বাঙালির কাছে বিশ্বকাপের অর্থ পাল্টে গেছে

অঘোর মন্ডল
অঘোর মন্ডল অঘোর মন্ডল , স্পোর্টস এডিটর, দীপ্ত টিভি
প্রকাশিত: ১০:০১ এএম, ২১ এপ্রিল ২০১৯

বিশ্বকাপ শব্দটা আক্ষরিক অর্থে বাঙালির হয়ে দাঁড়ায় গত শতাব্দির শেষ দিকে। এবং সেটা ক্রিকেটের সৌজন্যে। কারণ, তার আগ পর্যন্ত বাঙালির মনোজগতে বিশ্বকাপ মানে ছিল ফুটবল নিয়ে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড-ইতালি-জার্মানির তারকা, মহাতারকাদের বিশ্বমঞ্চে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই দেখা। কিংবা ক্রিকেট বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান লড়াই বা ক্যারিবীয়দের শিল্পীত আগ্রাসনের রেডিওতে বর্ণনা শোনা বা পরবতীতে টেলিভিশনে দেখা। তাও সীমিত ছিল নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়া কিছু মানুষের মধ্যে।

কিন্তু গত শতাব্দির শেষ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ যখন প্রথম খেলার সুযোগ পেলো, একই সংগে স্যাটেলাইট বিপ্লব ঘটলো তখন ধীরে ধীরে বাঙালির কাছে বিশ্বকাপের অর্থও পাল্টাতে থাকে। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক পালা বদলের সাথে ক্রিকেট ঘিরে তাদের মনোভাবও বদলাতে থাকে। তার আগ পর্যন্ত এদেশে ক্রিকেট ছিল নিছক কিছু মানুষের বিনোদন। আমজনতার কাছে ক্রিকেট ছিল রাজারাজড়ারের খেলা। খেলাটা সাধারণ মানুষের জন্য নয়। এমন একটা ধারণা নিয়ে চলতে থাকে এদেশের ক্রীড়া সংস্কৃতি।

কিন্তু বিংশ শতাব্দির শেষ বছরে সব কিছু পাল্টে গেল। ফুটবল প্রিয় বাঙালি দেশজ ফুটবল থেকে মুখ ফেরাতে শুরু করলো। ধারণা হলো ফুটবল বাঙালির খেলা নয়। হলে ক্রিকেটে কিছু হতে পারে। এবং সত্যি কথা হচ্ছে ধীরে ধীরে সেটা হতেও শুরু করেছে। কিঞ্চিত হয়েছেও।

গত বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ইংল্যান্ডেকে ছিটকে দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল খেললো! এখনতো বাঙালি বিশ্বজয়ের স্বপ্নও দেখে। ক্রিকেট বাংলাদেশের অনেক যুবকের স্বপ্নের নাম। অনেকের পেশা। তা হলে বিশ্বকাপ নিয়ে উন্মাদনা হবে না কেন? দল নিয়েই বা উত্তেজনা-উন্মাদনা বুদ বুদ করবে না কেন এদেশের মানুষের মনোজগতে!

বিশ্বকাপের আসরে রবীন্দ্রনাথ এসেও কড়া নাড়েন। বিশ্বমঞ্চে বাজে রবি ঠাকুরের লেখা বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত, ' আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি।....।' রবীন্দ্রনাথ যে অশরীরীভাবে হাজির হচ্ছেন ম্যাচের আগে সেখানে খেলার ইচ্ছা বাংলাদেশের কোন ক্রিকেটারের জাগবে না। কে হতে চান না এদেশের ষোল কোটি মানুষের স্বপ্নের ধারক হয়ে বিশ্বকাপ স্কোয়াডের সদস্য?

কিন্তু সবাই তো জায়গা পাবেন না। পাননি। যারা পেয়েছেন তারা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করেই ইংল্যান্ডগামী বিমানে উঠবেন। যারা সুযোগ পাননি তারা হতাশ। তাদের নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা সবই হচ্ছে। আরো কিছু দিন চলবে। যার অর্থ বাংলাদেশ ক্রিকেটের অনেক দীনতা কাটতে শুরু করেছে। দলে একটা জায়গার জন্য একাধিক যোগ্য ক্রিকেটার লড়াই করেন।

যা বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্বাস্থ্যকর চেহারার বহিঃপ্রকাশ। পেসার তাসকিনের চোখের জল অনেকের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। অনেককে ভারাক্রান্ত করেছে। ইমরুল কায়েসের হতাশা অনুভব করতে পারেন এদেশের অনেক ক্রিকেট প্রেমিক। কিন্তু তারাই বা কী করতে পারবেন। দলতো গড়তে হবে পনের জনকে নিয়ে।

