মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, রোহিঙ্গাদের দেখেছি

ফারহানা মোবিন
ফারহানা মোবিন ফারহানা মোবিন , লেখক এবং চিকিৎসক
প্রকাশিত: ০৩:৫৪ এএম, ০২ নভেম্বর ২০১৭

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি পৃথিবীতে ছিলাম না। আম্মা, আব্বু আর দাদীর কাছে থেকে শুনেছি মুক্তিযুদ্ধের গল্প। সেই ঘটনা গুলো আর রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দুঃখ যেন একই সূত্রে গাঁথা। আমার জন্ম স্থান রাজশাহী। পদ্মা নদীর সাথে জড়িয়ে আছে, আমার হাজারো স্মৃতি। আব্বু প্রতিদিন ভোর বেলা হাঁটতে যেতো। আব্বুর সাতে আমিও হাঁটতে বের হতাম। রাজশাহীর পদ্মানদীর ধার দিয়ে শাহমুখদম মাযার এর পাশে, তারপর পায়ে হেঁটে কুমার পাড়া, বড়রাস্তার মোড়, বিসমিল্লাহ হোটেল, রহমানিয়া হোটেল এর পাশ দিয়ে পায়ে হেঁটে আমি আর আমার বাবা বাসায় ফিরতাম।

আব্বু ঝরের বেগে হাঁটতো, আর আমি দৌড়াতাম। আব্বুর সাথে হাঁটার প্রতিযোগিতায় আমি যেতাম হেরে। হাঁটতে যেয়ে খুব ক্লান্ত হলে, আব্বু মাঝে মাঝে পদ্মা নদীর ধারে বসতো। পদ্মা পাড়ে মানুষজনের বসার জন্য সিমেন্টের বড় বড় স্লাব ছিল। মাথার উপরে ছিল বিশাল বড় পাকুর আর বট গাছ। সেই বট গাছে ভোর বেলা অজানা সব পাখিতে ভরে যেতো। অদ্ভুত সুন্দর সব পাখির কলকাকলি।

আব্বু মাঝে মাঝে গাছ তলায় বসতো। উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো নদীর চরের বুকে। আর প্রায়ই বলতো “মা রে, মুক্তিযুদ্ধের সময় এই পদ্মা নদীর চর দিয়ে হেঁটে হাজার হাজার মানুষ ইন্ডিয়া তে গেছে। বাড়ি ঘর, জমি জমা ফেলে প্রাণের ভয়ে পালিয়ে গেছিল। মাথার উপর বোঝা নিয়ে, বয়স্ক মা বাবাকে ঘাড়ে নিয়ে পার হয়েছিল এই পদ্মা নদীর চর। চোখের সামনে কতো জন যে, গুলি খেয়ে মরেছে। সেই লাশ গুলোকে নিরুপায় হয়ে রাস্তায় ফেলে যেতে হয়েছে। চোখের সামনে ক্ষুধার্ত শুকুন লাশ গুলোকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়েছে। অর্ধমৃত মানুষকেও লাশ ভেবে ভয়াবহ ক্ষুধার্ত শকুনেরা টেনে হিঁচড়ে ছিঁড়ে খেয়েছে।

লুকিয়ে ঝোপ ঝাড়ের মধ্যে থেকে সেসব দৃশ্য দেখে চোখের পানি ফেলেছি। হাজার হাজার মাইল হাঁটতে যেয়ে, অনেক মায়ের কোলে থেকে পড়ে গেছে তার নতুন সন্তান। ভীড়ের মধ্যে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

মা রে, এমন হাজার হাজার স্মৃতি এই পদ্মার চরে। আমি এই গাছ তলায় এসে বসলেই সেই স্মৃতি গুলো আমার মনে পরে। কথা গুলো বলতে বলতে আমার আব্বুর চোখ লাল হয়ে যেত।” পদ্মা নদীর ধারে গেলেই মনে হয় আমার আব্বুকে যেন দেখতে পাচ্ছি। আমার কাজ পাগল পিতা দ্রুত গতিতে হেঁটে চলেছে। আর সেই আমি তার সাথে সাথে দৌড়াচ্ছি।

অসহায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেখে আমার স্মৃতিপটে বার বার ভেসে উঠছে, সেই পদ্মা নদীর ঘটনা গুলো। চোখ বন্ধ করলেই যেন দেখতে পাচ্ছি। প্রাণের ভয়ে পালিয়ে আসা অসহায় মানুষগুলোকে পাকসেনারা বুটের জুতো দিয়ে লাথি মারছে। ছোট শিশু গুলোকে ছুঁড়ে আগুনে ফেলে দিচ্ছে। জ্বালিয়ে দিচ্ছে বাড়ি ঘর। কৌশলে নিজেদের মিয়ানমার সরকার দেশের ঝামেলা আমাদের ঘাড়ে ফেলে দিয়েছে।

