জাতীয় নির্বাচন ও জনপ্রত্যাশা

শাম্মী আক্তার
শাম্মী আক্তার শাম্মী আক্তার
প্রকাশিত: ১১:০৭ এএম, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮

আসন্ন জাতীয় একাদশ সংসদ নির্বাচন এবং নতুন বছরকে ঘিরে অনেকের অনেক রকমের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, ও অর্থনৈতিক প্রত্যাশা আছে। এখানে বিশেষভাবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে কিছু ছোট ছোট প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করছি।
শিক্ষা:
১. আমরা জানি পৃথিবীতে অনেক ধরনের যুদ্ধ আছে তবে দুঃখজনক ভাবে বর্তমানে আমাদের দেশে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে এক নতুন যুদ্ধ আবির্ভূত হয়েছে। তা হচ্ছে "বিসিএস যুদ্ধ"। এই যুদ্ধ থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের মুক্তি দেয়া অনিবার্য বলে মনে করি। আমার মনে হয় সমজাতীয় বিষয়গুলো একত্রিত করে বিষয় ভিত্তিক প্রশ্ন প্রণয়নের মাধ্যমে একই সময়ে আলাদা আলাদা ভাবে বিসিএস ক্যাডার নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন।

একই ছাতার নিচে সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে টেনে হিঁচড়ে এনে এবং পঠিত বিষয় তুচ্ছ করে বাংলা, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞান, অংক দিয়ে জর্জরিত না করাটাই মনে হয় উত্তম। বিষয় ভিত্তিক ক্ষেত্র বিবেচনা করে নতুন নতুন ক্যাডার পদ তৈরি করাও প্রয়োজন। বিষয় ভিত্তিক বলতে হতে পারে মেডিকেলের জন্য স্বাস্থ্য বিসিএস (যেমন হয়), ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্ট গুলোর জন্য ইঞ্জিনিয়ারিং বিসিএস, বায়োলজিক্যাল সাইন্স (পাবলিক হেলথ, ফুড এন্ড নিউট্রিশন বায়োটেকনোলজি, মাইক্রোবায়োলজি, ফার্মেসি, বায়োকেমিস্ট্রি ইত্যাদি) সাবজেক্ট গুলোর জন্য বায়োলজিক্যাল সাইন্স বিসিএস, বিবিএ এর জন্য বিজনেস বিসিএস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ল,পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ক্রিমিনোলজি ইত্যাদি- সাবজেক্টগুলো জন্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন / পুলিশ বিসিএস, কলেজ ভিত্তিক সাবজেক্ট গুলোর জন্য শিক্ষা বিসিএস, অর্থনীতি, ডেভলপমেন্ট স্টাডিজ ও সমজাতীয় সাবজেক্ট গুলোর জন্য ইকোনমিক বিসিএস, জার্নালিজম ও মিডিয়া বিষয়ক সাবজেক্ট গুলোর জন্য মিডিয়া/গণমাধ্যম বিসিএস, এগ্রিকালচারের জন্য এগ্রিকালচার বিসিএস, ইত্যাদি।

এর মাধ্যমে যার যার বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান সময় নিয়ে উত্তম ভাবে আরোহণের এবং উৎকর্ষ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে একাডেমিক্যালি যেমন ছাত্র ছাত্রীরা বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট ও মনোযোগী হবে তেমনি প্রফেশনালি সবাই বিষয় ভিত্তিক জ্ঞান প্রয়োগের প্রকৃত সুযোগ পাবে এবং এতে করে প্রকৃত অর্থেই মানুষ সঠিক সেবা পাবে এবং দেশ উপকৃত হবে।

২. আমরা জানি বাংলাদেশে ১৯৯০ সালে ৬ ফেব্রুয়ারি বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন পাস হয় এবং ১৯৯২ সালে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা চালু হয়। কিন্তু আমি মনে করি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ যে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে তাতে করে এখন আমাদের সময় এসেছে এই আইন পরিবর্তন করার। এখন আমাদের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার পরিবর্তে বাধ্যতামূলক মাধ্যমিক শিক্ষা আইন প্রণয়নের কথা ভাবতে হবে।

