‘দুর্বৃত্তের’ পরিচয় নেই…

আমীন আল রশীদ
আমীন আল রশীদ আমীন আল রশীদ , সাংবাদিক, কলামিস্ট
প্রকাশিত: ০১:৫৬ পিএম, ২২ জুন ২০১৯

চট্টগ্রাম থেকে নিখোঁজের ১১ দিন পর সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমেদ সোহেল তাজের ভাগ্নে ইফতেখার আলম সৌরভকে (২৫) ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। সংবাদটি সৌরভ ও তার পরিবারের জন্য নিঃসন্দেহে আনন্দের। কারণ এর আগে তার মতো আরও অসংখ্য মানুষকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পরে তাদের খোঁজ মেলেনি। তাদের কতজন বেঁচে আছেন কিংবা মৃত, তা জানা নেই স্বজনদের। কিন্তু যার সন্তান হারিয়ে গেছে, যার স্বামী কিংবা ভাই— তিনি জানেন প্রিয়জন হারানোর বেদনা কত নির্মম, কত নিষ্ঠুর।

একজন মানুষ নিহত হওয়া এবং তার লাশ খুঁজে পাওয়ার চেয়ে অনেক বেশি যন্ত্রণা এই নিখোঁজ হওয়া। জীবিত অথবা মৃত অবস্থায় তার সন্ধান পাওয়ার আগ পর্যন্ত স্বজনরা প্রত্যাশায় থাকেন, তিনি ফিরে আসবেন। কিন্তু কতজন ফিরে আসেন? সৌরভ ফিরেছেন বা যারা তাকে অপহরণ করেছিল তারা ফিরিয়ে দিয়েছে। হয়তো তাদের ওপর সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চাপটা অনেক বেশি ছিল। অপহরণকারীরা হয় ভেবেছে এটা হজম করা যাবে না অথবা যে কারণে সৌরভকে তুলে নেয়া হয়েছিল, সেই কাজ সম্পন্ন হয়েছে কিংবা হয়তো তাদের দয়া হয়েছে। কিন্তু কারা তাকে ধরে নিয়ে গেলো, তাদের পরিচয় কী এবং কেন নিয়ে গেলো? আপাতত বলা হচ্ছে তারা ‘দুর্বৃত্ত’।

যতক্ষণ না আসল পরিচয় জানা যাচ্ছে ততক্ষণ সকল অপরাধীই ‘দুর্বৃত্ত’। রাস্তায় কেউ একজন ছুরিকাহত হলেও তা যেমন দুর্বৃত্তের আক্রমণ, তেমনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে কাউকে তুলে নেয়ার পরে সংশ্লিষ্টরা তা স্বীকার না করলে তারাও `দুর্বৃত্ত’। সৌরভের বেলায়ও সেই একই কথা। ২০ জুন সকালে ময়মনসিংহ পুলিশ সুপার শাহ আবিদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেছেন, সৌরভকে ‘দুর্বৃত্তরা’ আটকে রেখেছিল। তো সেই দুর্বৃত্তদের পরিচয় কী—তা তিনি জানাননি কিংবা ধরে নেয়া যায় যে এই দুর্বৃত্তদের কখনোই চিহ্নিত করা যাবে না। যখন কেউ অপহৃত হয় এবং অপহরণকারীদের পরিচয় জানা যায় না, তখন তাদের পরিচয় সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে নানা সন্দেহ তৈরি হয়। কিন্তু রাষ্ট্র বিষয়টি পরিষ্কার করে না। এই পরিষ্কার না করা এবং একধরনের ক্যামোফ্লাজ তৈরি করে রাখার মানেই হলো মানুষ যেসব বিষয়ে সন্দেহ করে, আখেরে সেটিই সঠিক।

