাপ বাড়তে পারে। আবার ভালো ঘুম ও বিশ্রামে রক্তচাপ কমে যায়। এটি স্বাভাবিক পরিবর্তন।

সাধারণত বয়স যত কম, রক্তচাপও তত কম থাকে। যদি কারও রক্তচাপ স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি হয় এবং অধিকাংশ সময়, এমনকি বিশ্রামকালেও বেশি থাকে, তবে ধরে নিতে হবে তিনি উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত।

রক্তচাপ কত প্রকার?

রক্তচাপ দুই ধরনের— সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক। সাধারণত স্বাভাবিক সিস্টোলিক চাপ ১০০ থেকে ১৪০ এবং ডায়াস্টোলিক চাপ ৬০ থেকে ৯০ মিলিমিটার মার্কারি (মি.মি. এইচজি)। কারও রক্তচাপ যদি ১৪০/৯০ বা এর বেশি হয়, তবে বুঝতে হবে তার উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে। তবে বয়সভেদে কিছুটা তারতম্য হতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপ কি জটিল ব্যাধি?

উচ্চ রক্তচাপ ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। অনেক সময় এর কোনো প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যায় না। এটিই উচ্চ রক্তচাপের সবচেয়ে খারাপ দিক। যদিও অনেক রোগীর ক্ষেত্রে কোনো লক্ষণ থাকে না, তবুও নীরবে এটি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত করে। এ কারণেই উচ্চ রক্তচাপকে বলা হয় “নীরব ঘাতক”। অনিয়ন্ত্রিত ও চিকিৎসাবিহীন উচ্চ রক্তচাপ থেকে মারাত্মক শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপে কী কী জটিলতা হতে পারে?

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ চারটি অঙ্গে মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে— হৃদ্‌পিণ্ড, কিডনি, মস্তিষ্ক ও চোখ।

অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপের কারণে হৃদ্‌যন্ত্রের পেশি দুর্বল হয়ে যায় এবং হৃদ্‌যন্ত্র ঠিকমতো রক্ত পাম্প করতে পারে না। এই অবস্থাকে বলা হয় হার্ট ফেইলিওর। রক্তনালি সংকুচিত হয়ে হার্ট অ্যাটাক বা মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন হতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপ পুরোপুরি সারে না, তবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। এজন্য নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হয়। অনেক রোগী কিছুদিন ওষুধ খাওয়ার পর রক্তচাপ স্বাভাবিক হলে ওষুধ বন্ধ করে দেন। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনোই ওষুধ বন্ধ করা যাবে না। অনেকেই মনে করেন, কোনো উপসর্গ না থাকলে ওষুধের প্রয়োজন নেই। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। এ ধরনের রোগীরাই হঠাৎ হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক কিংবা মৃত্যুর শিকার হতে পারেন।

উচ্চ রক্তচাপের কারণে কিডনি বিকল হয়ে যেতে পারে। এছাড়া মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোক হয়ে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। চোখের রেটিনায় রক্তক্ষরণ হয়ে অন্ধত্বও দেখা দিতে পারে।

কী কী কারণে উচ্চ রক্তচাপ হয়?

শতকরা ৯০ ভাগ রোগীর উচ্চ রক্তচাপের কোনো নির্দিষ্ট কারণ জানা যায় না। একে প্রাইমারি বা এসেনশিয়াল হাইপারটেনশন বলা হয়। সাধারণত বয়স্ক মানুষের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ বেশি দেখা যায়। কিছু বিষয় উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়, যেমন—

(১) বংশানুক্রমিক

উচ্চ রক্তচাপের বংশগত ধারাবাহিকতা রয়েছে। বাবা-মায়ের উচ্চ রক্তচাপ থাকলে সন্তানেরও হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

(২) ধূমপান

ধূমপায়ীদের শরীরে তামাকের বিষাক্ত উপাদানের প্রভাবে উচ্চ রক্তচাপসহ ধমনি ও হৃদ্‌রোগ হতে পারে। তামাক, জর্দা ও গুল ব্যবহারে একই সমস্যা দেখা দেয়।

