আবরার হত্যাকাণ্ড ও ভুল রাষ্ট্রনীতি

তানজীনা ইয়াসমিন
তানজীনা ইয়াসমিন তানজীনা ইয়াসমিন , কলামিস্ট, গবেষক
প্রকাশিত: ১০:২৪ এএম, ১০ অক্টোবর ২০১৯

কবি ডা. রোমেন রায়হানের লেখায় এসেছে, …প্রিয় বাবা , তুমি প্রস্তুত করো , তোমার চওড়া কাঁধ। /আগে চড়েছিল ছোট্ট আমিটা, এবারে আমার লাশ....../ মুখোশে মুখোশে মানুষের সাথে শুয়োরের বসবাস।

আজকের সেই শিশুটা দেশের সেরা বিদ্যাপীঠ বুয়েটের প্রখর মেধাবী সজ্জন এক শিক্ষার্থী। কিন্তু যারা তাঁকে খুন করে বেঁচে থেকেও প্রতিশ্রুতিশীল সুস্থ জীবন থেকে ছিটকে গেল তাঁরাও একই রকম মেধাবী। একই বিদ্যাপীঠের অনুজ। আবরার ফাহাদ নিজ ইচ্ছায় চলে যায়নি, খুব গুছিয়ে সুন্দর ভাষায় ভারতের কাছে সদ্য করা দাসখতের এক বস্তুনিষ্ঠ সামারি করেছিল। কিন্তু ঘাতক ছেলেগুলি ঠাণ্ডা মাথায় তাকে খুন করে নিজেরাও স্বপ্ন থেকে ছিটকে গেল! বা এটাই বেছে নিল।

কি সেই মোহ যা কোনো শিক্ষার্থীর নিজের আর পরিবারের আজন্মলালিত স্বপ্নর চেয়েও বড়? তারা সরকারি দল করে। পত্রিকায় নাম ছাপা হলে জেলে গেলে এই বিশাল পয়েন্টের জোরে ক্ষমতার মসনদ তৈরি হবে! ওয়ার্ড কমিশনার, জেলাভিত্তিক প্রধানের সিঁড়ি বেয়ে ভাগ্যে চাইতো “এমপি হবে, মন্ত্রী হবে ছেলে”। কাজেই? “ কালীর নামে দাও ভাসিয়ে!”

তারা ঠিক তাই করেছে। নিজেদের ভাসিয়ে দিয়ে আবরারকে নিশ্চিহ্ন করতে পাশবিক নির্যাতন নিস্তেজ করে ছুড়ে ফেলে গেছে সিঁড়িতে। ফাহাদের ছোট ভাই ফায়াজ কণ্ঠরোধ হয়ে আসতে আসতে প্রশ্ন করছিল এত বড় একটা হলের একটা কক্ষে এতজন মিলে তাকে পেটানো হলো, কেউ চিৎকার শোনেনি ? কেউ এগিয়ে আসেনি? সিঁড়ির দুইপাশে দুই গার্ড থাকে তারা শোনেনি!

এই ঘটনা এটাই নির্দেশ করে যে এটা কোনো আনকমন ঘটনা না! এমন হয়েই থাকে! কেউ হলের প্রভোস্টকে খবর দিতে পারেনি! তাদের ভূমিকাই বা এখানে কি ছিল? এবং মেরে লাশ একবার সিঁড়িতে অতঃপর কেন্টিনে এনে রাখার পর তার নিস্তেজ শরীরটাকে বাঁচাতে তারা কি কি পদক্ষেপ নিয়েছেন? মেরুদণ্ডহীন নির্লজ্জ ভিসির কথায় মুখে মিউকাস আর না জমালাম যিনি জানাজাতেও যাননি!