এসব তুলে নেয়া বা অপহরণের পরে অনেক সময়ই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা গোয়েন্দা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। সৌরভকে অপহরণের পরও একই পরিবারের তরফে একই অভিযোগ করা হয়েছিল এবং সোহেল তাজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন বিষয়টি তদন্তের। খোদ একজন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তার দল ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় নিজের ভাগ্নের অপহরণ নিয়ে ফেসবুকে যে লাইভ করেছেন, তা সত্যিই বিরল এবং এই ঘটনা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন করেছেন, তাজউদ্দিন আহমদের মতো একজন জাতীয় নেতার পরিবারের একজন সদস্য যখন তার দল ক্ষমতায় থাকা অবস্থাতেই এভাবে অপহৃত হন এবং সেই অপহরণের অভিযোগের তীর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দিকে তোলা হয়, তাহলে রাষ্ট্রের অন্য মানুষ কতটা নিরাপদ?

সন্তান ফিরে পাওয়ার পর সৌরভের মা সাংবাদিকদের বেশ গর্বের সাথে বলেছেন, ‘সোহেল সব করেছে। সোহেলের কারণে আমি সন্তান ফিরে পেয়েছি।’ এখন প্রশ্ন হলো, সোহেল তাজ তো রাষ্ট্রের সব তরুণের মামা নন। অন্য যারা নিখোঁজ হয়েছেন, গুম হয়েছেন, অপহৃত হয়েছেন—তাদের ফেরাতে কে উদ্যোগ নেবেন?

কথিত দুর্বৃত্ত বা যারা প্রকৃতই অপরাধী তারা যদি কাউকে টাকার লোভে কিংবা ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে টাকা খেয়ে তুলে নিয়ে যায়, সেটির অর্থ একরকম। কিন্তু যদি জনগণের পয়সায় পরিচালিত রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা গোয়েন্দা বাহিনীর কেউ কোনো নাগরিককে এভাবে ধরে নিয়ে যায় এবং সেটি গোপন করে, তার অর্থ অন্যরকম।

বাস্তবতা হলো, মামলা থাকুক বা না থাকুক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রাষ্ট্রের যেকোনো বাহিনী যেকোনো সময় যেকোনো নাগরিককে ধরে নিয়ে যেতে পারে। এই অধিকার তাদের আইনসঙ্গত। কিন্তু কোন প্রক্রিয়ায় ধরে নেয়া যাবে সে বিষয়ে উচ্চ আদালতের অনেকগুলো নির্দেশনা আছে, যার একটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে তার পরিবারকে বিষয়টি জানানো এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে তোলা। অন্তত এই একটি বিধান মানলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাউকে ধরে নিয়ে সেটি গোপন করতে পারে না।

সৌরভের ক্ষেত্রে কী ঘটেছিল? তার বাবা সৈয়দ ইদ্রিস আলম চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশ থানায় গত ১০ জুন একটি অভিযোগ দায়ের করেন যেখানে উল্লেখ করা হয়, ঈদের ছুটিতে সৌরভ চট্টগ্রামের বাসায় বেড়াতে যান। গত ৯ জুন পাঁচলাইশ আফমি প্লাজার সামনে থেকে দুজন লোক তাকে ধরে নিয়ে যায়। সৌরভ ঢাকার ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন করে একটি বেসরকারি সংস্থার পক্ষে ডকুমেন্টারি তৈরির কাজ করতেন। তাকে অপহরণের পেছনে এই ডকুমেন্টারি তৈরির কোনো যোগসাজস আছে কি না— এই প্রশ্নের জবাব কি কখনো জানা যাবে? সৌরভকে আসলেই কারা ধরে নিয়ে গিয়েছিল তা কি কোনোদিন জানা যাবে? অপহরণের পরে ১১ দিনে সৌরভের সাথে কী আচরণ করা হয়েছিল, সে কথা কি সৌরভ কোনোদিন বিস্তারিত বলবেন? ধারণা করা যায় তিনি কিছুই বলবেন না। কারণ অতীতে যাদেরকে এভাবে ধরে নেয়া হয়েছিল ফিরে এসে তারা সবাই চুপ থেকেছেন। অর্থাৎ তারা চুপ থাকবেন, এই শর্তেই তাদের জীবিত ফেরত দেয়া হয়।

