দুর্যোগ মোকাবেলায় কতটা প্রস্তুত?

সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয় সম্পাদকীয়
প্রকাশিত: ০৯:৪৮ এএম, ০৭ আগস্ট ২০১৮

বাংলাদেশ ভূকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। বিজ্ঞানীদের এই কথা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে। মাঝে মধ্যেই হানা দিচ্ছে ভূমিকম্প। এখন পর্যন্ত ভূমিকম্পে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়-ক্ষতি না হলেও এটি যে এক চিন্তার বিষয় সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। বিজ্ঞানীরা বার বার সতর্ক করছেন। তাছাড়া ভূমিকম্প বলে-কয়ে আসেনা। তাই এ ব্যাপারে করণীয় অনেক বিষয় রয়েছে। এ জন্য আমরা কতোটা প্রস্তুত সে ব্যাপারে নতুন করে ভাবতে হবে। নিতে হবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।

ভূমিকম্পে আক্রান্ত হলে উদ্ধার হওয়ার আগ পর্যন্ত আটকে পড়ারা কীভাবে নিজেকে টিকিয়ে রাখবেন তা জানালেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। তিনি বলেছেন, ঘরে অন্তত ২৪ ঘণ্টার জন্য শুকনা খাবার ও বিশুদ্ধ পানি মজুদ রাখুন। রোববার বাংলাদেশ সেনানিবাসের আর্মি মাল্টিপারপাস কমপ্লেক্সে দুই দিনব্যাপী ভূমিকম্প অনুশীলন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা করেন। আর্মি ওয়ার গেম সেন্টার এ অনুশীলনের আয়োজন করেছে। মন্ত্রী বলেন, ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ ও প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। নিয়মিত মহড়া ও মানুষকে সচেতন করার পদক্ষেপ নিতে হবে। নিকট অতীতে বাংলাদেশ বড় ধরনের ভূমিকম্প মোকাবেলা করেনি। তাই এ অনুশীলন সাংগঠনিক দক্ষতা, যন্ত্রপাতি ব্যবহার, প্রশিক্ষণ পরিচালনা ও সকলের মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে ঘাটতি নির্ধারণের পাশাপাশি তা পূরণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

তিনি বলেন, সিসমিক জোন ম্যাপিংয়ে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ব্যাপক এলাকা উচ্চ ও মধ্যম মাত্রার ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ঘন জনবসতি। অনেক ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড বা নির্মাণ নীতিমালা অনুসরণ না করে ভবন ও স্থাপনা নির্মাণের কারণে ঝুঁকির মাত্রা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ভূমিকম্প মোকাবেলায় একটি সুষ্ঠু কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা, মাঠপর্যায়ে কাজ করার জন্য যথাযথ বিকেন্দ্রীকরণ এবং সমাজের সব স্তরে জনগণের কার্যকরী অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন মন্ত্রী। ভূমিকম্প মোকাবেলায় সরকারের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে মন্ত্রী আরও বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ নগর ও জেলার রিস্ক ম্যাপ তৈরি, সচেতনতা বৃদ্ধি ও ৩৩ হাজার নগর স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করা হয়েছে। ঢাকার বিভিন্ন মার্কেটে, সচিবালয়ে, সরকারি-বেসরকারি দফতরে এবং ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন শহর ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভূমিকম্পবিষয়ক মহড়া করা হয়েছে। মায়া বলেন, ভূমিকম্প পরবর্তী দুর্যোগ মোকাবেলায় সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা বিবেচনা করে সরকার বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে প্রায় ২৫০ কোটি টাকার উদ্ধার সরঞ্জামাদি প্রদান করছে। প্রয়োজনে আরও যন্ত্রপাতি প্রদান করা হবে।

এদিকে ইন্দোনেশিয়ার লম্বক দ্বীপে শক্তিশালী ভূমিকম্পে কমপক্ষে ৮২ জন প্রাণ হারিয়েছে। রোববারের ওই ভূমিকম্পে কয়েশ মানুষ আহত হয়েছে। রিখটার স্কেলে ৭ মাত্রার ওই ভূমিকম্পে হাজার হাজার ইমারত ভেঙে পড়েছে এবং বন্ধ হয়ে গেছে বিদ্যুৎ যোগাযোগ। ভূমিকম্প এমন একটি দুর্যোগ যার পূর্বাভাস এখনো বিজ্ঞানীরা দিতে পারছে না। তবে নানা গবেষণায় ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে বাংলাদেশের কথা উঠে এসেছে বার বার। বিশেষজ্ঞের মতে, বাংলাদেশ এখন কোনোমতেই ঝুঁকিমুক্ত নয়। কারণ গত ৮০-৮১ বছরে কোনো বড় ভূমিকম্প হয়নি। এছাড়া ইন্ডিয়ান প্লেট যাচ্ছে উত্তর দিকে, আর উত্তর দিকে আমাদের ইউরেশিয়ান প্লেট। দুটি প্লেট ধাক্কা দিচ্ছে, আর তাতে করে এর বাউন্ডারিতে এনার্জি স্টোর হচ্ছে। বেশ কিছুদিন পরপর প্রেসারটি রিলিজ করার জন্য জায়গাটি নড়ে যায়, আর তখন ভূমিকম্প হয়।

ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হওয়ায় বাংলাদেশ রয়েছে মারাত্মক ঝুঁকিতে। বিল্ডিং কোড মেনে না চলা, বন উজাড়, পাহাড় কেটে ধ্বংস করাসহ নানা উপায়ে আমরা যেন ভূমিকম্প নামক মহা বিপদকে ডেকে আনছি। এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, সারা দেশে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা লক্ষাধিক। একই সাথে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে ভূমিকম্পের কারণে সৃষ্ট ভূকম্পনেও বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে বলেও বিশ্লেষকরা বলছেন। এ ক্ষেত্রে নতুন ভবন নির্মাণে সরকারি তদারকি আরো বাড়ানো প্রয়োজন। বার বার ভূমিকম্প এ কথাই যেন স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, দুর্যোগ মোকাবেলায় আমরা আসলে কতোটা প্রস্তুত। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বলা হয়েছে সাড়ে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে বাংলাদেশে প্রায় ২ থেকে ৩ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটবে।

রাজধানীতে দিন দিন বাড়ছে আকাশচুম্বী অট্টালিকার সংখ্যা। অল্প জায়গায় এতো বড় বড় স্থাপনা ভূমিকম্পের ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। শুধু তাই নয় বিল্ডিং কোড না মেনে তৈরি করা হচ্ছে ভবন। এতে স্বল্পমাত্রার কম্পনেই ভেঙে পড়তে পারে অনেক ভবন। এছাড়া ভূমিকম্পপরবর্তী দুর্যোগ মোকাবেলায়ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। তৈরি করতে হবে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। জনসচেতনার জন্য চালাতে হবে ব্যাপক প্রচারণা। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভূমিকম্প রোধ করা সম্ভব নয়, তবে আমরা প্রকৃতির ওপর অবিচার করে নিজেরাই যেন ভূমিকম্প ডেকে না আনি সে বিষয়ে সতর্ক থাকার কোনো বিকল্প নেই।

এইচআর/জেআইএম

ভূমিকম্প এমন একটি দুর্যোগ যার পূর্বাভাস এখনো বিজ্ঞানীরা দিতে পারছে না। তবে নানা গবেষণায় ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে বাংলাদেশের কথা উঠে এসেছে বার বার। বিশেষজ্ঞের মতে, বাংলাদেশ এখন কোনোমতেই ঝুঁকিমুক্ত নয়।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]