মৃত্যু এখন দুয়ারে দাঁড়িয়ে!

ডা. পলাশ বসু
ডা. পলাশ বসু ডা. পলাশ বসু , চিকিৎসক ও শিক্ষক
প্রকাশিত: ১০:০২ এএম, ০২ মে ২০১৯

এমন আশংকা এখন সত্যি হতে চলেছে। এন্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে এখন আর তা জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করতে পারছে না। আরো পরিষ্কার করে বললে যায় যে, এন্টিবায়োটিক এখন আর জীবাণুকে মারতে পারছে না।

এর অর্থ হচ্ছে, জীবানুগুলো এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে বেঁচে থাকার জন্য নিজেদের জিনগত পরিবর্তন সাধন করে ফেলেছে। ফলে, উক্ত জীবানু আগেরমতো একই রোগ সৃষ্টি করলেও প্রচলিত যে এন্টিবায়োটিক এই গঠনগত পরিবর্তনের আগে সহজেই ঐ জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করতো ; এখন আর তা করতে পারছে না। এই অবস্থায় জীবাণু পৌঁছে গেলে তাকে আমরা বলি ‘সুপারবাগ’। অর্থাৎ এই ‘সুপারবাগেই’ এখন আমরা মরতে বসেছি।

ফলে যাকে আমরা সবসময়ই সাধারণ রোগ হিসেবে মনে করে থাকি, যেমন জ্বর-জারি, সর্দি-কাশি সে সসব রোগেই এখন মানুষ মারা পড়ছে সহজেই। আমার কথা শুনে অবাক হচ্ছেন কি? এর উত্তরে বলছি, একদম অবাক হওয়ার কারণ নেই। এটাই এখন সত্যি। এটাই এখন নির্মম বাস্তবতা। আর জটিল রোগ হলে তো কথাই নেই।

দারুণ উদ্বেগজনক খবরই বটে এটা। কিন্তু আমরা মনে হয় সমাজের নানা বিষয়- যেমন রাজনীতির বিষয় নিয়ে যতটা সরব ঠিক ততটাই নীরব এই প্রাণঘাতি অবস্থা নিয়ে। অথচ এই যে রোগজীবাণু এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠলো; হয়ে উঠলো ‘সুপারবাগ’ এর জন্য দায় রয়েছে কিন্তু আমাদের সকলের।

কিভাবে আমাদের দায় রয়েছে— আসুন তারই একটু তত্ত্বতালাশ আগে করে নিই। প্রথমেই যে কারণটা সামনে আনতে চাই সেটা হচ্ছে, এন্টিবায়োটিক মুড়িমুড়কির মতো যথেচ্ছভাবে বিক্রি এবং সেবন। ধরুণ, আমাদের কারো দু’এক দিনের জ্বর। অথবা সর্দি-কাশি। অথবা একটু পেট কামড়াকামড়ি । ফলে দু’চারবার পাতলা পায়খানা হলো। আমরা তখন কী করি বলুন?

অধিকাংশ সময়ই আমরা দুমাদুম বাড়ির পাশের বা শহরে গলির মোড়ে মোড়ে গজিয়ে ওঠা ওষুধের দোকানে গিয়ে নিজেই আগে কোনো একটা এন্টিবায়োটিকের জেনে থাকা নাম অথবা ঐ ওষুধের দোকানদারের পরামর্শ মোতাবেক একটা এন্টিবায়োটিক কিনে এনে দু’চারটে ডোজ খেয়ে নিই।

তারপর রোগের লক্ষণ আপাত দৃষ্টিতে কমে গেলে ( আমরা আসলে মনে করি যে একদম ভালো হয়ে গেছি !) আমরা সেটার আর নির্দিষ্ট কোর্স শেষ করি না। এর ফলেই কিন্তু মারাত্মক ‘সুপারবাগ’ নামক ব্যাকটেরিয়ার জন্ম হচ্ছে! কারণ নির্দিষ্ট মেয়াদে এবং ডোজে এন্টিবায়োটিক না খেলে জীবাণুগুলো এই ওষুধের বিরুদ্ধে নিজেকে প্রতিরোধক করে তোলার সুযোগ পেয়ে যায়। ফলে পরবর্তী সময়ে ঐ একই সমস্যায় আগের দেয়া এন্টিবায়োটিকটা আর কাজ করে না। জীবাণুটা হয়ে উঠে তখন ভয়ংকর প্রাণঘাতী!