শোনা যাচ্ছে সৌরভকে ধরে নেয়ার পেছনে রয়েছে একটি প্রেমের সম্পর্ক তথা পারিবারিক ইগো ও জটিলতা। সেক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও গুরুতর যে, এরকম একটি পারিবারিক বিষয়েও রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো নাগরিককে ধরে নিয়ে যাবে এবং গুম করে ফেলবে? দ্বিতীয় প্রশ্ন, আসলেই সৌরভের পরিবারের অভিযোগ অনুসারে তাকে কি সত্যি সত্যিই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ নিয়ে গিয়েছিল নাকি আসলেই ‘দুর্বৃত্ত’ তথা সন্ত্রাসীরা তার প্রতিপক্ষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাকে ধরে নিয়েছিল? যদি তাই হয়, তাহলে তো সেই ‘দুর্বৃত্ত’ খুঁজে বের করা পুলিশের জন্য কঠিন কিছু নয়। কিন্তু শেষমেষ আদৌ কি এই ‘দুর্বৃত্ত’ চিহ্নিত হবে?

স্মরণ করা যেতে পারে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মুবাশ্বার হাসানও এরকম অপহৃত হয়েছিলেন এবং ফিরে আসার পরে কোনো কথা বলেননি। তাদের পরিবারও এ বিষয়ে চুপ ছিল। কারণ প্রিয়জন ফিরে এসেছে তাতেই তারা খুশি। নতুন করে কোনো ঝামেলায় জড়াতে কে চায়? ফলে কারা তাকে নিয়ে গিয়েছিল, কেন নিয়েছিল এবং কেনই বা ফিরিয়ে দিলো, সেই প্রশ্নও করতে চায় না।

এভাবে নিখোঁজ হওয়ার পরে যারা ফিরে আসেন, গল্পগুলো অনেকটা ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের মতো। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লক্ষ্য করে দুর্বৃত্তরা গুলি ছুঁড়েছে এবং পাল্টা গুলিতে তিনি বা তারা নিহত হয়েছেন। একইভাবে নিখোঁজ বা গুমের পরে ফিরে আসা মানুষেরাও যা বলেন, তার মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য থাকে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা কিছুই বলেন না। তথ্যপ্রযুক্তিবিদ তানভীর হাসান জোহা কিংবা পরিবেশ আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিক নিখোঁজের পরে ফিরে আসার পরে তারাও এ নিয়ে সাংবাদিকদের সামনে কোনও কথা বলেননি। বিষয়টি নিয়ে কোনও আইনি পদক্ষেপেও তারা যাননি বা যেতে চাননি।

একইভাবে নিখোঁজ হয়েছিলেন সাংবাদিক উৎপল দাস। ফিরে আসার পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, তাকে ধরে নেয়ার পরে জঙ্গলে একটা টিনের ঘরের ভেতরে রাখা হয়েছিল। তার কাছে মুক্তিপণ চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরিবার কোনও মুক্তিপণ না দিলেও অপহরণকারীরা তাকে জীবিত অবস্থায় নারায়ণগঞ্জের ভুলতায় রাস্তার পাশে ফেলে দিয়েছে। তার মানে এখানে মুক্তিপণ কোনও বিষয় ছিল না। তাছাড়া উৎপল বা তার পরিবারের যে আর্থিক সক্ষমতা, তাতে তাকে টাকার জন্য অপহরণ করার কোনও যুক্তি নেই। পেশাদার অপহরণকারীরা যদি কাউকে টাকার জন্য ধরে নিয়ে যায়, তার আগে তারা তার অর্থনৈতিক সক্ষমতার ব্যাপারে বিস্তারিত খোঁজ-খবর নেয়। সুতরাং তাকে কারা ধরে নিয়ে গিয়েছিল, তা অনুমান করা কঠিন নয়।