এই বিপুল পরিমাণ শরণার্থীকে সীমান্তে ঢুকতে না দিলে, গুলি করে মারতে হতো। আওয়ামী লীগ সরকার যথেষ্ট উদারতার পরিচয় দিয়েছেন। এখন পর্যন্ত অসংখ্য রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন। কিন্তু আমরা নিজেরাই গরীব দেশের মানুষ। এতো গুলো মানুষের জন্য আমরা মমতার আঁচল বিছিয়ে দিয়েছি। আমাদের দেশের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান, এনজিও রোহিঙ্গাদের জন্য এগিয়ে এসেছেন। জাতিসংঘ সহযোগিতা করছে। কিন্তু এইটা স্থায়ী কোন সমাধান না। এই ভাবে চলতে পারেনা। জাতিসংঘকে চাপ দিতে হবে, মিয়ানমার সরকারকে, এই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য।

আমরা নিজেরাই উন্নয়নশীল একটা দেশ। আমরা নিজেদের সমস্যাই মেটাতে পারি না। মাত্রাতিরিক্ত জগণের জন্য আমরা নিজ দেশের জনগণের কর্মসংস্থান করতে পারি না। বেকারত্বের সমস্যার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে অন্যান্য সমস্যা গুলো। এই ভাবে চলতে পারে না। আমাদের দেশের জনগণের ঘাড়ে মিয়ানমার সরকার কৌশলে বিপদ চাপিয়ে দিয়েছেন। কিছুদিন পূর্বে মায়ানমার সেনাবাহিনীর প্রধান বলেছিলেন, রোহিঙ্গারা বাঙালি। তারা কখনোই বাঙালি না। তারা ছয়শো বছর ধরে আরাকান রাজ্যে বসবাস করে। তারা সবাই দরিদ্র না। তাদের অনেকেই আছেন, যারা বিত্তশালী। কিন্তু নিরুপায় হয়ে পলিথিনের ঘরে থাকছেন, ত্রাণের খাবার খেয়ে, না খেয়ে দিন পার করছেন। যা মানবতার চরম অবমাননা। এই মানুষ গুলোর অনেকেই এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত। অনেকেই গর্ভবতী। এই ভয়ানক পরিবেশে জন্ম নিচ্ছে অসহায় নবজাতক গুলো। এই অবস্থা চলতে দেয়া যায় না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতিসংঘ, মিয়ানমার সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এইভাবে চলতে পারেনা। এতো গুলো মানুষের দায়িত্ব আমাদের দেশ কিভাবে নেবে? দেশের সকল স্তরের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমাদেরকে আরো জোরালো ভাবে জনমত তৈরি করতে হবে। রোহিঙ্গারা তাদের দেশে ফিরে যাক, তাদের দেশের সমস্যা তারা মিটিয়ে ফেলুক, এই আমাদের কামনা। আমরা আর কোন মুক্তিযুদ্ধ দেখতে চাইনা। আমরা আর কোন লাশের গন্ধ পেতে চাইনা। অসহায় মানুষগুলোর জন্য আমাদের রয়েছে গভীর সমবেদনা। আমরা চাই, ফিরিয়ে দেয়া হোক তাদের নাগরিক অধিকার।

আমরা আর কোন রোহিঙ্গাকে কষ্টের সাগরে দেখতে চাই না। আর কোন মুক্তিযুদ্ধ আমরা চাইনা। যুদ্ধ মানেই ধ্বংস। আমরা শান্তি চাই, আমরা চাই, পৃথিবীর প্রতিটি দেশ ভালো থাকুক। বন্ধ হোক রাখাইন রাজ্যের এই ভয়ানক নৃশংসতা। ফিরিয়ে দেয়া হোক, তাদের নাগরিক অধিকার।

লেখক : চিকিৎসক।

এইচআর/পিআর

আমাদের দেশের জনগণের ঘাড়ে মিয়ানমার সরকার কৌশলে বিপদ চাপিয়ে দিয়েছেন। কিছুদিন পূর্বে মায়ানমার সেনাবাহিনীর প্রধান বলেছিলেন, রোহিঙ্গারা বাঙালি। তারা কখনোই বাঙালি না

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]