বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশ ও বিশ্ব বাস্তবতা

এবিএম আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার
এবিএম আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার এবিএম আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার , ব্যারিস্টার, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট
প্রকাশিত: ১২:৫৭ পিএম, ১৪ আগস্ট ২০১৯

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে কোনো কথার মালায় গাঁথা বা সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব নয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেক কবিতা, প্রবন্ধ ও সঙ্গীত রচিত হয়েছে, অঙ্কিত হয়েছে অনেক ছবি-প্রতিকৃতি। তবুও অসামপ্ত রয়ে গেছে তাকে নিয়ে সৃজন সাধনা। বঙ্গ, বাংলা ও বাঙালির সমষ্টিগত রূপ বঙ্গবন্ধু। তবুও সব কিছু ছাপিয়ে, ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রম করে তিনি হয়েছিলেন বিশ্বনেতা। তাই কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ত্রো বঙ্গবন্ধুকে পরিমাপের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, 'I haven't seen Himalayas, but I have seen Sheikh Mujib. '

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে বোঝানোর চেষ্টা করা হয় যে, শুধু একটি পরিবারকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সরানো হয়েছে। কারণ যারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন তারা সবাই ছিলেন পরস্পর আত্মীয়। কিন্তু পরবর্তী প্রেক্ষাপট বিশেষ করে ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর পরিষ্কার হয় যে, স্বাধীন বাংলাদেশের স্তম্ভকেই শুধু হত্যা করা হয়নি ধ্বংস করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা। স্বাধীন বাংলা পরিচালিত হতে থাকে পূর্ব পাকিস্তানের আদলে। ‘জয় বাংলা’র বদলে পাকিস্তান জিন্দাবাদের আদলে স্লোগান হয়, ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’, ‘বাংলাদেশ বেতার’র বদলে রেডিও পাকিস্তানের আদলে ‘রেডিও বাংলাদেশ’, ‘বলাকা’র বদলে পাকিস্তান এয়ারলাইন্সের আদলে ‘বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স’ করা হয়! এরই ধারাবাহিকতায় প্রথমেই তারা ইতিহাস বিকৃতি শুরু করে, তারা অপচেষ্টা চালায় বঙ্গবন্ধুর পবিত্র চরিত্রে কালিমা লেপনের। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, ইংরেজ শাসকরা নবাব সিরাজউদ্দৌলার চরিত্রে কালিমা লেপনের জন্য তৎকালীন বিশ্ববিখ্যাত সব সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিকদের ব্যবহার করেন কিন্তু ২০০ বছর পর হলেও আজ আমরা সবাই জানি যে নবাব একজন খাঁটি দেশপ্রেমিকই ছিলেন। তবে বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রে ২০০ বছর কেন দুই যুগও লাগেনি; জাতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে, প্রতিবাদ করেছে। তাই তো বঙ্গবন্ধু আজও সত্য, ধ্রুব, শাশ্বত, মহিমান্বিত, উজ্জ্বল। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাষায়, ‘হাত দিয়ে বলো সূর্যের আলো রুধিতে পারে কি কেউ?’

সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার যেন না হয় সেজন্য আইন করে সংবিধানে সংযোজন করা হয় এবং খুনিদের পুরস্কৃত করা হয়!

আমাদের অনেকের রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকতে পারে, আদর্শের পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতির প্রতি সর্বদা সবার শ্রদ্ধা থাকতে হবে। ভারতে মহত্মা গান্ধীকে নাথুরাম গর্ডস গুলি করে হত্যা করে এবং তার ফাঁসি হয়। সে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সদস্য ছিলেন; যারা কিনা ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মূল চালিকাশক্তি। তবুও নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম কার্যদিবসে মহত্মা গান্ধীর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কর্ম সূচনা করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিশ্চিত পরাজয় জেনে দিশেহারা হিটলার বলেছিলেন, 'Eye for an Eye.' (চোখের বদলে চোখ) তাৎক্ষণিক প্রত্যুত্তরে মহত্মা গান্ধী বলেন, 'Eye for an Eye, makes the whole world blind.' (চোখের বদলে চোখ এই নীতি পৃথিবীকে অন্ধ করে দেবে)। ঠিক একইরূপে বঙ্গবন্ধু উদার দৃষ্টি দিয়েছিলেন এবং সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত সবাইকে নিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষ্যমতে, তার চরিত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিল বাঙালির প্রতি ভালোবাসা এবং দুর্বল দিকও ছিল বাঙালির প্রতি ভালোবাসা। তাইতো ১৯৭১ সালে রাজাকারদের চরম নৃশংসতার পরও যারা হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগে জড়িত ছিল তাদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকদের কখনও কৃতজ্ঞতা বোধ থাকে না। পাকিস্তানি এবং পাকিস্তানপন্থী ব্যক্তিদের চরিত্র এক ও ভয়ংকর! বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে ঠিকই বলেছিলেন, 'You can't expect honey from the teeth of snake, you can only expect poison from it.'

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড ছিল দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের বাস্তব রূপদান। শুধু সামরিক বাহিনীর তরুণ সদস্যরাই নয়, জড়িত ছিলেন ভেতর ও বাহিরের অনেক রাজনীতিবিদও। বঙ্গবন্ধুর লাশ যখন পড়ে ছিল ৩২ নম্বরের সিঁড়িতে আর তার মন্ত্রিসভার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্য যোগ দিয়েছিলেন খন্দকার খুনি মোশতাকের মন্ত্রিসভায়! ১৫ আগস্টের অভিজ্ঞতা নির্দেশিত করে যে, দুঃসময়ের রাত্রী কত দীর্ঘ এবং যাত্রী কারা হতে পারে।

নেলসন ম্যান্ডেলা এক ভাষণে বলেছিলেন, 'I'm not worried about my enemies because I know who are they, but I'm really worried about my followers because I don't know how far I will get them behind me.'

