ডাইনেস্টির নীরব ডাইমেনশন

মোস্তফা কামাল
মোস্তফা কামাল মোস্তফা কামাল , সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০৯:৪৯ এএম, ২৩ জানুয়ারি ২০১৯

নীরবে, নিঃশব্দে এবং স্বাভাবিক গতিধারায় দেশের রাজনীতিতে উত্তরাধিকারের বিস্তার ঘটছে। মানুষ তা মেনেও নিচ্ছে। অথবা মেনে নেয়ানো হচ্ছে। এক সময় রাজনীতিতে উত্তরাধিকার, পরিবারতন্ত্র, রাজতন্ত্র নিয়ে আপত্তি, সমালোচনা, বাৎচিত থাকলেও সেটা কেটে গেছে। সঙ্গে বৈচিত্র্যও এসেছে। দলে এবং ক্ষমতায় পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কোথাও কোথাও মানুষ নিজ নিজ এলাকায় জানবাজ অবদানও রাখছে।

দেখতে দেখতে ডাইনেস্টির ডাইমেনশনটা এবার নতুন মাত্রায় এসে ঠেকেছে। অমোঘ ভাগ্যলিপির মতো ডাইনেস্টি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডালপালা ছড়িয়ে অনিবার্যই হয়ে উঠছে। বাবার মৃত্যুর পরে সন্তান, স্ত্রী, ভাই-ভাতিজাদের এমপি বা জনপ্রতিনিধি হওয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন কোনো ঘটনা নয়।

এবার এ ধারায়ও বাড়তি যোগ। বাবার পর ছেলের বদলে এবার ছেলের বদলে বাপকে এমপি করে আনার উদাহরণ তৈরি হয়েছে টাঙ্গাইল-৩ ঘাটাইল আসনে। সেখানে আওয়ামী লীগের গেলবারের এমপি আমানুর রহমান খান রানার বদলে এবার আওয়ামী লীগের এমপি হয়েছেন তার বাবা আতাউর রহমান খান।

এবার প্রথমবারের মতো একইসঙ্গে সংসদে আছেন বাবা- ছেলে, জোড়ায় জোড়ায় ভাই এবং জামাই-শ্বশুর। রয়েছেন আলোচিত এমপি দম্পতি এরশাদ ও রওশন। এরশাদের ভাই জিএম কাদের। সম্পর্কে ভাগ্নে মশিউর রহমান রাঙাও আছেন। বাবা জীবদ্দশায় সন্তানের এমপি হওয়া সৌভাগ্যবানের মধ্যে রয়েছেন রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের ছেলে রেজওয়ান আহমদ তৌফিক। আবদুল হামিদ স্পিকার থেকে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরে থেকেই তার শূন্য আসনে এমপি হয়েছেন তৌফিক।

ঘটনাচক্রে জীবদ্দশায়ই কক্সবাজারে স্বামী সাবেক এমপি বদির আসনে এমপি করা হয়েছে তার একাধিক স্ত্রীর একজন শাহীন আক্তার চৌধুরীকে। এর বাইরে বাপ-বেটা, জামাই-শ্বশুর, ভাই-ভাই, ভাই-ভাতিজা, দেবর-ভাবী তো রয়েছেনই। বাগেরহাট থেকে নির্বাচিত শেখ হেলালের সঙ্গে সংসদে এসেছেন তার ছেলে শেখ সারহান নাসের তন্ময়ও।

দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা এবারের এমপিদের মধ্যে চার জোড়া আপন ভাই রয়েছেন। পরিবারতন্ত্রের এই আট নক্ষত্রের মধ্যে রয়েছেন- জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও তার ছোট ভাই জি এম কাদের। নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমান ও তার ভাই সেলিম ওসমান। এর আগে তাদের আরেক ভাই নাসিম ওসমানও এমপি ছিলেন। তার মৃত্যুর পরে সেই শূন্য আসনে সেলিম ওসমান নির্বাচন করেন।