ভেবে দেখুন কোন কন্সান্ট্রেশন ক্যাম্পে এমন শিক্ষকরূপী শেয়ালদের কাছে আপনার কলিজার টুকরাকে গচ্ছিত রাখেন! এদের কোনো দায় নেই, শুধু আছে ক্ষমতা ধরে রাখার লোভ আর হারানোর ভয়! অন্ধের আঙ্গুল স্রেফ সরকারের দিকে তুললেই হবে না, প্রতি উচ্চ নম্বরের সিড়ির বাঁকে বাঁকে নীতিবিবর্জিত, ন্যায় বোধহীন ক্ষমতার প্যাঁকমাখা সব “শুয়োরের বসবাস ।”

আপনারা আমরা মানববন্ধন করব, সরকারের বিরূদ্ধে ফুঁসে উঠবো, তাতে লাভ কি হবে? হাজার হাজার ভিডিও ফুটেজ নিয়ে বিশ্বজিৎ হত্যার, কিংবা এই সেদিন বাকৃবির ছাত্র হত্যায় কি হয়েছে?

চাপ অবশ্যই প্রয়োজন । কিছু প্রেশার গ্রুপ না থাকলে তো আরো রসাতলে যেত। আজ একজন আনু মুহাম্মদ স্যার সুন্দরবন নিয়ে এমন আপোসহীন আন্দোলনে অনড় না থাকলে আগ্রাসন আরো কত ব্যাপক হতো ! কিন্তু ভাবুন, জিয়া সরকার যেই ছাত্র রাজনীতি চালু করেছে, এরশাদ সরকার তা বন্ধ করতে চেয়েছে, এখন সরকারে যেই আসেন, ছাত্রদের ঘাড়ে পা রেখে বসার সুবিধানীতি ছাড়েন না। এবং সুবিধা তো উভয়মুখী। তাই ছাত্ররাও দলীয় রাজনীতির ফায়দা ছেড়ে দেয় না। বরং অপকর্মের এইসব ভিডিও ফুটেজ তাদের সরকারি চাকরির অ্যানুয়াল সার্ভিস রেকর্ডের মত কাজে লাগে। বিশেষ সনদপত্র, প্রশংসাপত্র। আর , এদের কাঁধে ভর দেয়া পালকিতে বসা সরকারের পালকি আরো বেগবান হয়। ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়।

যেকোন সামাজিক আন্দোলন একটু জনবহুলতা পেলেই তা রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয় বা নিতে বাধ্য করা হয়। ফলাফল? বলাবাহুল্য, বানচাল। শাহবাগ আন্দোলন এর বড় উদাহরণ। এমতাবস্থায় ক্ষোভে ফেটে সরকার পতন দাবি করে কোনো ফায়দা নেই। সরকার যেই আসুক রাষ্ট্র কাঠামো আর সিস্টেমকে না পাল্টালে সব সরকার এই একই ঘটনার দিনে দিনে আরো অধমতর নিদর্শন নিয়েই আসবে, আসবেই।

রাষ্ট্রক্ষমতার গলদ, আমাদের ক্ষমতা খুব বেশি কেন্দ্রীভূত। সর্বময় ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর । সব ঘোষণা তিনিই দেবেন। এমনকি নির্বাচন কমিশনও তাঁর কাছে নতজানু, হুকুমের অধীন। এখন, কেউই চায়না ক্ষমতাচ্যুতি। ক্ষমতায় গিয়েই যাবজ্জীবন বন্দোবস্ত শুরু করে যে যার মত লুটপাট শুরু করে এবং যার শাসনামল সেই নিজের সেই রাজাসন চিরস্থায়ী করতে সবরকম ব্যবস্থা নেন। আজ ২০১৪ এর কলংকজনক ভোটের জন্য বলা হয় এই সরকার অবৈধ । কিন্তু এই একই চেষ্টা কি ৯৬, ২০০৬ এ তারেক জিয়ারা করেননি? নাকি ২০০১ এ ২০০৮ এ আওয়ামী-লীগ করেনি।? সফলকাম হয়েছে ২০১৪ তে, পার্থক্য এটাই। এখানে ছিল বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার ভুল সিদ্ধান্তও। নিজেকে এবং নিজের বহির্বিশ্বে প্রভাবকে ওভার এস্টিমেইট করে অংশ না নেয়ায় এই ফলাফল এবং এই সফলকামীতার একচেটিয়া দুঃশাসন এবং জবাবদিহিহীনতা প্রমাণ দিচ্ছে এহেন ঘটনার প্রতিক্রিয়া কিরূপ দুঃশাসনের জন্ম দেয়।