আমাদের মনে রাখতে হবে যে জিয়াউর রহমান ও খন্দকার মোশতাক বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় প্রাথমিক তদন্তে আসামি হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন। কিন্তু মৃত্যুবরণ করায় বঙ্গবন্ধু হত্যার আইনগত প্রক্রিয়া থেকে তাদের বাদ দেয়া হয়। উল্লেখ্য যে, মরণোত্তর বিচারের দৃষ্টান্ত ইংল্যান্ডে রয়েছে! ষোড়শ শতকের গৃহযুদ্ধের সময় ওলিভার ক্রোমওয়েল অবৈধভাবে দখল করে তৎকালীন রাজা প্রথম চার্লসের শিরশ্ছেদ করেন। কিন্তু ক্রোমওয়েলের মৃত্যুর পর রাজ পরিবার পুনরায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। মরণোত্তর বিচারের শাস্তিস্বরূপ প্রায় একদশক পর ক্রোমওয়েলের মৃতদেহ কবর থেকে তোলা হয় এবং তার কঙ্কালের শিরশ্ছেদ করে দেহ ডাস্টবিনে ফেলা হয়। অতঃপর তার মস্তক প্রায় ১০০ বছর বিভিন্ন মিউজিয়ামে, স্কুল কলেজ ও প্রতিষ্ঠানে প্রদর্শিত করে মানুষকে শিক্ষা দেয়া হয়; গণতন্ত্র ধ্বংস ও রাজাকে হত্যা করলে কী শাস্তি হতে পারে।

আর বাংলাদেশে শুধু রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করা হয়নি, হত্যা করা হয়েছে বঙ্গমাতাকে, অন্তঃসত্ত্বা ও শিশুকে, নীরিহ নিরপরাধ মানুষদের যাদের সঙ্গে রাজনীতির কোনো যোগাযোগই ছিল না। সৃষ্টিকর্তার কৃপায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধুর অপর কন্যা শেখ রেহানা বিদেশে অবস্থান করায় প্রাণে বেঁচে যান। ঘাতকরা জানতো বঙ্গবন্ধুর রক্ত কথা বলবেই, তাইতো তারা অবুজ শিশু রাসেলকেও ছাড়ে নাই। ঠিকই আজ বঙ্গবন্ধুর রক্তই কথা বলছে! প্রতিশোধ নয়, জঘন্য হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছেন এবং ঘাতকদের ফাঁসির রায় কার্যকর করেছেন সেই রক্তের উত্তরাধিকারী বঙ্গবন্ধু তনয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা নয়, এ দেশকে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে নিয়ে দৃশ্যমান উন্নয়ন সাধিত করে ও একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ঘাতকদের বুলেটের প্রতিউত্তর দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী স্বীয় দূরদর্শিতা, বিচক্ষনতা, সততা, মহানুভবতা, সর্বোপরি উদারতা যা পুরো জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পুনঃজাগরণ সৃষ্টি করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে সমস্ত জাতিকে ভালোবেসে এক কেন্দ্রে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছেন, পরিণত হয়েছেন জাতির নিউক্লিয়াসে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে। ঠিক যেমনটি বলেছিলেন মার্কিন লুথার কিং 'Darkness cannot drive out darkness; only light can do that. Hate cannot drive out hate; only love can do that.'

বঙ্গবন্ধু তনয়া বাংলার মানুষের সব দুর্দশা দূর করে মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালিয়ে আলোকিত করেছেন জাতিকে, হাসি ফুটিয়ে চলেছেন। দেশের দৃশ্যমান উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে জনগণ সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করেনি। যেমন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান তার দ্বিতীয় নির্বাচনে বলেছিলেন, 'If you are better of today than you were four years ago then vote me again please.'

তেমনই বিগত সংসদ নির্বাচন নির্ধারণ করে দিয়েছে আগামী বাংলাদেশের উন্নয়নের সূচক। ভিশন ২০২১ একটি সম্ভাবনা, একটি স্বপ্ন! বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী এবং বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার অর্ধশত বর্ষ পূরণ যাকে অর্থবহ করতে বাংলাদেশ আজ সম্পূর্ণ প্রস্তুত। বাংলাদেশে চলমান উন্নয়ন, অগ্রগতিকে অব্যাহত রাখতে ও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাস্তব রূপদানে একজনের কোনো বিকল্প নেই। তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

লেখক : ব্যারিস্টার, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ ও আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

এনডিএস/এমকেএইচ

ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা নয়, এ দেশকে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে নিয়ে দৃশ্যমান উন্নয়ন সাধিত করে ও একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ঘাতকদের বুলেটের প্রতিউত্তর দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী স্বীয় দূরদর্শিতা, বিচক্ষনতা, সততা, মহানুভবতা, সর্বোপরি উদারতা যা পুরো জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পুনঃজাগরণ সৃষ্টি করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে সমস্ত জাতিকে ভালোবেসে এক কেন্দ্রে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছেন, পরিণত হয়েছেন জাতির নিউক্লিয়াসে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে

আপনার মতামত লিখুন :