শেখ হেলালের ভাই শেখ জুয়েল ছাড়াও রয়েছেন বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য মাদারীপুরের নূরে আলম চৌধুরী লিটন, তার ভাই ফরিদপুরের এমপি মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন। মোটমাটে এবার সংসদে এসেছেন বঙ্গবন্ধু পরিবারের ৯ জন। তারা হলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ, শেখ ফজলে নূর তাপস, শেখ হেলাল উদ্দিন, ছেলে শেখ সারহান নাসের তন্ময়, ভাই শেখ সালাউদ্দিন জুয়েল, নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন, তার ভাই নিক্সন চৌধুরী।

উপরোক্ত সদস্যদের আত্মীয়-স্বজনরাও রয়েছেন সংসদে। নিক্সন চৌধুরী সাবেক মন্ত্রী জাতীয় পার্টি (জেপি)’র নেতা আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর মেয়ের জামাই। এবার আরেকটি জামাই-শ্বশুর জুটি হচ্ছেন- মহাজোটের শরিক বিকল্পধারা বাংলাদেশের মহাসচিব মেজর (অব.) এম এ মান্নান ও যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি চৌধুরী। এবার মাহীর বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি একিউএ বদরুদ্দোজা চৌধুরী নির্বাচনে অংশ নিলে সংসদে দেখা যেতো আরেক জোড়া বাপ-বেটা।

রাজনীতি ও ক্ষমতায় ডাইনেস্টির এ ডায়নামিজমকে চাপিয়ে দেয়া বলা হলে তা একতরফা হয়ে যায়। শুধু স্বজনরা নন, দলের নেতাকর্মী এমন কি সাধারণ মানুষও যারপরনাই ভূমিকা রাখছে পরিবারতন্ত্রকে সামনে এগুতে দিতে। কোথাও তৃণমূল বা স্থানীয় কারো পক্ষ থেকে বাধা বা আপত্তির খবর মেলেনি। বরং তাদের প্রতিষ্ঠিত করতে ওঠেপড়ে লাগার খবরই বেশি।

নানামুখী নগদ হিসাব ছাড়াও দলের, নেতৃত্বের শুভাশীষের মোহে অন্যরা বরং নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থেকে সরে গিয়ে পথ পরিস্কার করে দিচ্ছেন ডাইনেস্টির কল্যাণে। বিভিন্ন পরিবারের বাতকে বাত নিন্দা-সমালোচনা হলেও দেশে দেশে রাজনীতিতে উত্তরাধিকার সংস্কৃতির ঐতিহ্য অনেক দিনের। উপমহাদেশসহ পুরো বিশ্বেই চলে আসছে উত্তরাধিকারের ধারা। যার যার মতো এর সুফলও মিলছে।

প্রতিবেশী ভারত, এমনকি সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও বেশ পাকাপোক্ত পরিবারতন্ত্র। ভারতের রাজনীতিতে নেহরু-গান্ধীর বাইরে আরো অনেক পরিবারের লোকেরা যুগের পর যুগ নানা পদে ছিলেন এবং আছেন। শ্রীলংকায় ৮০টির বেশি পরিবারের নাম জানা যায়, যাদের রাজনীতিতে নানা রকম প্রভাব-প্রতিপত্তি রয়েছে।

ভারতে নেহরু-গান্ধী পরিবার, যুক্তরাষ্ট্রে বুশ ও কেনেডি পরিবার, চীনের চিয়াং পরিবার, নেপালে থাপা, জাপানে ফুকুদা, দক্ষিণ কোরিয়ায় পার্ক ও উত্তর কোরিয়ায় কিম পরিবার। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতেও এক বা একাধিক পরিবারের প্রভাব রয়েছে। উত্তরাধিকার রাজনীতির আপডেট উদাহরণ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায়। নানা মন্দ কথা বলা হলেও বাংলাদেশে বাস্তবতাটা ভিন্ন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানীর মতো কিংবদন্তী নেতারাদের দল– আদর্শ, অনুসারী খুঁজে পাওয়া যায় না।