এতে করে শিক্ষার দিক দিয়ে একদিকে যেমন জাতি এগিয়ে যাবে অন্যদিকে একটি সুস্থ সবল জাতি তৈরিতেও এটি ভূমিকা রাখবে। কারণ আমরা সবাই জানি নেপোলিয়ন বোনাপার্ট এর কথা "আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও আমি তোমাদের একটি সুন্দর জাতি উপহার দিব"। যথার্থই বলেছেন! একজন মা যদি শিক্ষিত হয় তাহলে একটি পরিপুষ্ট শিশু জন্মদানের এবং প্রতিপালনের সুযোগ অনেক বেশি বেড়ে যায় এবং পরবর্তীতে ঐ শিশুর সুশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার সম্ভাবনাও অনেক বেড়ে যায়।

৩. অনেক সময় দেখা যায় একজন সন্তানের বাবা এক জেলায় চাকুরি করে অন্যদিকে মা অন্য জেলায় চাকুরি করে। এতে করে সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের পথ কন্টকময় হয়ে যেতে পারে। প্রত্যাশা করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবার ক্ষমতায় যাবেন এবং এ ব্যাপারে সুদৃষ্টি দিবেন যাতে করে সরকারি চাকুরীজীবী বাবা মায়েরা একই জেলায় চাকুরি করতে পারে। আমি মনে করি এতে শুধু সন্তানের লাভ তাই নয় বরং এতে সরকারেরও লাভ আছে।

৪. সত্যয়নের ক্ষমতা! এ এক আজব ব্যাপার । ভাবতে গেলে কেমন অদ্ভুত মনে হয়! যে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে আমরা চার পাঁচ বছর যাবত আগলে রাখি, তাদের শিক্ষা দেই। দেখা যায় পড়াশোনা শেষে সেই ছাত্র-ছাত্রীরাই যখন সরকারি চাকুরির জন্য আবেদন করতে চায় তখন তাদের কাগজপত্র সত্যয়নের জন্য কোন বিসিএস ক্যাডারের শরণাপন্ন হতে হয় যারা কিনা সেই সব ছাত্র-ছাত্রীদের অচেনা, অজানা!

আমি মনে করি এই সত্যয়নের সিস্টেমটাই বাতিল করে দেয়া উচিত অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সত্যয়নের ক্ষমতা দেয়া উচিত কারণ এর ফলে দেখা যায় অনেক সময় ছাত্র-ছাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়ে এবং তাদের সুবিধার্থে অনেক সময় নিজেরাই আগাম বিসিএস ক্যাডার হয়ে যায়!

৫. আমাদের দেশে দেখা যায় মেয়েরা পড়াশোনাচলাকালীন অবস্থায় অনেক সময় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় বা পারিবারিক চাপে অনেক সময় আবদ্ধ হতে হয়। এর ফলে পরবর্তীতে তারা সংসার সামলানো এবং সন্তান লালন-পালনের জন্য ক্যারিয়ারের মূল্যবান সময় থেকে বেশ পিছিয়ে পড়ে। পরবর্তীতে এর প্রভাব পড়ে পরিবারের উপর ,সমাজের উপর, সর্বোপরি দেশের উপর।

কারণ দেশতো তার জন্য বিনিয়োগ করেছে কিন্তু দেখা যাচ্ছে এই পারিবারিক, সামাজিক চাপ বা বাধার জন্য সে পিছিয়ে পড়ছে। তাই আমার মনে হয় আমাদের দেশে এখনো বিশেষ করে মেয়েদের জন্য "কোটা" প্রযোজ্য কারণ এখনোও দেখা যায় যেখানে ১০ জন ছেলে চাকরি করে সেখানে একজন বা দুইজন মেয়ে আছে। তাই আমি মনে করি আরো কিছু বছর মেয়েদের জন্য কোটা ব্যবস্থা চালু থাকা দরকার এবং আরো বেশি ভালো হবে যদি ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের চাকুরিতে প্রবেশের বয়স এক বছর বাড়িয়ে দেয়া যায়।