মুবাশ্বারও ফিরে আসার পরে বলেছেন যে, তার কাছে টাকা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু মুবাশ্বার শেষ অবধি কোনো মুক্তিপণ ছাড়াই ফিরে এসেছেন। অর্থাৎ তাকেও ধরে নেয়ার পেছনে টাকা বা মুক্তিপণ কোনও বিষয় ছিল না। এখানেই রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা। তা হলো, একজন নাগরিক, তিনি হন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, হন সাংবাদিক কিংবা ব্যবসায়ী–যখন কেউ তাকে ধরে নিয়ে যায় এবং কিছুদিন পরে জীবিত ফিরে আসেন, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব অপহরণকারীদের খুঁজে বের করা। যদি না পারে তাহলে সেটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। আর যদি রাষ্ট্র কোনোকিছু গোপন করে তাহলে সেটি নাগরিকের মানবাধিকার ক্ষুণ্ণ করে। কেননা, প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।

ধরা যাক, যে লোকগুলো নিখোঁজ বা গুম হয়েছেন, তাদের কেউ কেউ অপরাধে যুক্ত। তাহলে প্রচলিত আইনেই তাকে বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব। যদি কোনও ব্যক্তি সরকার বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকেন, যদি কারো ফেসবুক স্ট্যাটাস বা কর্মকাণ্ডে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সরকার বিব্রত হয়, তাহলে তাকে সতর্ক করা কিংবা তাকে শাস্তি দেয়ার আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে।

রাষ্ট্রের যেকোনও নাগরিকের বিরুদ্ধেই মামলা হতে পারে এবং তার দল ও মত যাই হোক, তার বিচারের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এমনকি তাকে জিজ্ঞাসাবাদেরও আইন রয়েছে। কিন্তু তারপরও কিছু মানুষের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এবং ফিরে আসার পরে যে রহস্যের জন্ম হয়, তা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর এবং এভাবেই একটি সমাজে ও রাষ্ট্রে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হতে থাকে।

সৌরভের এই ঘটনায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি হলো, সোহেল তাজ ফেসবুক লাইভে বারবার তার ভাগ্নেকে সুস্থ অবস্থায় ফেরত পাওয়ার দাবি জানিয়েছেন। এমনকি সৌরভ ফিরে আসার পরও বলেছেন যে, তারা সবাই খুশি এবং কৃতজ্ঞ। কিন্তু সৌরভের পরিবার এমনকি সোহেল তাজ নিজেও বলেননি যে যারা সৌরভকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল তিনি তাদের বিচার চান বা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চান। তার মানে কি তারাও জানেন যে এই ইস্যুতে বিচার চেয়ে বা তদন্তের দাবি করে কোনো লাভ নেই? সৌরভের আগেও যারা অপহরণের পরে ফিরে এসেছেন, তারাও কিন্তু বিচার চাননি। বরং সবাই সুস্থভাবে ফিরে এসেছেন তাতেই কৃতজ্ঞ। এই কৃতজ্ঞতাটা কার প্রতি আর এই বিচার না চাওয়াটা কার প্রতি অনাস্থা কিংবা কিসের অভিমান?

এইচআর/জেআইএম

সন্তান ফিরে পাওয়ার পর সৌরভের মা সাংবাদিকদের বেশ গর্বের সাথে বলেছেন, ‘সোহেল সব করেছে। সোহেলের কারণে আমি সন্তান ফিরে পেয়েছি।’ এখন প্রশ্ন হলো, সোহেল তাজ তো রাষ্ট্রের সব তরুণের মামা নন। অন্য যারা নিখোঁজ হয়েছেন, গুম হয়েছেন, অপহৃত হয়েছেন—তাদের ফেরাতে কে উদ্যোগ নেবেন?