উত্তরাধিকার থাকলে তাদের এ দশা না-ও হতে পারতো বলে অনেকের মূল্যায়ন। আর রক্তের উত্তরাধিকার থাকাতেই তাদের পরবর্তী বাংলাদেশে শেখ ও জিয়া পরিবার দাপটের সঙ্গে টিকে আছে রাজনীতিতে। শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়াকে নেতৃত্বে আনা না হলে বঙ্গবন্ধুহীন আওয়ামী লীগ ও জিয়াহীন বিএনপির ইতিহাস ভিন্ন হতে পারতো।

হাসিনা-খালেদাকে দলের ত্রাণকর্তা হিসেবে লুফে নিয়েছে নেতা-কর্মীরা। স্বাভাবিক নিয়মেই লাখে লাখ, কাতারে-কাতার ভক্ত-সমর্থক, কর্মী শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়ার। এই দুই উত্তরাধিকারের একনিষ্ঠ শ্রম, মেধা, প্রজ্ঞায় সগৌরবে দুই দল। রাজনীতিতে উদ্ভাসিত দুই রহমান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমান। বাস্তবতার অনিবার্য জেরে যার ছিটাফোটাও নেই সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা বা মওলানা ভাসানীর।

দলে উত্তরাধিকার নিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উল্লেখযোগ্য কিছু বক্তব্য রয়েছে। এবারের নির্বাচনের বেশ আগে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে তার ঘনিষ্ট কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে একান্ত আলাপে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছিলেন দলে পরিবারতন্ত্রের রাজনীতি চান না তিনি।

তিনি দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদেরও উত্তরাধিকারতন্ত্রের মানসিকতা পরিহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। কয়েক বছর ধরে তৃণমূলে অর্থাৎ পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ের কয়েক শীর্ষ নেতার ছেলেমেয়ে কিংবা আত্মীয়স্বজনের প্রাধান্য পাওয়ার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনলে তিনি তার এ মনোভাবের কথা জানিয়েছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী কারও নাম উল্লেখ না করে বলেছিলেন, 'কিছু নেতা, মন্ত্রী ও এমপির সন্তান ও আত্মীয়স্বজনকে কেন রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে? তাদের কেন দলের মনোনয়ন পেতে হবে?' এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তার সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয়ের প্রসঙ্গ এনে জানান, সজীব ওয়াজেদ জয় আওয়ামী লীগের জন্য অনেক কিছুই করছেন। কিন্তু তিনি জয়কে রাজনীতিতে আনেননি।

প্রধানমন্ত্রীর এমন মনোভাবের তথ্য তখন গণমাধ্যমেও এসেছিল। এতে ভবিষ্যতে ভিন্ন কিছুর ধারণা করা হয়েছিল। শঙ্কিত হয়ে উঠেছিলেন দলে পরিবারতন্ত্র কায়েম ও এ চেষ্টায় বলিয়ানরা। এবারের সংসদ নির্বাচনের আগে তাদের সেই ভয় কেটে গেছে। সামনে উপজেলা নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকারের অন্যান্য নির্বাচনে বাকিটাও দূর হয়ে ডাইনেস্টির আরো বিস্তারের জ্যোতির্ময় হাতছানি।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।

এইচআর/এমকেএইচ

রাজনীতি ও ক্ষমতায় ডাইনেস্টির এ ডায়নামিজমকে চাপিয়ে দেয়া বলা হলে তা একতরফা হয়ে যায়। শুধু স্বজনরা নন, দলের নেতাকর্মী এমন কি সাধারণ মানুষও যারপরনাই ভূমিকা রাখছে পরিবারতন্ত্রকে সামনে এগুতে দিতে। কোথাও তৃণমূল বা স্থানীয় কারো পক্ষ থেকে বাধা বা আপত্তির খবর মেলেনি। বরং তাদের প্রতিষ্ঠিত করতে ওঠেপড়ে লাগার খবরই বেশি।

আপনার মতামত লিখুন :