আমি বিশ্বাস করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুব ভালো করেই বোঝেন কোন দেশের মেয়েরা যখন এগিয়ে যায় সেই দেশও তখন দ্রুত গতিতে এগিয়ে যায়। কারণ মেয়েদের উন্নয়নের উপরে নির্ভর করে সন্তানের উন্নয়ন, পরিবারের উন্নয়ন, সমাজের উন্নয়ন এবং সর্বোপরি দেশের উন্নয়ন।

৬. সরকারি চাকুরিতে দরখাস্ত জমা দানের সময় ব্যাংক ড্রাফ্ট গ্রহণ করাটা আমার কাছে এক প্রকার জুলুম মনে হয়। এক্ষেত্রে যৎসামান্য অর্থ গ্রহণ করা সমীচীন হবে বলে মনে করি। আমি বিশ্বাস করি আমাদের দেশ এখন আর সেই অবস্থায় নেই যে এসব বেকার ছেলে মেয়েদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে সচ্ছল হতে হবে।
৭. সকল পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দরিদ্র মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য কর্তৃপক্ষের স্টাইপেন্ড ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। যাতে করে অর্থাভাবে অকালে কোন সম্পদ নষ্ট না হয়ে যায়! এটা দেশের জন্য এক বিরাট ক্ষতি।

স্বাস্থ্য:
১. বাধ্যতামূলকভাবে একজন সুস্থ সবল মা তার সন্তানকে ন্যূনতম ছয় মাস বয়স পর্যন্ত মাতৃদুগ্ধ পান করাবে। এটা তার সন্তানের অধিকার! এই অধিকার আদায়ের জন্য প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন করতে হবে। যাতে করে সকল শিশু তার অধিকার ভোগ করতে পারে।

২. যত্রতত্র যেখানে সেখানে অপরিকল্পিতভাবে মানহীন, ক্ষতিকারক খাবার বিশেষ করে শিশু খাবার তৈরির কারখানা বা বেকারি করা যাবে না। এ ব্যাপারে আরো সজাগ সূক্ষ্ম তদারকি প্রয়োজন।

৩. সকল বিশেষায়িত হাসপাতাল যেমন জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ,জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, কিডনি ইনস্টিটিউট ইত্যাদির শাখা বিভাগীয় পর্যায়ে চালু করতে হবে। এতে করে দেশীয় অত্যাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা পৌঁছে যাবে মানুষের দোরগোড়ায়।

প্রত্যেক চিকিৎসক রোগীদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপত্র প্রদানের পাশাপাশি পর্যাপ্ত সময় দিয়ে প্রয়োজনীয় কাউন্সিলিং করবেন। আসলে যদি আমরা নন- কমিউনিকেবল ডিজিজ যাকে আবার লাইফ স্টাইল ডিজিজ বললেও ভুল হবে না এর প্রতিরোধ চাই তাহলে ওষুধের থেকে সঠিক কাউন্সিলিং বেশি জরুরি।

এক্ষেত্রে আমি মনে করি সমস্ত রকমের প্রতিষ্ঠানে অন্তত একজন করে পুষ্টিবিদ নিয়োগ দেয়া উচিত কারণ আশঙ্কা করা হচ্ছে ২০২০ সালের মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ এই নন কমিউনিকেবল ডিজিজ যেমন হাইপার টেনশন, কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ, ডায়াবেটিস , ক্যান্সার ইত্যাদিতে ভুগবে।
৪. সকল ওষুধের ব্যবস্থাপত্র প্রিন্টেড ফর্মে দিতে হবে।

