প্রিয় জাসিন্ডা আর্ডার্ন, আমরা তোমায় ভালোবাসি

প্রভাষ আমিন
প্রভাষ আমিন প্রভাষ আমিন , হেড অব নিউজ, এটিএননিউজ
প্রকাশিত: ১০:০৬ এএম, ২৫ মার্চ ২০১৯

গত ১৫ মার্চ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হামলায় ৫০ জনের মৃত্যুর পর অনেকেই বলছিলেন, নিউজিল্যান্ড চিরদিনের জন্য বদলে গেল। প্রাথমিকভাবে এই বদলকে নেতিবাচক বলেই ধারণা করা হচ্ছিল। সবার ধারণা ছিল, শান্তির দেশ নিউজিল্যান্ড আর শান্তির থাকবে না, সন্ত্রাসীরা বুঝি সেখানে ঘাঁটি গেড়ে বদলে দেবে দেশটির মৌলিক চেতনা।

নিউজিল্যান্ড চিরদিনের জন্য বদলে গেছে ঠিকই, তবে সবার ধারণার মত নয়। মাত্র এক সপ্তাহে নিউজিল্যান্ড আরো ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। নিউজিল্যান্ড অশান্ত তো হয়ইনি, বরং নিউজিল্যান্ড থেকেই শান্তি, সাম্য, ভ্রাতৃত্বের বার্তা ছড়িয়েছে গোটা বিশ্বে। যে বদল হতে পারতো নেতিবাচক, স্রোতের বিপরীতে তাকে ইতিবাচক ধারায় নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব একজনেরই। তিনি নিউজিল্যান্ডের কনিষ্ঠতম প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আর্ডার্ন। মাত্র ৩৮ বছর বয়সে তিনি জিতে নিয়েছেন বিশ্বের কোটি মানুষের হৃদয়।

অসংখ্য ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত নিউজিল্যান্ড ছিমছাম শান্তির দেশ। কারো সাতে পাঁচে নেই। বিভিন্ন মানব উন্নয়ন সূচকে বরাবরই সামনের কাতারেই অবস্থান নিউজিল্যান্ডের। ক্রিকেট ছাড়া বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সাথে নিউজিল্যান্ডের তেমন যোগাযোগ নেই। নিউজিল্যান্ডের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীর নাম শুনেছি তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় মা হয়েছেন বলে। তবে এ ব্যাপারে তিনিই প্রথম নন। এর আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পদে থেকে মা হয়েছিলেন বেনজির ভুট্টো। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আর্ডার্নের মধ্যে যে এত বড় মানবতাবাদী লুকিয়ে ছিলেন, আমি অন্তত টের পাইনি। মাত্র ৩৮ বছর বয়সী জাসিন্ডা আর্ডার্ন এখন সবাইকে ছাড়িয়ে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন মানবতার পতাকা।

ক্রাইস্টচার্চে হামলার পর নিউজিল্যান্ডের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে অনেকগুলো যৌক্তিক প্রশ্ন উঠেছে। একজন সন্ত্রাসী অস্ত্র নিয়ে একটি মসজিদে ঢুকে নির্বিচারে গুলি করে মানুষ মারলো, ১৭ মিনিট ধরে সে হত্যাযজ্ঞ ফেসবুকে লাইভ করলো। সেখানে হত্যাযজ্ঞ শেষ করে গাড়ি চালিয়ে আরেকটা মসজিদে গেল। অস্ত্র বদলে সেখানেও ঠান্ডা মাথায় হত্যাযজ্ঞ চালালো। দুটি মসজিদে গুলি করে ৫০ জন মানুষকে হত্যার ৩৬ মিনিট পর হত্যাকারীকে গ্রেপ্তার করতে পারে পুলিশ।

বাংলাদেশের প্রায় পুরো জাতীয় ক্রিকেট দল অরক্ষিত অবস্থায় সেখানে গিয়েছিল। ৫ মিনিট আগে গেলেই ঘটতে পারতো আরো বড় বিপর্যয়। পুরো বিষয়টি নিউজিল্যান্ডের নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ত্রুটি হিসেবে চিহ্নিত হতে পারতো।

একজন লোক এতদিন ধরে প্রস্তুতি নিল, অস্ত্র সংগ্রহ করলো, ৭৩ পৃষ্ঠার মেনিফেস্টো লিখে অনলাইনে পোস্ট করলো; কিউই গোয়েন্দারা কিছুই টের পেলো না কেন? ১৭ মিনিট ধরে ফেসবুকে লাইভ করার পরও সে গাড়ি চালিয়ে আরেকটি মসজিদে যাওয়ার সুযোগ পেলো, পুলিশ কোথায় ছিল?

শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দলের ওপর হামলার কারণে পাকিস্তান যদি ক্রিকেটে নিষিদ্ধ থাকে, তাহলে নিউজিল্যান্ড থাকবে না কেন? এইসব যৌক্তিক প্রশ্নে নিউজিল্যান্ডকে তুলোধুনো করা হতো। কিন্তু হয়নি। হয়নি কারণ নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আর্ডার্ন। তিনি এ ঘটনায় যেভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, তাতে এত্তগুলো যৌক্তিক প্রশ্নও কারো মুখে আসেনি। মাত্র এক সপ্তাহে তিনি সত্যি সত্যি নিউজিল্যান্ডকে বদলে দিয়েছেন। এত ভালো কোনো দেশ হয় না, এত ভালো মানুষ হয় না, এমন অসাধারণ প্রধানমন্ত্রী হয় না।

হুমায়ুন কবিরের একটা কবিতার বই আছে 'কুসুমিত ইস্পাত'। জাসিন্ডা যেন সেই কুসুমিত ইস্পাতের উদাহরণ। অস্ত্র আইন সংশোধনের ব্যাপারে, সন্ত্রাসীর বিচারের ব্যাপারে তিনি ইস্পাতের মত দৃঢ়। আবার শঙ্কিত মুসলমানদের পাশে তিনি কুসুমের মত কোমল। সাধারণত হামলাকারী মুসলমান হলে পশ্চিমা বিশ্ব তাকে তাৎক্ষণিতভাবে 'সন্ত্রাসী বা জঙ্গী' হিসেবে চিহ্নিত করে। তারা যেন অপেক্ষায় থাকে কখন একজন মুসলমান সন্ত্রাসীর নাম আসবে, আর কখন ইসলামকে গালাগাল করা যাবে। কিন্তু সন্ত্রাসী অমুসলিম হলেই তাদের মুখে কুলুপ।

নানান ডিপ্লোম্যাটিক উত্তর- বিচ্ছিন্ন ঘটনা, মানসিক বিকারগ্রস্থ, সন্ত্রাসের সাথে ধর্মকে মেলানো ঠিক না, তদন্ত ছাড়া কিছু বলা উচিত না, মুসলমানরা হামলা চালায় বলেই বাধ্য হয়েই জবাব দিয়েছে। অমুসলিম সন্ত্রাসীকে বাঁচাতে হাজারো ঢাল তৈরি।

অথচ গতকয়েক বছরে অমুসলিম শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীরাই রক্ত ঝরিয়েছে বেশি। জাসিন্ডা আর্ডার্ন কিন্তু অন্য অনেকের মত ডিপ্লোম্যাসির থার ধারেননি। তিনি প্রথম সুযোগেই ক্রাইস্টচার্চে হামলাকারীকে সন্ত্রাসী বলে দিয়েছেন এবং সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন, নিউজিল্যান্ডে কোনো সন্ত্রাসীর ঠাঁই নেই।

হামলার পরের এক সপ্তাহে জাসিন্ডা যা যা করেছেন; সেগুলোকে ভন্ডামী, লোক দেখানো, রাজনৈতিক কৌশল, স্ট্যান্টবাজি ইত্যাদি বলা যেতো। অন্য অনেক দেশে বা অন্য কেউ হলে তাই বলা হতো। কিন্তু জাসিন্ডার ক্ষেত্রে কেউ সেটা বলছে না। কারণ তাকে দেখলে, তার কথা শুনলে মনে হয় তিনি যা বলছেন তা অন্তর থেকে বলছে, যা করছেন, তা হৃদয়ের টানে করছেন। সঙ্কটে আসলে মানুষকে চেনা যায়।

ক্রাইস্টচার্চ হামলায় নিউজিল্যান্ড কোণঠাসা হতে পারতো, জাসিন্ডার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে যেতে পারতো। যেমন এক রোহিঙ্গা সঙ্কট অং সান সু চির আকাশ ছোঁয়া ভাবমূর্তিকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। আর ক্রাইস্টচার্চ সঙ্কট জাসিন্ডাকে আকাশে তুলে দিয়েছে। সঙ্কট থেকেই উঠে এসেছেন অনন্য জাসিন্ডা। কোনো কোনো নেতা আছেন, ঐক্য খোঁজেন। আর জাসিন্ডারা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেন।