নির্বাচকরা সেটাই করেছেন। তাঁদের দৃষ্টিতে সেরা দলটাই তারা বেছে নিয়েছেন। এর সাথে শুধু ফুট নোট হিসেবে যোগ হতে পারে একটা বাক্য। কোন দলই সবার কাছে গ্রহণযোগ্য এবং বির্তকহীন নয়। বাংলাদেশ দল নিয়ে কাটাছেঁড়া করলে হয়তো আপনিও দু'একটা ফাঁকফোকর পেয়ে যাবেন। কিন্তু সেটা ঢেকে দেয়ার সামর্থ্য তাদের আছে, যারা দলে সুযোগ পেয়েছেন। কারণ, খেলাটা ক্রিকেট। দলগত উদ্যোগটা বড্ড জরুরি।

অনেক সময় ব্যক্তিগতভাবে একজন হয়তো একটা দুটো ম্যাচ বের করে আনতে পারেন। কিন্তু শিরোপার স্বপ্ন সফল করতে হলে দলগত প্রচেষ্টা দরকার। বাঙালির ক্রীড়া সংস্কৃতিতে দলগতভাবে প্রচেষ্টার নজির খুব কম। কিন্তু বিশ্বকাপ ঘিরে এদেশের ক্রীড়া বুদ্ধিজীবী থেকে সাধারণ মানুষ সবাই আবেগের জোয়ারে ভাসেন।

বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটারদের সামর্থ্য এবং যোগ্যতার প্রতি সামান্যতম অশ্রদ্ধা না দেখিয়েও বলতে হচ্ছে, এখন এরকম আবেগের স্রোতে ভাসতে ভাসতে যদি আমরা বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখি, তাহলে সেটা হবে আবেগ তাড়িত নির্বুদ্ধিতা। শেষ শব্দটা হয়তো অনেকের গাত্রদাহের কারণ হতে পারে। তারপরও বলছি, বাস্তবতা ভিন্ন। ইংল্যান্ডে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ জিতলে নিশ্চিতভাবে বিশ্ব ক্রিকেট প্রেস তার গায়ে এঁটে দেবে 'অঘটন'!

ক্রিকেটের তীর্থভূমি ইংল্যান্ড। এর আগে বার চারেক বিশ্বকাপের আয়োজক তারা। একাধিকবার ফাইনাল খেলেছে। কিন্তু বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। তাদের কাছ থেকে খেলাটা শিখে তাদের হারিয়ে অন্য অনেক দেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। বাংলাদেশ হবে না তাও গ্যারান্টি দিয়ে কেউ বলতে পারবেন না। হয়তো একদিন চ্যাম্পিয়নই হবে বাংলাদেশ। তবে এটা ঠিক ইংরেজরা এই উপমহাদেশ ক্রিকেটে ছড়িয়ে দিয়েছিল অন্য উদ্দেশে।

শুধু রাজদণ্ড দিয়ে দেশ শাসন করা যাবে না । তাদের সাথে একটু মেলামেশাও দরকার। সেই কারণেই ফুটবল, ক্রিকেটকে ছড়িয়ে দেয় তাঁরা। সেই ইংল্যান্ড থেকে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ জিতে এলে বাঙালি আনন্দে আত্মহারা হবে। উচ্ছ্বাসে ভাসবে গোটা দেশ। যার রেশ থাকবে হয়তো কয়েক বছর জুড়ে।

পত্রিকায় খেলার পাতা থেকে হারিয়ে যাবে কিছু দিনের জন্য হলেও মেসি, রোনালদো, নেইমার বন্দনা। সেখানে আরো বেশি জায়গা পাবেন মাশরাফি-সাকিব -তামিম-মুশফিক, মাহমুদউল্যাহদের নাম আর ছবি। তাছাড়া কাপের পাশাপাশি ইংল্যান্ডে বাঙালির বড় প্রাপ্তি হবে ইংরেজদের জাত্যাভিমানে বড় একটা ঘা দিতে পারা। আর অবশিষ্ট বিশ্ব বাংলাদেশকে আরেকবার চিনবে ক্রিকেট দিয়ে।

বাঙালির ক্রীড়া সংস্কৃতিতে বড় একটা বাক পরিবর্তনের সুযোগ এবারের ক্রিকেট বিশ্বকাপ। যারা গত আসরে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছে, সেই দলটা যদি এবার সেমি ফাইনালে খেলতে পারে তাতে প্রমাণ হবে পথ হারায়নি বাংলাদেশ ক্রিকেট।

লেখক : সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলাম লেখক।

এইচআর/জেআইএম

ইংল্যান্ড থেকে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ জিতে এলে বাঙালি আনন্দে আত্মহারা হবে। উচ্ছ্বাসে ভাসবে গোটা দেশ। যার রেশ থাকবে হয়তো কয়েক বছর জুড়ে।

আপনার মতামত লিখুন :