খালেদা জিয়াকে কেউ মনে রাখেনি

প্রভাষ আমিন
প্রভাষ আমিন প্রভাষ আমিন , হেড অব এটিএননিউজ
প্রকাশিত: ১২:১১ পিএম, ২২ এপ্রিল ২০১৯

বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারপারসন। এই পদে তিনি আছেন সেই ১৯৮২ সাল থেকে। তিনি বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি, সাবেক প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক, সাবেক সেনা প্রধান জিয়াউর রহমানের স্ত্রী।

সারাজীবনই তিনি যাপন করেছেন বিলাসী জীবন। কিন্তু গতবছরের ৮ ফেব্রুয়ারি সেই জীবনে ছেদ পড়ে। দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হয়ে তিনি কারাগারে আছেন প্রায় সাড়ে ১৪ মাস। বর্তমানে তিনি চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে আছেন বটে, তবে তার কারাবাসের বেশির ভাগ সময় কেটেছে নাজিমউদ্দিন রোডের সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগারে।

নজিরবিহীনভাবে তার সাথে একজন পরিচারিকা দেয়া হয়েছে। তবে নাজিমউদ্দিন রোডের সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগারে তিনিই একমাত্র বন্দী ছিলেন। বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস এই প্রথম নয়। ওয়ান ইলাভেনের সময় প্রথমে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পরে বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে তাদের দুজনকে তখন রাখা হয়েছিল সংসদ ভবন এলাকার দুটি ভবনে। ভবন দুটিকে বিশেষ কারাগার ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। দুর্নীতির দুটি মামলায় ১৭ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে বেগম খালেদা জিয়ার। একটি মামলায় নিম্ন আদালতে ৫ বছরের কারাদণ্ড হলেও আপিলে সাজা বেড়ে ১০ বছর হয়ে যায়। এ দুটি ছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি মামলায় বিচার চলছে তার।

বিএনপি দাবি করছে, বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা ও সাজা রাজনৈতিক। কিন্তু সরকারি দল বলছে, এর সাথে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। এটা স্পষ্ট দুর্নীতির মামলা। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে নিম্ন আদালত রায় ঘোষণা করেছে। এখানে সরকারের কোনো হাত নেই।

যে যাই বলুক, বেগম খালেদা জিয়া প্রায় ১৫ মাস ধরে কারাগারে আছেন, এটাই বাস্তবতা। নানান রোগব্যাধিতে আক্রান্ত একজন নারীর কারাগারে থাকা অবশ্যই কষ্টকর। আবার তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির দায়ে কারাগারে আছেন, এটাও লজ্জাজনক।

এখন ৭৪ বছর বয়সী বেগম খালেদা জিয়ার ভবিষ্যৎ কী? তাকে কি ১৭ বছরই কারাগারে থাকতে হবে? এটা ঠিক আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকতে বেগম জিয়ার জন্য খুব বেশি সুখবর নেই। খালেদা জিয়ার মুক্তি পাওয়ার চারটি উপায় আছে। এক নাম্বার উপায়, আইনী প্রক্রিয়ায় জামিনে মুক্তি। তবে বেগম জিয়ার আইনজীবীরা বুঝে গেছেন, এই রাস্তায় হবে না। জামিনের সম্ভাবনা তো নেইই, বরং উচ্চ আদালতে একটি মামলার সাজা দ্বিগুণ হয়েছে। পরের দুটি প্রক্রিয়া সরকারের ইচ্ছাধীন। চাইলে বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতির কাছে মার্জনা ভিক্ষা চাইতে পারেন।

রাজনৈতিক সমঝোতা হলে, রাষ্ট্রপতি তাকে মার্জনা করতেও পারেন। কিন্তু সেক্ষেত্রে বেগম জিয়াকে অপরাধ স্বীকার করে নিতে হবে। এরপরের প্রক্রিয়া হলো, প্যারোল। এখন যেটা নিয়ে রাজনীতিতে তুলকালাম। কিন্তু প্যারোল পেতে হলে বেগম জিয়াকে আবেদন করতে হবে। সরকার সন্তুষ্ট হলে বেগম জিয়াকে প্যারোল দিতে পারে। তবে প্যারোল পেতে হলে তাকে সরকারের লিখিত-অলিখিত কিছু শর্ত মানতে হবে।