(৩) অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ

খাবার লবণে থাকা সোডিয়াম শরীরে জলীয় অংশ বাড়িয়ে দেয়। ফলে রক্তের আয়তন ও রক্তচাপ বেড়ে যায়।

(৪) অধিক ওজন অলস জীবনযাপন

ব্যায়াম ও শারীরিক পরিশ্রমের অভাবে শরীরের ওজন বাড়ে। এতে হৃদ্‌যন্ত্রকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয় এবং উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ে।

(৫) অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস

অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় খাবার, মাংস, মাখন ও ভাজাপোড়া খাবার খেলে ওজন বাড়ে। কলিজা, গুর্দা ও মগজ খেলে রক্তে কোলেস্টেরল বাড়ে। অতিরিক্ত কোলেস্টেরল রক্তনালির দেয়াল মোটা ও শক্ত করে, ফলে রক্তচাপ বাড়ে।

(৬) অতিরিক্ত মদ্যপান

নিয়মিত অতিরিক্ত মদ্যপানে রক্তচাপ বাড়ে। অ্যালকোহলে অতিরিক্ত ক্যালরি থাকায় ওজনও বৃদ্ধি পায়।

(৭) ডায়াবেটিস

ডায়াবেটিস রোগীদের অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস বেশি হয়। ফলে বয়সের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেয়। এছাড়া কিডনি ও চোখের জটিলতাও বাড়ে।

(৮) অতিরিক্ত উৎকণ্ঠা

রাগ, উত্তেজনা, ভয় ও মানসিক চাপ সাময়িকভাবে রক্তচাপ বাড়াতে পারে। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চলতে থাকলে তা স্থায়ী উচ্চ রক্তচাপে রূপ নিতে পারে।

অন্যান্য কারণ

নির্দিষ্ট কিছু রোগের কারণেও উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে। একে সেকেন্ডারি হাইপারটেনশন বলা হয়। যেমন—

  • কিডনির রোগ
  • অ্যাড্রেনাল ও পিটুইটারি গ্রন্থির টিউমার
  • ধমনির বংশগত রোগ
  • গর্ভাবস্থায় একলাম্পসিয়া ও প্রি-একলাম্পসিয়া
  • দীর্ঘদিন জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, স্টেরয়েড বা কিছু ব্যথানাশক ওষুধ সেবন

উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমাতে কী করা উচিত?

জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

১. অতিরিক্ত ওজন থাকলে অবশ্যই ওজন কমাতে হবে।
২. খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
৩. নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে— হাঁটা, দৌড়ানো, হালকা ব্যায়াম, সিঁড়ি ব্যবহার ইত্যাদি।
৪. কম চর্বি ও কম কোলেস্টেরলযুক্ত খাবার খেতে হবে।
৫. অতিরিক্ত লবণ পরিহার করতে হবে।
৬. অতিরিক্ত মদ্যপান এড়িয়ে চলতে হবে।
৭. ধূমপান সম্পূর্ণ বর্জন করতে হবে।
৮. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
৯. মানসিক চাপ কমাতে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ঘুম ও মানসিক প্রশান্তি প্রয়োজন।
১০. নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করতে হবে।

উচ্চ রক্তচাপ হলে কি চিকিৎসা করাতেই হবে?

উচ্চ রক্তচাপ পুরোপুরি সারে না, তবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। এজন্য নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হয়। অনেক রোগী কিছুদিন ওষুধ খাওয়ার পর রক্তচাপ স্বাভাবিক হলে ওষুধ বন্ধ করে দেন। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনোই ওষুধ বন্ধ করা যাবে না। অনেকেই মনে করেন, কোনো উপসর্গ না থাকলে ওষুধের প্রয়োজন নেই। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। এ ধরনের রোগীরাই হঠাৎ হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক কিংবা মৃত্যুর শিকার হতে পারেন।

মনে রাখতে হবে, উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে, নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হবে এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হবে।

লেখক : বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।

এইচআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।