নরওয়ের ডায়েরি

ইশরাক সিদ্দিকী
ইশরাক সিদ্দিকী , লেখক, নরওয়েপ্রবাসী শিক্ষার্থী
প্রকাশিত: ১০:২৮ এএম, ১২ জানুয়ারি ২০১৮ | আপডেট: ১০:৩০ এএম, ১২ জানুয়ারি ২০১৮

ডায়েরি লেখার অভ্যাস যাদের আছে তাদের কাছে ডায়েরি একেকটা উপন্যাসের চেয়েও বেশি কিছু। বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা বলেই হয়তো। ডায়েরিতে লেখা প্রত্যেক পৃষ্ঠায় মানুষের জীবনের স্বপ্নে র কথা লেখা থাকে, থাকে স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা, কখনওবা সাফল্য কিং বা ব্যর্থতার গল্প! অন্যের জীবনের সেই ডায়েরি অনেকের জন্য আবার হতে পারে অনুপ্রেরণা কিংবা আপ্রাণ চেষ্টায় সামান্য একটু সহযোগিতা, হয়তোবা আমার নরওয়ের ডায়েরিও দিক নির্দেশনা দিয়ে কিছুটা সহযোগিতা করবে তাদেরকে, যারা নরওয়েতে পড়াশোনা করতে আসতে চান।

ভাইকিংসের দেশ! অরোরা বোরিয়ালিসের দেশ! কিংবা ছোটবেলায় পড়া নীশিথ সূর্যের দেশ নিয়ে আগ্রহ অনেকের আছে সেটা লক্ষ্য করছি এ দেশে আসার পর থেকেই। আমার সঙ্গী বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীদের কাছেও হরহামেশা ফোন আসে এই দেশে কিভাবে আসা যায় সে বিষয়ে।

ওপেন এরা ইন্টারনেটের যুগে কোনও ইনফরমেশন বের করাটা খুব কঠিন কিছুনা। তবে নরওয়েতে আসার প্রসেস কিছুটা সময়সাপেক্ষ আর বেশ কিছু পেপারওয়ার্কের ঝক্কি। বাংলাদেশের কিছু এজেন্সি নরওয়ে নিয়ে কাজ করে। তাদের দ্বারস্থ হলে সময় আর খাটুনির পরিমাণ কমে যায়। তবে, নিজ দেশ ছেড়ে অন্য একটা অপরিচিত জায়গায় পারি দিতে হলে ইনফরমেশন নিজে বের করাটাই ভালো। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় মতামত, এতে অনেক ব্যাপারে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখা যায়।

নরওয়েতে আসার আগে বেশ কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। আমাদের নরম মাটির আলো-বাতাসে অভ্যস্ত জিন এখানকার রুক্ষ্ম পাথুরে, সোজা বাংলায় হাঁড় কাপানো শীতে মানিয়ে নিতে সময় নেয়। আরেকটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, পৃথিবীর অন্যতম ব্যয়বহুল দেশ নরওয়ে এবং এরা নিজেদের প্রাইভেসিকে খুবই প্রাধান্য দেয়। কোনোও রেইসিজম নেই, সবসময় সবাইকে সহযোগিতা করার মানসিকতা প্রায় বেশিরভাগ নরওয়েজিয়ানের মধ্যে থাকলেও এরা নিজেদের ব্যক্তিগত সময়কে ভীষণ ভালোবাসে।

তবে একটা দিক দিয়ে নরওয়ে বাকি সব দেশকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টদের জন্য। পৃথিবীর গুটিকয়েক দেশের মধ্যে নরওয়ে রয়েছে যারা ''টিউশন ফি '' ফ্রিতে এডুকেশন দিচ্ছে। তবে সব কোর্সে না। এবং এই কারণেই অ্যাডমিশন আর ভিসা পাওয়াটাও কঠিন। তবে, অসম্ভব না।

অ্যাডমিশন অ্যাপ্লিকেশন প্রসেসিং এর জন্য ওদের নিজস্ব ডেটাবেইজ আছে। এখানে (fsweb.no/soknadsweb/v elgInstitusjon.jsf) নরওয়ের ভালো বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, স্কুলগুলোর তালিকা পাওয়া যাবে। অ্যাপ্লিকেশন করতে হলে এই ওয়েবসাইটে প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা একাউন্ট ওপেন করতে হয়। এবং সেই একাউন্টের মাধ্যমেই ডকুমেন্টস আপলোড করতে হবে। পছন্দের কোর্স বাছাই করার জন্যও আগ্রহী স্টুডেন্টরা এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আবেদন করে থাকেন।

তার আগে ছোট একটা কাজ করে নিলে ভালো। স্টাডি ইন নরওয়ে লিখে সার্চ করলে বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে কোর্স ডিটেইলস পাওয়া যাবে। কোর্স রিলেটেড যে কোন তথ্যই পাওয়া যাবে সেখানে। আগেই জানিয়েছি, নরওয়ের বেশিরভাগ কোর্সে টিউশন ফি নেই। তবে কিছু কোর্সে টিউশন ফি আছে।