এই দুটি প্রক্রিয়ার জন্যই সরকারের সাথে আপস করতে হবে। 'আপসহীন' নেত্রী সেটা করবেন কিনা, তা নিয়েই এখন সকল কৌতূহল। বিএনপি নেতারা মুখে বলছেন, কোনো আপস বা সমঝোতার সুযোগ নেই। কিন্তু আবার এটাও সবাই জানেন, ভেতরে ভেতরে একটা সমঝোতার চেষ্টা চলছে। কী হবে, সেটা জানার জন্য আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে।

বেগম জিয়ার মুক্তির সর্বশেষ উপায় হলো, আন্দোলন। বিএনপি যদি রাজপথে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তুলে বেগম জিয়াকে মুক্তি দিতে সরকারকে বাধ্য করতে পারতো। দেশে-বিদেশে আন্দোলন করে মুক্তির এমন অনেক উদাহরণ আছে।

প্রথম তিনটি উপায়ের কিছু না কিছু সম্ভাবনা থাকলেও সর্বশেষ উপায়টির যে বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই সেটা সম্ভবত বেগম খালেদা জিয়াও বুঝে গেছেন। গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি রায়ের দিন আদালতে যাওয়ার সময় বেগম জিয়া রাজপথে লাখো মানুষ রেখে যেতে চেয়েছিলেন। যাতে সরকারকে চাপে রাখা যায়। বিএনপি নেতারা ভেবেছিলেন, খালেদা জিয়াকে কারাদণ্ড দিলে রাজপথে মানুষের ঢল নামবে। সেই চাপে দুয়েকদিনের মধ্যে খালেদা জিয়ার জামিন হয়ে যাবে। কিন্তু প্রথমটি ঘটেনি, তাই দ্বিতীয়টিও ঘটেনি।

খালেদা জিয়া আদালতে যাওয়ার সময় কিছু নেতাকর্মী মাঠে নামলেও তিনি কারাগারে ঢুকে যাওয়ার পর নেতাকর্মীরাও ঘরে ঢুকে গেছেন। সেই যে ঘরে ঢুকেছেন ১৫ মাসে আর বের হননি। এখন বিএনপির রাজনীতি মানে নয়াপল্টনে রিজভীর নিত্যদিনের হুঙ্কার আর প্রেসক্লাবে নেতাদের কণ্ঠবিপ্লব।

৩৭ বছর ধরে দলের নেতৃত্ব দিলেন যিনি, কারাবাসের পর তাকে যেন সবাই ভুলেই গেছে। বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে, কিন্তু কারো যেন কিছু যায় আসে না। ৩৭ বছর ধরে খালেদা জিয়া কাদের নেতৃত্ব দিলেন, তার গড়া কর্মীরা কোথায়?

খালেদা জিয়ার মূল ব্যর্থতাটা সঠিকভাবে তুলে ধরেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি বলেছেন, ‘খালেদা জিয়ার একটা ব্যর্থতা আছে, যা আমি আগেও একদিন তাকে বলেছিলাম। আজকেও বলতে চাই। তা হলো, তিনি তার চারপাশে নির্ভীক, সৎ, সাহসী লোক তৈরি করতে পারেননি। এ কারণে আমরা সংকট মোকাবিলা করতে ভয় পাচ্ছি।'

আন্দোলনের কথা বললেই বিএনপির নেতাকর্মীরা বলেন, এ সরকার স্বৈরাচারী, রাস্তায়ই নামতে দেয় না। খুব সত্যি অভিযোগ। কিন্তু ভাই কবে কোন সরকার বিরোধী দলের আন্দোলনের জন্য মাঠ ছেড়ে দিয়েছে। এখন তো রাস্তায় নামলে টিয়ার গ্যাস মারে বা লাঠিচার্জ করে। এরশাদ আমলে তো টার্গেট করে গুলি করতো। যত গুলি করতো, আন্দোলন তত চাঙা হতো।