৫. বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে "বাল্য গর্ভধারণ নিরোধ" বিষয়টা সংযুক্ত করতে হবে অর্থাৎ কখনো যদি কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে ১৮ বছরের আগে কন্যাশিশুর বিবাহ হয়ে থাকে তবে সে ক্ষেত্রে সে ১৮ বছরের আগে গর্ভধারণ করতে পারবে না। কারণ আমরা জানি বাল্যবিবাহ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

মেয়েদের শরীর ১৮ বছর পর্যন্ত বাড়তে থাকে যদিও ১২/১৩ বছরের মধ্যে মেনস্ট্রুয়াল সাইকেল শুরু হয় এবং একজন মেয়ে মা হবার ক্ষমতা প্রাপ্ত হয় তবুও ১৮ বছরের আগে প্রসবের জন্য মেয়েদের শরীর প্রস্তুত হয় না। তাছাড়া ১৮ বছরের আগে বিয়ে হলে মেয়েদের কোমরের হাড় ঠিকমতো বাড়তে পারে না। ফলে প্রসবের সময় মা ও বাচ্চা উভয়ের মারা যাওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।

৬. জাতীয় ওষুধ নীতিমালা ২০১৬ অনুযায়ী "অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারকারী গাইডলাইনস" কঠোরভাবে মানতে হবে যাতে করে কোনোভাবেই কোনো অ্যান্টিবায়োটিক "ওভার দ্য কাউন্টার" (ওটিসি) মানে আরও সহজ করে বলতে গেলে চাইলেই পাওয়া যাবে এমন ওষুধ এর লিস্ট না পড়ে। নাহলে একসময় দেখা যাবে আমাদের সব ক্যাপাসিটি থাকা সত্ত্বেও সঠিক কার্যকরী অ্যান্টিবায়োটিক এর অভাব আমরা মহামারীতে পতিত হচ্ছি।

৭. মানহীন অথবা দুর্বল মানসম্পন্ন ফার্মাসিউটিক্যালস এবং ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ এর মান যথাযথভাবে উন্নত করতে হবে নতুবা তাদের উৎপাদন বন্ধ করে দিতে হবে। স্বাস্থ্য নিয়ে কোনভাবেই কোন কম্প্রোমাইজ বা ঝুঁকি নেয়া যাবে না।

৮. খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে খাদ্য ও পুষ্টি মন্ত্রণালয় হিসেবে নামকরণ করতে হবে। খাদ্য ও পুষ্টি একে অপরের পরিপূরক। একটি ছাড়া আরেকটি অসম্পন্ন । তাই আমরা যেমন একটি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ নিরাপদ জাতি প্রত্যাশা করি তেমনি একটি পুষ্টিসমৃদ্ধ বলিষ্ঠ জাতিও প্রত্যাশা করি। তাই খাদ্য মন্ত্রণালয় এর পরিপূর্ণতার জন্য এবং মন্ত্রণালয় কে আরো বেশি অর্থবহ করার জন্য এটা খুবই জরুরি।

পরিশেষে প্রত্যাশা করি শেখ হাসিনার দুর্বার সাহসী নেতৃত্বে বাংলাদেশ আবারো নতুন নতুন মাইলফলক স্পর্শ করবে। দেশ এগিয়ে যাবে এবং আমাদের সন্তানেরা ভালো থাকবে। এই প্রত্যাশা অবিরাম।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ফলিত পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
shammyiu@yahoo.com

এইচআর/জেআইএম

সমস্ত রকমের প্রতিষ্ঠানে অন্তত একজন করে পুষ্টিবিদ নিয়োগ দেয়া উচিত কারণ আশঙ্কা করা হচ্ছে ২০২০ সালের মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ এই নন কমিউনিকেবল ডিজিজ যেমন হাইপার টেনশন, কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ, ডায়াবেটিস , ক্যান্সার ইত্যাদিতে ভুগবে।

আপনার মতামত লিখুন :