আর একটা কারণ হচ্ছে, এন্টিবায়োটিক হিসেবে বাজারে অনেক নিম্নমানের , ভেজাল, মেয়াদোউত্তীর্ণ (কিন্তু নতুন করে আবার প্যাক করে বাজারজাতকরণ!) ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। এটাও ‘সুপারবাগ’ তৈরিতে ভূমিকা রাখছে দারুণভাবে।

তৃতীয় এ কারণটাও ভয়াবহ। আমাদের খাবারের মাধ্যমে এরা ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে প্রোটিনজাত খাবার যেমন মাংস, মাছ এসব থেকে। কারণ এসব চাষের সময় বেহুদা এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করার ফলে এসব প্রাণী যেমন মুরগী, ছাগল, গরু, মহিষ অথবা চাষ করা মাছে জীবাণুগলো এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠছে।

এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য দুর্নীতি, মাদকের বিরুদ্ধে যেভাবে জিরো টলারেন্স দেখানো শুরু হয়েছে সেভাবেই আর একটা দিনও কালক্ষেপণ না করে আমাদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনেই এন্টিবায়োটিক তৈরি, বাজারজাতকরণ এবং বিক্রি—এর প্রতিটি ধাপে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। (২) রোগীর কাছে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ব্যতীত এন্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধে একদম নির্মোহভাবে আইনের প্রয়োগ ঘটাতে হবে। এর জন্য প্রয়োজনে আইনের সংস্কার করে এটাকে কঠোর করতে হবে। যারা এটা মানবে না তাদের ফার্মেসী বন্ধ, জেল এবং জরিমানার বিধান করতে হবে।

(৩) সব থেকে ভালো হয় যদি অতি দ্রুত ‘মডেল ফার্মেসী’কে একদম ভোক্তার দোরগোড়ায়– মানে প্রতিটি গ্রামে পৌঁছে দেয়া যায়। নিদেনপক্ষে আগামী একমাসের মধ্যে ইউনিয়ন অবধি তা চালু করার ব্যবস্থা করতে হবে। এই সব ফার্মেসীতেই শুধু এন্টিবায়োটিক বিক্রি হবে মর্মে প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে। অন্যসব ফার্মেসীতে সব অন্য ওষুধ বিক্রি হবে; শুধু এন্টিবায়োটিক ছাড়া। না হলে কী যে ভয়ংকর সময় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভবপর নয়!

গত কয়েকদিনে আমি অন্তত দুটো ঘটনার কথা জানি যেখানে ‘সুপারবাগে’র আক্রমণের কারণে ৮ বছরের একটা ছেলে মারা গেছে ২১ দিন হাসপাতালে ভর্তি থেকে। চিকিৎসকরা ছেলেটার জ্বর ভালো করতে এ সময়ে নানা এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করেছেন। কিন্তু প্রাণঘাতী এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ‘সুপারবাগ’ জীবাণুর আক্রমণের কারণে শেষ অবধি ছেলেটাকে বাঁচানো যায়নি।

আর সাড়ে ৬ মাস বয়সী একটা শিশু প্রথমে সর্দি, জ্বর পরে নিউমোনিয়া নিয়ে হাসপাতালে ভর্তির পরে দেখা গেলো একটামাত্র এন্টিবায়োটিক ছাড়া আর সবই জীবাণু প্রতিরোধী হয়ে গেছে। ছেলেটা প্রায় দেড়মাস হয়ে গেলো ২টা বিশেষায়িত হাসপাতাল ঘুরে এখন ৩ নং বিশেষায়িত হাসপাতালে এসেছে।

কী পরিমাণে যে আর্থিক এবং মানসিক ধকলের ভেতরের দিয়ে যাচ্ছে পরিবারটা তা প্রকাশ অযোগ্য! সর্বশেষ হয়ত দেখেছেন-পত্রিকায় এসেছে, যে ২০১৮ সালে বিএসএমএমইউ এর আইসিইউ তে ভর্তি হয়েছিলো ৯০০ রোগী। তার মধ্যে ৪০০ জনই মারা গেছে এই প্রাণঘাতী ‘সুপারবাগে’র কারণে-অর্থাৎ যেখানে এন্টিবায়োটিক একদমই কাজ করেনি।

এই যখন ভয়াবহতা তখন আসুন সকলে মিলে সচেতন হই এন্টিবায়োটিক এর অযাচিত ব্যবহার এবং তা বিক্রি বন্ধে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগী, সময়োপযোগী, কঠোর এবং অবশ্যই অতি দ্রুত ব্যবস্থা নিবে— সেই আশায় জোর দাবি জানাচ্ছি।

লেখক : চিকিৎসক ও শিক্ষক। সহযোগী অধ্যাপকও বিভাগীয় প্রধান, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ, এনাম মেডিকেল কলেজ।

এইচআর/জেআইএম

যে ২০১৮ সালে বিএসএমএমইউ এর আইসিইউ তে ভর্তি হয়েছিলো ৯০০ রোগী। তার মধ্যে ৪০০ জনই মারা গেছে এই প্রাণঘাতী ‘সুপারবাগে’র কারণে-অর্থাৎ যেখানে এন্টিবায়োটিক একদমই কাজ করেনি।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]