এরশাদ বিরোধী আন্দোলন থেকেই তো একজন গৃহবধূ খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক নেত্রী হয়ে ওঠা, আপসহীন নেত্রীর পরিচিতি। ৯০ সালে ১০ অক্টোবর ছাত্রদল নেতা জেহাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়েই বেজে উঠেছিল স্বৈরাচারী এরশাদের বিদায় ঘণ্টা। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছিল ছাত্রদলের আধিপত্য। আজ কোথায় ছাত্রদলের সেই বীরপুরুষেরা।

একটু রঙিন পানি মারলেই সবাই ছত্রভঙ্গ। এত ভঙ্গুর আন্দোলন দিয়ে তো খালেদা জিয়া কেন কাউকেই মুক্ত করা সম্ভব নয়। আজ যেমন আওয়ামী লীগ যেমন বিএনপির ওপর অত্যাচার নির্যাতন চালাচ্ছে। বিএনপিও তো ক্ষমতায় থাকতে একই কাজ করেছে। আওয়ামী লীগকে বঙ্গবন্ধু এভিনিউর বাইরে যেতে দেয়নি। কিন্তু আওয়ামী লীগ মাটি কামড়ে পড়ে থেকে আন্দোলন করেছে।

মোহাম্মদ নাসিম, মতিয়া চৌধুরী, সাবের হোসেন চৌধুরী, সোহেল তাজরা নির্যাতিত হয়োছেন, কিন্তু মাঠ ছাড়েননি। কিভাবে বিরোধী দলকে দমন করতে হয়, আওয়ামী লীগ সেটা বিএনপির কাছ থেকে ভালো করেই শিখেছে। কিন্তু কিভাবে আন্দোলন করতে হয়, বিএনপি সেটা আওয়ামী লীগের কাছ থেকে শিখতে পারেনি।

অপরাধ যাই হোক, সারাজীবন অভিজাত জীবনযাপন করা বেগম খালেদা জিয়ার নাজিমউদ্দিন রোডের কারাগারে থাকার বিষয়টি আমার ভালো লাগেনি। কিন্তু এখন ভাবছি, এটা আসলে তার নিয়তি। ৩৭ বছর ধরে তিনি ভুল দলের পেছনে সময় দিয়েছেন, ভুল নেতাকর্মী তৈরি করেছেন। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সাহসী সৈনিকরা আজ প্রতিবাদ করতে ভুলে গেছে যেন। সবাই ভয়ে অস্থির।

সাহসী নেতৃত্বই পারতো বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে। কিন্তু বিএনপি নেতাদের কারো মুখেই সেই সাহসের আভা দেখিনি। আর সেটা নেই বলেই 'আপসহীন নেত্রী'র মুক্তির বিষয়টি আজ সরকারের অনুকম্পার ওপর নির্ভর করছে। আলোচনা হচ্ছে প্যারোল নিয়ে।

আন্দোলন করার সক্ষমতা হারিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীরা আজ দৈব কিছুর আশায় বসে আছেন। ভুলে গেছেন তাদের নেত্রীকেও। খালেদা জিয়া প্রায় ১৫ মাস কারাগারে। কিন্তু সবাই যেন তাকে ভুলেই গেছেন। মাঝে মধ্যে পরিবারের সদস্য, সিনিয়র নেতারা দেখা করতে যান বটে। কিন্তু বিএনপির কর্মীরা তাকে মনে রাখেনি। এই ১৫ মাসে একজন কর্মী কারাগারের সামনে গিয়ে খালেদা জিয়ার জন্য এক ফোটা চোখের জল ফেলেনি। সবার সবকিছু চলছে স্বাভাবিকভাবে। বেগম খালেদা জিয়াকে কেউ মনে রাখেনি।

এইচআর/এমকেএইচ

আন্দোলনের কথা বললেই বিএনপির নেতাকর্মীরা বলেন, এ সরকার স্বৈরাচারী, রাস্তায়ই নামতে দেয় না। খুব সত্যি অভিযোগ। কিন্তু ভাই কবে কোন সরকার বিরোধী দলের আন্দোলনের জন্য মাঠ ছেড়ে দিয়েছে। এখন তো রাস্তায় নামলে টিয়ার গ্যাস মারে বা লাঠিচার্জ করে। এরশাদ আমলে তো টার্গেট করে গুলি করতো। যত গুলি করতো, আন্দোলন তত চাঙা হতো।

আপনার মতামত লিখুন :