বর্জনে অর্জন কী?

অঘোর মন্ডল
অঘোর মন্ডল অঘোর মন্ডল , এডিটর, দীপ্ত টিভি
প্রকাশিত: ১০:০৮ এএম, ২৭ জানুয়ারি ২০১৯

 

ভোট গণতন্ত্রের অংশ। স্বাধীনভাবে মানুষ তাঁর পছন্দের ব্যক্তিকে নির্বাচন করে ভোটের মাধ্যমে। সেটা রাষ্ট্র-সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যায়ে। দিন কয়েক আগে শেষ হয়েছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সেখানে সবদল অংশ নিয়েছে। নির্বাচনটা অংশগ্রহণমূলক হয়েছে তা নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই।

অনেকে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হয়েছি কী না সে ব্যাপারে প্রশ্ন তুলছেন। সংশয় প্রকাশ করছেন। সেটাও তাদের স্বাধীন মতামত। আর এই মতমত প্রকাশের স্বাধীনতাও গণতন্ত্রের একটা অংশ। সেই অংশ বাংলাদেশে কত শক্তিশালী তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। তবে প্রশ্নটা শুধু বাংলাদেশে নয়। গোটা বিশ্বজুড়ে। আর সেই প্রশ্নের ভাষা ভিন্ন। কিন্তু ধরন এক।

তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নয়, প্রশ্নটা এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে। আগামী মার্চে উপজেলা নির্বাচন। সেই নির্বাচন নিয়ে তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। স্থানীয় বা তৃণমূলের রাজনীতিবিদরা নির্বাচন নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। বিভিন্নভাবে প্রচারণাও চালাছেন। এরই মধ্যে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে তারা উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেবে না। উপ-নির্বাচনেও অংশ নেবে না।

দলটির সাধারণ সম্পাদক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের সামনে খুব কম শব্দে জানিয়েছেন তাদের নির্বাচনে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্তের কথা। শব্দ চয়ন। বাচনভঙ্গি সব মিলিয়ে মির্জা সাহেব খুব সুন্দরভাবেই উপজেলা নির্বাচনে বিএনপির অংশ না নেয়ার কথা জানিয়েছেন। কিন্তু তাদের এই নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তে বিএনপির অর্জন কী হবে? সেটা নিশ্চয়ই ভেবে দেখা উচিত দলটার। কিন্তু যারা ভাববেন তাদের চিন্তনপ্রণালী থেকে যে উত্তর আসে তা আবার তারা মুখে বলতে পারেন না!

কারণ, মুখস্থ সংলাপের মত করে তাদের যা বলতে হয়, সেটা তাদের রাজনৈতিক চিন্তার ফসল নয়। তাদের অনেকের রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গেও যায় না। কিন্তু তারা কিছু বলতে পারেন না। কারণ, এই চিন্তা বৈদুত্যিন প্রক্রিয়ায় আমদানি হয় বিদেশ থেকে। দলের জন্য, দেশের জন্য, জনগণের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য এই আমাদানি করা চিন্তা ক্ষতিকারক সেটা সবাই জানেন। জানেন বিএনপির অনেকেই। কিন্তু তারা নিরুপায়। তাদের কিছু করার নেই।

নির্বাচন বর্জন বিএনপি ২০১৪ সালেও করেছে। শুধু বর্জন নয়। প্রতিহত করার চেষ্টাও করেছে। কিন্তু ফল? বিএনপি নামক একটা দল দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে। সাংগঠিক সক্ষমতা হারিয়েছে। জন সমর্থন হারিয়েছে। আর ক্ষমতাসীন দলকে আরো সুসংহত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

এই যুক্তি বা বাক্যগুলোকে বিএনপি এবং ক্ষমতাসীন দলের অনেকের কাছে ভাল নাও লাগতে পারে। কিন্তু এটা বাস্তবতা। এটাকে অস্বীকার করা মানে কার্পেটের নিচে আগুন লুকানোর চেষ্টা। রাজনীতিতে কিছু ভুল আছে, যা আরেকটা ভুলের জন্ম দেয়। কিছু ভুল আছে যা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভুল শুধরানোর সুযোগ থাকে। আবার কিছু ভুল আছে যা রীতিমত ঐতিহাসিক ভুল হিসেবে স্বীকৃত হয়ে থাকে। বিএনপি ২০১৪ সালে নির্বাচন বর্জন করে ঐতিহাসিক ভুল করেছিল। সেটা প্রমাণিত হয়েছে ২০১৮ সালের নির্বাচনে।

