নামফলক বাংলায় নয় কেন?

সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশিত: ১০:০৭ এএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা নতুন করে ভাষা চেতনায় শাণিত হই। কিন্তু সারা বছর ধরে বাংলার চর্চা আসলে কতোটা চলে এই আত্মোপলব্ধি অত্যন্ত জরুরি। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার যে মর্যাদা প্রাপ্য ছিল সেটি কি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে? তাহলে মিছে হবে শহীদের রক্তদান?

দুঃখজনক হলেও সর্বস্তরে বাংলা ভাষা এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। রাষ্ট্রীয় ও দাপ্তরিক অনেক কাজও হয় ইংরেজিতে। চারদিকে তাকালে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম থেকে শুরু করে সাইনবোর্ড পর্যন্ত সবকিছু ইংরেজিতে। এটা আমাদের দেউলিয়াত্বের বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকার যেসব প্রতিষ্ঠানের (দূতাবাস, বিদেশি সংস্থা ও তৎসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র ব্যতীত) নামফলক, সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার ইত্যাদি এখনও বাংলায় লেখা হয়নি সেগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে ডিএনসিসির ভ্রাম্যমাণ আদালত। গত বৃহস্পতিবার সংসদ ভবন সংলগ্ন আসাদগেট এলাকা থেকে এ অভিযান শুরু হয়। এর আগে গত ৭ ফেব্রুয়ারি গুলশান ২ নম্বরে এ অভিযান পরিচালিত হয়। এ বিষয়ে গত ২৮ জানুয়ারি ডিএনসিসির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বলা হয়েছিল, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের এখতিয়ারাধীন এলাকার যেসব প্রতিষ্ঠানের (দূতাবাস, বিদেশি সংস্থা ও তৎসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র ব্যতীত) নামফলক, সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার ইত্যাদি বাংলায় লেখা হয়নি তা অবিলম্বে স্ব-উদ্যোগে অপসারণ করে আগামী ৭ দিনের মধ্যে বাংলায় লিখে প্রতিস্থাপন করতে হবে। সে লক্ষ্যে জাতীয় দৈনিকে গণবিজ্ঞপ্তি এবং ডিএনসিসির ফেইসবুক পেইজে বিষয়টি জানানো হয়।

গত বৃহস্পতিবার অভিযানের শুরুতে আসাদগেট এলাকার কালার ওয়ার্ল্ড ডিজিট এক্সপ্রেস (ডিজিটাল স্টুডিও), ওয়াল্টন শো রুম (জামান ইঞ্জিনিয়ারিং) প্রতিষ্ঠানগুলোর নামফলক বাংলার পরিবর্তে ইংরেজিতে থাকায় তা অপসারণ করা হয় পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৫ হাজার টাকা করে জরিমানা করা। অভিযানে ব্র্যাক ব্যাংকের (আসাদগেট শাখা) একটি নামফলক অপসারণ করা হয় এবং বাকিগুলো নিজ উদ্যোগে সরিয়ে নিতে বলা হয়।

যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে ট্রেড লাইসেন্স প্রদানের সময়ই তাদেরকে বাংলায় নামফলক, ব্যানার সাইনবোর্ড লেখার বিষয়ে অবহিত করা হয়। এছাড়া হাইকোর্টের নির্দেশ (১৬৯৬/ ২০১৪ নং রিট পিটিশনে প্রদত্ত আদেশ) অনুযায়ী সব প্রতিষ্ঠানের (দূতাবাস, বিদেশি সংস্থা ও তৎসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র ব্যতীত) নামফলক, সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার ইত্যাদি বাংলায় লেখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু লক্ষ করা যাচ্ছে যে, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের নামফলক, সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার ইত্যাদি ইংরেজি ও অন্যান্য বিদেশি ভাষায় লেখা হয়েছে। এমতাবস্থায় ডিএনসিসির এখতিয়ারাধীন এলাকার যাবতীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ ধরনের অভিযানকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। নিজ দেশে বাংলাকে পরবাসে পাঠানোর কোনো মানে হয় না। মাতৃভাষা বাংলাকে কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র হয়েছিল। কিন্তু বুকের তাজা রক্তে বাংলার দামাল ছেলেরা নিজের ভাষাকে রক্ষা করেছে। উর্দু নয় বাঙালির মাতৃভাষা বাংলাতেই তারা কথা বলে, লেখে, স্বপ্ন দেখে। এই ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই এসেছে আমাদের বহুল কাঙ্খিত স্বাধীনতা। ফলে সম্ভব হয়েছে ভাষাভিত্তিক একটি জাতি-রাষ্ট্র গঠনের।

হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যমণ্ডিত বাংলা সমৃদ্ধ একটি ভাষা। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ দাশের মতো লেখক সৃষ্টি হয়েছে এই ভাষায়ই। কিন্তু সেই ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় পরবর্তী সময়ে তেমন কোনো উদ্যোগ কি নেয়া হয়েছে? আদালতের নির্দেশনা সত্ত্বেও কেন নামফলক অন্যভাষায় লেখতে হবে? তাছাড়া বাংলা আমাদের মাতৃভাষ।

কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া অন্যভাষায় নামফলক লেখার কি কোনো মানে আছে? প্রতিষ্ঠানের নামকরণ যাদের উদ্দেশ্যে করা হয় তারা তো বাংলায় কথা বলে। বাংলা পড়তে পারে। তাহলে অযথা কেন ইংরেজির বাড়াবাড়ি? নিজের ভাষার প্রতি নিজেরাই যদি ঔদাসীন্য দেখাই তাহলে এই ভাষার ভবিষ্যত কি? মনে রাখা প্রয়োজন মা মাতৃভূমি, মাতৃভাষাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এ ধরনের অভিযান আরো বেশি করে চলুক। তবে যদি বোধোদয় হয়।

এইচআর/এমএস

‘কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া অন্যভাষায় নামফলক লেখার কি কোনো মানে আছে? প্রতিষ্ঠানের নামকরণ যাদের উদ্দেশ্যে করা হয় তারা তো বাংলায় কথা বলে। বাংলা পড়তে পারে। তাহলে অযথা কেন ইংরেজির বাড়াবাড়ি? নিজের ভাষার প্রতি নিজেরাই যদি ঔদাসীন্য দেখাই তাহলে এই ভাষার ভবিষ্যত কি? মনে রাখা প্রয়োজন মা মাতৃভূমি, মাতৃভাষাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।’