জাসিন্ডা হামলার পর মুসলমানদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাদের জড়িয়ে ধরেছেন ভালোবেসে। মুসলমানদের সম্মান জানাতে তাদের কাছে গেছেন মাথা ডেকে, তাদের আশ্বস্ত করেছেন। সংসদে তিনি ভাষণ শুরু করেছেন, আসসালাসুমুআলাইকুম বলে। তিনি বলেননি, আমি তোমাদের পাশে আছি। তিনি বলেছেন, তোমরাই আমরা।

মুসলমানদের হৃদয় জয় করতে তিনি অনেক কথা বলেননি। অল্প কথায় বলে দিয়েছেন সব কথা। হামলার পরের শুক্রবার ক্রাইস্টচার্চের আল নূর মসজিদে নামাজের আগে তিনি কয়েক লাইন মাত্র বলেছেন, ‘তোমাদের সঙ্গে আজ পুরো নিউজিল্যান্ড কাঁদছে। আমরা সবাই আজ এক।’ মহানবীর একটি হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, ‘আমরা একটি দেহের মতো, যখন শরীরের কোনও অংশে আঘাত লাগে তখন পুরো শরীরেই ব্যথা অনুভূত হয়।’

প্রধানমন্ত্রীর এই মানবিকতার ডাকে সাড়া দিয়েছে নিউজিল্যান্ডবাসী। হামলার পরের শুক্রবারে আল নূর মসজিদে জুমার নামাজ সরাসরি সস্প্রচার করেছে। মুসলমানদের পাশাপাশি সেখানে জড়ো হয়েছিলেন কয়েক হাজার সাধারণ মানুষ। তারা মানববন্ধন গড়ে মুসলমানদের পাহারা দিয়েছেন।

জাসিন্ডা একজন খ্রিস্টান, আসলে অবিশ্বাসী, ধর্মে কর্মে মন নেই। সমকামীদের পক্ষে লড়াই করেন। বিয়ে না করেই মা হয়েছেন। বাংলাদেশে হলে এতদিন তার ফাঁসির দাবিতে মিছিল হতো। সেই তিনিই আজ বিশ্ব মুসলমানদের নয়নের মণি। তবে আমার ধারণা নিছক মুসলমান বিবেচনায় তিনি তাদের পাশে দাঁড়াননি। জাসিন্ডা আসলে ধর্ম-বর্ণ-জাতির ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিভাবে নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়াতে হয়, সংখ্যালঘুদের নিশ্চিন্তি দিতে হয় জাসিন্ডা তার উদাহরণ হয়ে থাকবেন।

নিউইয়র্ক টাইমস আফসোস করে লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যদি জাসিন্ডার মত কেউ হতেন। কিভাবে ন্যায্যতার পক্ষে, সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে হয়, কিভাবে ভিন্নমতকে ধারণ করতে হয়, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়; জাসিন্ডা তা দেখিয়ে দিয়েছেন।

তিনি শুধু বিশ্ব মুসলমানদের নয়, জয় করেছেন গোটা বিশ্বের মানবতাবাদী মানুষের হৃদয়। ধর্মীয় জঙ্গীবাদ, শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের উত্থানের এই সময়ে জাসিন্ডা গোটা বিশ্বের আলোকবর্তিকা হতে পারেন। সবাই যদি তার মত হতে পারেন, তাহলে শান্তি আসবে; শুধু নিউজিল্যান্ড নয়, গোটা বিশ্বে।

প্রিয় জাসিন্ডা আর্ডার্ন, আমরা তোমায় ভালোবাসি।

এইচআর/এমকেএইচ

জাসিন্ডা একজন খ্রিস্টান, আসলে অবিশ্বাসী, ধর্মে কর্মে মন নেই। সমকামীদের পক্ষে লড়াই করেন। বিয়ে না করেই মা হয়েছেন। বাংলাদেশে হলে এতদিন তার ফাঁসির দাবিতে মিছিল হতো। সেই তিনিই আজ বিশ্ব মুসলমানদের নয়নের মণি।

আপনার মতামত লিখুন :