…তাহলে ২৩ ডিসেম্বরেই ভোট হচ্ছে?

আমীন আল রশীদ
আমীন আল রশীদ আমীন আল রশীদ , সাংবাদিক, কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১২:১৬ পিএম, ০৯ নভেম্বর ২০১৮

একাদশ জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছেন সিইসি কে এম নূরুল হুদা। আগামী ২৩ ডিসেম্বর ভোটের দিন ধার্য করেছেন তিনি। তার মানে ২৩ ডিসেম্বরেই ভোট? প্রশ্নটা সরল এবং আপাতত এর জবাব, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ঘোষিত তফসিল অনুযায়ীই ভোট হবে।

প্রশ্ন হচ্ছে, সবকিছু ঠিকঠাক থাকবে কি না বা আছে কি না? সবকিছু ঠিকঠাক বলতে বোঝায় একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ এবং সেই নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য সব দলের প্রস্তুতি, এবং আরও পরিস্কার করে বললে, নির্ধারিত দিনে ভোটে অংশ নেয়ার ব্যাপারে প্রধান দলগুলোর ঐকমত্য। কিন্তু সেই ঐকমত্য কি হয়েছে? হয়নি। হয়নি বলেই ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচনও পিছিয়ে গিয়েছিল। সেই ভোট হয়েছিল প্রায় ২ বছর পরে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর। এবারও কি তার পুনরাবৃত্তি হবে নাকি ঘোষিত তফসিলেই নির্বাচন হবে, তা এখনই হলফ করে বলা মুশকিল।

ভোট এক সপ্তাহ পেছানোর দাবি জানিয়েছে যুক্তফ্রন্ট। এক সপ্তাহে পেছালে কী এমন সুবিধা হবে—তা পরিষ্কার নয়। ভোট পেছানোর দাবি জানিয়েছে ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশও। আর সিইসির তফসিল ঘোষণার পরেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেছেন, একতরফা ভোটের জন্য তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে।

বিএনপি এবং তাদের নতুন জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচন পিছিয়ে দেয়ার দাবির পেছনে যুক্তি হলো এই সময়ের মধ্যে তারা গুছিয়ে উঠতে পারবে না। কেননা প্রার্থী মনোনয়নসহ অন্যান্য কাজের জন্য যথেষ্ট সময় দেয়া হয়নি। প্রশ্ন হলো, নির্বাচন যে ডিসেম্বরের শেষদিকে হবে, সেটা তো আরও বহু আগে থেকেই বলা হচ্ছিলো। তাহলে বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট কেন এতদিন প্রস্তুতি নেয়নি? আর ভোট কতদিন পেছালে ঐক্যফ্রন্টের মনঃপুত হবে?

বাস্তবতা হলো, ভোটের তারিখ পেছানো না পেছানোর চেয়ে বড় ইস্যু, প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাদের যে সংলাপ হয়েছে, সেখানে কোনো সমঝোতা হয়নি। এটি আরও স্পষ্ট এ কারণে যে, তফসিল ঘোষণার দিনই বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পুনরায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এর আগের দিন আইন মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে বলেছে, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে নাইকো দুর্নীতি মামলার বিচার পুরান ঢাকার সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগারেই হবে। সরকার বলছে, এটি আইন-আদালতের বিষয়। কিন্তু বিরোধীদের দাবি, সরকারের নির্দেশ ছাড়া এটি হয়নি।

জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ইস্যুতে প্রধান দুই দল ও জোটের মধ্যে যেরকম ঐকমত্য থাকার কথা, সেটি একেবারেই অনুপস্থিত এবং এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কয়েকটা ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা ও আশঙ্কা রয়েছে।

১. ঘোষিত তফসিল অনুযায়ীই নির্বাচন হবে এবং সেটি অংশগ্রহণমূলক হবে না। অর্থাৎ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিরই পুনরাবৃত্তি হবে। যদিও সরকার বারবারই আশ্বস্ত করেছে যে, ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন তারাও চায় না। কারণ আওয়ামী লীগের মতো একটি বড় দল, যারা গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘদিন লড়াই-সংগ্রাম করেছে, তাদের জন্য পরপর দুদফায় একতরফা নির্বাচন মোটেই সম্মানজনক নয়। কিন্তু যদি ঘোষিত তফসিলে বিএনপি ও তার জোট নির্বাচনে অংশ না নেয়, তাহলে ২০১৪ সালের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন।

২. বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের সাথে সংলাপের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী দুয়েকদিনের মধ্যে সংবাদ সম্মেলন করবেন বলে শোনা যাচ্ছে। সেখানে তিনি ভোটের ব্যাপারে কী বক্তব্য দেন এবং সেই বক্তব্যে বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় ঐক্যজোট যদি আশ্বস্ত বা সন্তুষ্ট হয়, তাহলে খেলাটা একরকম। কিন্তু যদি তারা সন্তুষ্ট না হয় তাহলে নতুন কোনো কর্মসূচি আসতে পারে। প্রশ্ন হলো, সেই কর্মসূচির ধরন কী হবে? ফের রাজপথে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়বে? যদি পড়ে তাহলে তার পরিণতি কী হবে, তা এখনই বলা মুশকিল।

৩. জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যদি সরকার বা নির্বাচন কমিশনের উপরে সত্যিই কোনো চাপ তৈরি করতে পারে এবং তাতে যদি দেশর মানুষের সমর্থন থাকে, তাহলে পুনঃতফসিল হতে পারে এবং সংবিধানের ভেতরে থেকেই নির্বাচন মাসখানেক বা তারও বেশি সময় পিছিয়ে যেতে পারে। যেমন রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দিতে পারেন এবং সংবিধান অনুযায়ী সংসদ ভেঙে দেয়ার নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন হতে পারে (কিন্তু এই সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ)।

৪. ধরা যাক, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ২৩ ডিসেম্বর নির্বাচনে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলো, তখন বিএনপি ও তার দুটি জোটে (ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোট) ভাঙন দেখা দিতে পারে এবং একটি অংশ নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। এমনকি বিএনপির সিনিয়র কোনো কোনো নেতাও এই প্রক্রিয়ায় যোগ দিতে পারেন।

৫. যদি খালেদা জিয়া ভোট পর্যন্ত জেলেই থাকেন, তাহলে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জাতীয় ঐক্যজোটের প্রধান ড. কামাল হোসেন বেগম জিয়াকে কারাগারে রেখে নির্বাচনে অংশ নেবেন কি না—সেটি একটি বড় প্রশ্ন। সম্প্রতি জোটের সমাবেশে নেতারা ঘোষণা দিয়েছেন, তাার বেগম জিয়াকে মুক্ত করবেন। কিন্তু সেটি কোন প্রক্রিয়ায়? বলাই বাহুল্য যে, খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি আদালদের এখতিয়ার হলেও সরকার যদি না চায়, তাহলে তার মুক্তির সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কারণ তার প্যারোলে মুক্তি কিংবা চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর মতো প্রক্রিয়ায়ও সরকারের সরাসরি অনুমোদন লাগবে। সেরক কোনো লক্ষ্মণ কি দেখা যাচ্ছে?

৬. তফসিল ঘোষণার পরও ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ তখন বিরোধী দলে ছিল আওয়ামী লীগ এবং এই দাবি আদায় করে নিতে পেরেছিল। দ্বিতীয়ত তখন ক্ষমতায় ছিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এখন ক্ষমতায় দলীয় সরকার এবং বিএনপি ও তার জোটের যে ক্ষমতা, তাতে তারা আওয়ামী লীগের একটি শক্তিশালী দলের কাছ থেকে এরকম দাবি আদায় করে নিতে পারবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট কারণ আছে।

৭. যদি খালেদা জিয়ার জেলে থাকা এবং বিএনপির দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের লন্ডনে থাকা অবস্থাতেই বিএনপি ও তার জোট নির্বাচনে অংশ নেয়, তাহলে সেটি দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন ঘটনার জন্ম দেবে। এটি হলে তাকে ‘মাইনাস ওয়ান’ বলা যাবে। কারণ দেশের রাজনীতিতে ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা বহু পুরনো। অর্থাৎ হাসিনা-খালেদার বাইরে রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ। ওয়ান ইলেভেনের সময়েও এই প্রচেষ্টা চলেছে। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। এবার যদি বেগম জিয়াকে কারাগারে রেখে বিএনপিকে নির্বাচনে আনা যায়, তাহলে সেটি যারা মাইনাস ফর্মুলায় বিশ্বাস করেন, তাদের একটি জয় হবে। যদি তাই হয়, তাহলে এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী ধরনের মেরুকরণ তৈরি করবে—তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক।

এইচআর/এমএস

যদি খালেদা জিয়ার জেলে থাকা এবং বিএনপির দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের লন্ডনে থাকা অবস্থাতেই বিএনপি ও তার জোট নির্বাচনে অংশ নেয়, তাহলে সেটি দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন ঘটনার জন্ম দেবে

আপনার মতামত লিখুন :