বিএনপি নির্বাচনমুখী দল। জন্মসূত্রে ক্ষমতায় থাকার জন্য এক জায়গায় জড়ো হওয়া ভিন্ন রাজনীতিবিদদের দল। সেই দলের লোকজন বেশি দিন ক্ষমতার বাইরে থেকে লড়াই-সংগ্রাম-আন্দোলন করবে এটা ভাবা কঠিন। ক্ষমতার বলয়ে জন্ম নেয়া দল ক্ষমতার অলিন্দ থেকে রাইরে গেলে তাদের নেতাকর্মীরা খুব বেশি সক্রিয় থাকবে, এটা রাজনীতির সহজ গণিতে মেলানো কঠিন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপির যে ফলাফল তাতে উপজেলা নির্বাচনে তারা খুব বেশি ভাল কিছু করতে পারবে, সেটা দলের নেতারও বিশ্বাস করতে পারেন না। সেই চিন্তা থেকে হয়তো উপজেলা নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। কিন্তু তাতে নির্বাচন থেমে থাকবে না। এরশাদের সময় উপজেলা নির্বাচন প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছিল প্রথম পর্যায়ে। কারণ, সব রাজনৈতিক দলগুলো মিলিতভাবে সেটা প্রতিহত করার জন্য আন্দোলন করেছিল। বিএনপি এককভাবে করেনি। আর সেই বিএনপির সাথে এই বিএনপির পার্থক্য আকাশ-পাতাল।

তাছাড়া, উপজেলা নির্বাচন পরিচালনার জন্য বিএনপি নিশ্চয়ই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি করতে পারবে না। সেটা গ্রাহ্যতাও পাবে না। তা হলে, নির্বাচন বর্জন করে বিএনপির অর্জনটা কী? এই প্রশ্নের উত্তর তাঁদেরই খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু সেটা খোঁজার তেমন কোন আগ্রহ দলের নেতা-কর্মীদের আছে বলে মনে হয় না।

আবার উল্টো দিকে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলে কী হবে না হবে তা নিয়ে অতি উৎসাহী প্রতিক্রিয়া আসছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে থেকে। গণতন্ত্রে নির্বাচন বর্জন কোন সমাধান হতে পারে না। আবার নির্বাচন করে সংসদে না যাওয়া, শপথ না নেয়াও এটাও কোন গণতন্ত্রের সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ নয়।

বিএনপির নেতা-কর্মীদের জ্ঞান দেয়ার দায়িত্বও মিডিয়ার নয়। তারা বড় জোর গণতন্ত্রের দুর্বল জায়গাগুলোকে চিহ্নিত করতে পারেন। কিন্তু স্বাস্থ্য ফেরানোর দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের। বিএনপি তাঁর জন্মের পর আওয়ামী লীগকে দুর্বল করার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে দলে ভাঙন ধরানো, দলটাকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার জন্য সবই করেছে।

আওয়ামী লীগ অবশ্য সম্ভব্য ফলাফল কি হতে যাচ্ছে সেটা জেনেও নির্বাচনের ময়দান থেকে সরে দাঁড়ায়নি। এমন কী এরশাদের সামরিক শাসনের এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। তাতে তারা ক্ষমতায় আসতে পারেনি। অনেকে বলেছেন এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেয়ার কারণে এরশাদপতন পরবর্তী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারেনি! হয়তো তাই। কিন্তু সেটা সাময়িক কা তাৎক্ষণিক হিসাব।

রাজনীতির হিসাব নিকেশ মেলাতে হয় দূরবর্তী সময়ের কথা মাথায় রেখে। আওয়ামী লীগ নির্বাচন বর্জন করেনি বলেই তাঁদের দল, সংগঠনটা টিকে ছিল। বলা যায়, নির্বাচন ঘিরে দল সংগঠিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ এখন সেই ফলটা ভোগ করছে। বিএনপি অন্তত এই একটা অংক আওয়ামী লীগের ফরমুলায় মেলানোর চেষ্টা করুক। নির্বাচন বর্জনে বিএনপির কোন অর্জন হবে বলে মনে হয় না।

তাছাড়া বিএনপি যদি উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিয়ে সবগুলো উপজেলায় জয়ীও হয় তাতেও আওয়ামী লীগের পতন হয়ে যাবে না। তাই নির্বাচন বর্জন নয়, বরং অংশ নিয়ে যেটুকু যা অর্জন করা যাবে সেটা তাদের আগামীতে বিনিয়োগ হিসেবে কাজে লাগতে পারে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

এইচআর/এমএস

‘বিএনপি যদি উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিয়ে সবগুলো উপজেলায় জয়ীও হয় তাতেও আওয়ামী লীগের পতন হয়ে যাবে না। তাই নির্বাচন বর্জন নয়, বরং অংশ নিয়ে যেটুকু যা অর্জন করা যাবে সেটা তাদের আগামীতে বিনিয়োগ হিসেবে কাজে লাগতে পারে।’