নরওয়ের অ্যাপ্লিকেশন সেশন বছরে একবার। সাধারণত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলে এই সেশন। এই সময়ের মধ্যে আবেদন না করলে এক বছর পিছিয়ে যেতে হবে। আর অবশ্যই আইএলটিএস করতে হবে। ব্যান্ড স্কোর ছয়ের যত ওপরে থাকবে সম্ভাবনাও তত বেড়ে যাবে। আপ্লিকেশন এর পর বেশ কয়েক মাস, আনুমানিক মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত সময় লাগে এডমিশন মিললো কিনা সেটা জানতে। অবশ্যই ইমেইল চেক করতে হবে প্রতিদিন। কারণ যেকোনো ধরনের তথ্য অথবা প্রশ্নের উত্তর জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে শুধু একটা ইমেইল পাঠিয়ে দিন।

এরপর ওরাই পরবর্তী করণীয় জানিয়ে দিবে আপনাকে। নরওয়েতে কোর্সভেদে স্টুডেন্ট বাছাইয়ের ধরনে রয়েছে ভিন্নতা। অনেক ক্ষেত্রে স্টুডেন্টকে পরখ করতে স্কাইপ ইন্টারভিউয়ের ব্যবস্থা রয়েছে! আর মোটিভেশন লেটারে জোর দিন। আপনার লক্ষ্য, সামর্থ্য, প্রতিভার জানান দিয়ে কর্ম হাসিল করার সেরা মাধ্যম মোটিভেশন লেটার।

অ্যাডমিশন হয়ে গেলে শুরু করুন ভিসা পেতে ছুটোছুটি। বাংলাদেশে নরওয়েজিয়ান এম্বেসি নেই। তবে কন্স্যুলেট আছে! সুবিধা হচ্ছে, ঢাকায় ডেনমার্ক এম্বেসি নরওয়ের ভিসা প্রসেস করে! আমাদের একটা ধারণা আছে এম্বেসিতে যেয়ে প্রশ্ন করলেই ভিসা সংক্রান্ত সব বিষয় হয়তোবা জানা যাবে। যেটা একেবারেই ভুল! আপনি কিভাবে যাবেন, কি কাগজপত্র লাগবে এগুলো সবই আপনার নিজের ইনফরমেশন ঘেঁটে বের করতে হবে। আর অবশ্যই আপনাকে ইমেইলে কিছু ওয়েবসাইটের লিঙ্ক পাঠানো হবে। যেখানে ভিসার আবেদনে কি কি ডকুমেন্টস লাগবে তার তথ্য থাকবে।

এরপর "ভিএফএস গ্লোবালে" আপনার যাবতীয় পেপারস জমা দিন। এসমস্ত যাবতীয় তথ্য আপনাকে নিয়মিত ই-মেইলে জানানো হবে। আপনার পেপার গুলো এরপর ডেনিশ এম্বেসির মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করবে ইউডিআই (UDI)। নরওয়েজিয়ান ইমিগ্রেশন অথরিটির সংক্ষেপ হলো ইউডিআই। (www.udi.no/en) ওয়েবসাইটে নরওয়ের ইমিগ্রেশন নিয়ে তথ্য রয়েছে। স্টুডেন্ট ভিসা ছাড়াও সেখানে অনান্য ক্যাটাগরিতে রয়েছে নরওয়েতে আসার নির্দেশনা।

তবে ভিসা পাওয়ার আগে একটা জটিল ধাপ পেরোতে হবে। আর সব দেশের মতোই নরওয়ের ক্ষেত্রেও থাকা-খাওয়ার খরচ বাবদ বেশ কিছু টাকা ব্যাংকে জমা রাখতে হয়। প্রত্যেক একাডেমিক ইয়ারের জন্য সে পরিমাণটা হলো নরওয়েজিয়ান কারেন্সিতে ১,১১৬৫৭। নরওয়ের নিয়ম হলো এই টাকাটা স্টুডেন্ট অথবা তার স্পন্সরের নিজ দেশের ব্যাংক একাউন্টে রাখা যাবেনা, পাঠিয়ে দিতে হবে নরওয়েতে স্টুডেন্ট যে ইউনিভার্সিটিতে পড়তে আসবে তাদের একাউন্টে। চিন্তা করার কিছু নেই আপনার টাকা নিরাপদেই থাকবে! ভিসা না হলে, এম্বেসি থেকে রিজেকশনের কপি কর্তৃপক্ষের কাছে ইমেইল করলেই আপনার টাকা ফেরত চলে আসবে। তবে ব্যাংক ট্রান্সফার আর কারেন্সি কনভার্সন এ কিছু টাকা গচ্চা যাবে। ভিসা হয়ে যাওয়ার পর নরওয়েতে চলে আসলে স্টুডেন্ট এই টাকাটা তুলতে পারবেন। তবে পুরো টাকা আপনার নরওয়েজিয়ান ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করতে বেশ কিছুদিন সময় লাগবে। নরওয়েতে প্রতিবছর রেসিডেন্স পারমিট রিনিউ করতে হবে। এবং এক বছর পরপর ভিসা রিনিউ এর সময় আপনাকে এই পরিমাণ টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা রাখতে হবে।