এহেন অনির্বাচিত সরকারের সাথে জনগণের সমর্থন নেই। তাকে ক্ষমতায় ধরে রাখতে হলে এমন চ্যালা চামুন্ডাকে অন্যায় আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে বশে রাখতে হয়। চ্যালা চামুন্ডার বাটখাড়ার ভোগের ভাগও নেয়া হয়। সীমানাবর্তী বড় রাষ্ট্রকে তোয়াজ তামিজ করতে হয়, সব দাবি মেনে নিতে হয়, যদি বাবু বলেন, “ বুঝেছ উপেন্, এ জমি লইবো কিনে।” ভূখণ্ড নদী সম্পদ ছেড়ে দিতেই হয়। কারণ নির্বাচনের সময় তাদের বড় কাঁধ লাগে, সমর্থন লাগে।

ভাবুন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প যতই ভোট টেম্পারিং করুক, যতই অমানবিক নীতির হুংকার দিক, তার মোড়লগিরি অন্য দেশেই। নিজ দেশে নির্বাচনকে কলংকিত করা বা অন্যায় নীতির প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি, মেক্সিকো ওয়ালও তুলতে পারেনি, ইমিগ্রেন্ট খেদাও বা বন্ধও করতে পারেনি, উপরন্ত জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে দ্রুতই। মোদি সরকার ভোটে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে সমালোচনায় ফেলেছে, কিন্তু যথেচ্ছ ভোট জালিয়াতি হয়নি।

এদিকে আমাদের কোনো জবাবদিহিতা নেই। দলে যারা থাকে তারা ভাবে কি করে দেশ নিঙড়ে খাওয়া যায়। কোন সরকারের ডালে বসে খাওয়ার সম্ভাবনা শেষ হতে দেখলে অন্য ডালে আসন গাড়তে কোনো সামাজিক লজ্জা বা দলীয় আদর্শের প্রশ্ন বিবেকে বাঁধে না । সবাই চূড়ান্ত স্বার্থান্বেষী এবং লোভী। দেশের-দশের কোনো উন্নয়ন এদের এজেন্ডাতেই নাই।

৪৭ থেকে বয়ে চলা এই চক্রব্যুহ ভাঙতে হবে। ভারত তার রাষ্ট্রনীতি বৃটিশ রাজের সাথে ঠাণ্ডা মাথায় খেলে অর্ধ শতাব্দী ধরে পরিবর্তন করেছিল। আর আমরা কেবল রাজা পালটে গেছি, কারণ আমাদের সদা লক্ষ্যই কেবল রাজাসন আর সুবিধাভোগ। দেশ ভেসে যাচ্ছে দুঃশাসনের জলোচ্ছ্বাসে! সরকারের বদলে কোনো লাভ নেই, এই ভুল রাষ্ট্রনীতির পরিবর্তন চাই।

এইচআর/জেআইএম

তারা ঠিক তাই করেছে। নিজেদের ভাসিয়ে দিয়ে আবরারকে নিশ্চিহ্ন করতে পাশবিক নির্যাতন নিস্তেজ করে ছুড়ে ফেলে গেছে সিঁড়িতে। ফাহাদের ছোট ভাই ফায়াজ কণ্ঠরোধ হয়ে আসতে আসতে প্রশ্ন করছিল এত বড় একটা হলের একটা কক্ষে এতজন মিলে তাকে পেটানো হলো, কেউ চিৎকার শোনেনি ? কেউ এগিয়ে আসেনি? সিঁড়ির দুইপাশে দুই গার্ড থাকে তারা শোনেনি!