মরিস সাহেবের দিনকাল

ডা. বিএম আতিকুজ্জামান
ডা. বিএম আতিকুজ্জামান ডা. বিএম আতিকুজ্জামান
প্রকাশিত: ০৭:৪৫ এএম, ২৮ নভেম্বর ২০১৭

আমাদের বাসায় আসতে হলে মূল ফটকে দেখা হবে মিস্টার মরিসের সাথে। মূল ফটকের পাশেই ছোট্ট সাজানো গোছানো 'গার্ড রুম'। সেখানেই সপ্তায় পাঁচদিন তাকে দেখি। প্রথম দেখাতেই তিনি আমাকে বলেছিলেন তাকে তার প্রথম নাম ডাকতে। এটা এদেশের রীতি। প্রায় আশি বছরের এ মানুষটিকে প্রথম নামে ডাকতে প্রথম প্রথম বেশ কষ্ট হতো। আস্তে আস্তে তা সয়ে গিয়েছে।

মরিস সাহেবের সাথে প্রতি সপ্তায় কয়েকবার দেখা হয়। দেখা হলেই তিনি হাত তুলে সম্ভাষণ জানান। উঠে দাঁড়িয়ে পড়েন। হাতে তাড়া না থাকলে আমি থেমে যাই সেখানে। ওর সাথে একটু কথা বার্তা হয়। গত এক যুগে তিনি আমাদের পরিবারের একজন হয়ে গিয়েছে। আমরা একটি ছোট দ্বীপের মতো জায়গাতে থাকি। চারদিকে পানি। কেবল পনেরোটি পরিবার এখানে।আমাদের প্রত্যেকের হাঁড়ির খবর তার জানা। এমনকি আমাদের সন্তানদের গানের শিক্ষক, আরবি পড়ানোর মৌলভী সাহেব সবার সাথে তার পরিচয় হয়ে গিয়েছে।

দারুণ মিশুক মানুষ তিনি। মরিসের জন্ম এ শহরে। কয়েক হাজার মানুষের শহর তার চোখের সামনে কয়েক লক্ষ মানুষের শহর হয়ে গেলো। এদেশের মিলাটারিতে কাজ করেছেন কয়েক যুগ। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর পরই অবসরে গেলেন তিনি। যুদ্ধের স্মৃতির কথা বলতে চান না তেমন। এর পর ডিজনিতে কাজ করেছেন তিনি অনেক বছর। সেটি শেষ করে এখানে কাজ করছেন গত দুযুগ। এটি তার অবসরের সময় কাটানোর মোক্ষম পথ।

আজকাল দেখি সপ্তায় সাত দিনই মরিস কাজ করছেন। মরিসের বাড়িতে কেউ নেই। ছেলে থাকে আলাস্কাতে, আর মেয়ে ধারে কাছে। মাঝে মাঝে নাতিদের সাথে সময় কাটান তিনি। মরিস জানালেন এক বাড়িতে থাকতে ভালো লাগে না তার। তার স্ত্রী অনেকদিন রোগে ভুগে মারা গেলেন গত বছর। এই 'গার্ড হাউসটি' তার পৃথিবী। সেখানে টেলিভিশন দেখেন, কম্পিউটারে ফেসবুক করেন, কফি খান। এ এলাকার টহল পুলিশরা সময় পেলেই মরিসের শটে আড্ডা মারতে আসেন। একসাথে কফি খান।

মরিসকে বলছিলাম একটি কুকুর পালন করবার জন্য। ও পশু পাখি ভালোবাসে। সে জানালো, মারা যাবার আগে তার স্ত্রী মনের মতো করে ঘরের অনেক কাজ করিয়েছিলেন, নতুন আসবাবপত্র কিনেছিলেন। তিনি বলে গেছেন কোনো পশুপাখী যেন এ বাড়িতে না আসে। মরিস সে কথা রাখছে।

মরিসের খুব গৎ বাঁধা জীবন। প্রতিদিন কাজে আসেন তিনি। একই রুটিন। সেদিন খেয়াল করলাম তার বসার টেবিলে তার স্ত্রী, জোহানার ছবি। তার যুবতীকালের ছবি। সে ছবিতে তার হাত ধরে আছে মরিস। জোহানাকে প্রায়ই স্বপ্নে দেখেন তিনি। স্বর্গে গেলে চিরযৌবনা জোহানার সাথে তার দেখা হবে, এ তার বিশ্বাস।

আজ কথা প্রসঙ্গে মরিস বললেন, 'আজকাল স্মৃতি ধরে রাখতে কষ্ট হচ্ছে।' এ কাজ ছেড়ে চলে যাবেন তিনি। কিভাবে এ কাজ ছেড়ে ঘরে থাকবেন তিনি। আমি খুব আবেগতাড়িত মানুষ।আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।মরিস চলে যাবে এ কথা ভাবতে কষ্ট হচ্ছে। আজকাল অনেক অনাকাঙ্খিত কষ্ট আসছে। পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছি। কষ্ট কি মানুষের দুঃখ বোঝে? ও তো বলে কয়ে আসে না।

লেখক : পরিপাকতন্ত্র ও লিভার বিভাগীয় প্রধান, ফ্লোরিডা হাসপাতাল, ফ্যাকাল্টি, কলেজ অব মেডিসিন, সেন্ট্রাল ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটি।

এইচআর/পিআর

মরিস চলে যাবে এ কথা ভাবতে কষ্ট হচ্ছে। আজকাল অনেক অনাকাঙ্খিত কষ্ট আসছে। পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছি। কষ্ট কি মানুষের দুঃখ বোঝে?

আপনার মতামত লিখুন :