মনে রাখবেন আপনাকে ডেনিশ এম্বেসি থেকে এক-দুই মাসের এন্ট্রি ভিসা দেওয়া হবে। নরওয়েতে এসেই আপনার পুলিশ স্টেশনে রিপোর্ট করতে হবে। বাংলাদেশে বসেই পুলিশ স্টেশনে অ্যাপয়েন্টমেন্টের তারিখ ঠিক করতে পারবেন। অথবা যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসবেন তারাও সব ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টদের একাট্টা করে পুলিশ স্টেশনের কাছ থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেয়। সেক্ষেত্রে সময় কিছুটা বেশি লাগে। এরপর আপনাকে দেওয়া হবে এক বছরের জন্য রেসিডেন্স পারমিট! যার মাধ্যমে আপনার জন্য খুলে যাবে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এর অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো ভ্রমণের সুযোগ।

আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, ভাইকিংদের উত্তরসূরিরা চাইছে ওদের সোস্যাইটিকে পুরোপুরি ডিজিটাইজড করতে। আর সেই লক্ষ্যে তাদের দেশের প্রত্যেক নাগরিক, স্টুডেন্ট, পলিটিক্যাল অ্যাজাইলাম পাওয়া সবার জন্য ইউনিক কোডের ১১ ডিজিটের পার্সোনাল নাম্বার ইস্যু করে। আপনাকেও ব্যক্তিগত নাম্বারের জন্য আবেদন করতে হবে যত দ্রুত সম্ভব। এই পার্সোনাল নাম্বার সবখানে হাসপাতাল থেকে শুরু করে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, চাকরির ক্ষেত্রে প্রত্যেকটা জায়গায় প্রয়োজন হবে।

পার্সোনাল নাম্বার হয়ে গেলে আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হতে ৪-৬ সপ্তাহ সময় লাগবে। এই সময়টুকু পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে আপনার পাঠানো টাকা নিজের একাউন্টে পেতে। তবে প্রশ্ন জাগতেই পারে, এই সময় পর্যন্ত আপনি চলবেন কি করে? তার জন্যও রয়েছে সমাধান। আপনি যাদের কাছে টাকা পাঠিয়েছেন সেই অফিস অথরিটি আপনাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ নরওয়েজিয়ান ক্রোনার ক্যাশ কার্ড দিবে। সেই ক্যাশ কার্ডের মাধ্যমে আপনি এটিএম মেশিন থেকে ক্যাশ আউট করতে পারবেন।

সপ্তাহে বিশ ঘন্টা ওয়ার্ক পারমিট রয়েছে স্টুডেন্টদের জন্য। তবে নির্ধারিত ঘন্টার অতিরিক্ত সময় কাজ করলে অথবা কোনো ভাবে প্রতারণার দায়ে ফেঁসে গেলে পরের বছর ভিসা পাওয়ায় শঙ্কা দেখা দিতে পারে। আরও একটা বিষয় জানিয়ে দেই, নরওয়েজিয়ান ভাষার বেশ গুরুত্ব আছে। ভাষা জানলে চাকরি পাওয়া সহজ। আর ঘন্টা প্রতি বেতন কাঠামো অনান্য দেশের তুলনায় ঢের বেশি।

সহজ-কঠিনে মেশানো নরওয়ের জীবন। বাংলাদেশের কমিউনিটি বড় হচ্ছে। আর, প্রতিবছর এদেশে বাংলাদেশি স্টুডেন্টদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। যাদের মাধ্যমে নরওয়েতে বেড়ে উঠছে বাংলাদেশও। আর পৃষ্ঠা ভরছে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের নরওয়েজিয়ান ডায়েরির। আবার হয়তোবা নরওয়ের ডায়েরি থেকে আরও কিছু তথ্য জানিয়ে দিব আপনাদের সুবিধার্থে।

শুভ হোক পথচলা।

লেখক : নরওয়ে প্রবাসী শিক্ষার্থী।

এইচআর/এমএস

‘পৃথিবীর অন্যতম ব্যয়বহুল দেশ নরওয়ে এবং এরা নিজেদের প্রাইভেসিকে খুবই প্রাধান্য দেয়। কোনোও রেইসিজম নেই, সবসময় সবাইকে সহযোগিতা করার মানসিকতা প্রায় বেশিরভাগ নরওয়েজিয়ানের মধ্যে থাকলেও এরা নিজেদের ব্যক্তিগত সময়কে ভীষণ ভালোবাসে।’