বদলাতে হবে নারীর প্রতি বৈষম্যের দৃষ্টি

অঘোর মন্ডল
অঘোর মন্ডল অঘোর মন্ডল , এডিটর, দীপ্ত টিভি
প্রকাশিত: ০৯:২১ এএম, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে কী কোন শ্রেণি বৈষম্য চোখে পড়ে? বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার পড়বে না। সাদা চোখে দেখলেই বোঝা যায়; ক্রিকেট-ফুটবল- হকি থেকে অ্যাথলেটিকস। সব জায়গায় বৈষম্য আছে। সেটা খেলার ধরনে শ্রেণি বৈষম্য। নারী -পুরুষের বৈষম্য। যার চূড়ান্ত রুপ ধরা পড়ে আর্থিক বৈষম্যে! সব সময় কী এই বৈষম্য হয় সাফল্য আর জনপ্রিয়তার নিরীখে? মনে হয় না।মূল সমস্যা মানসিকতায়।

অবশ্য এই সমস্যা শুধু আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে নয়। উন্নত বিশ্বেও। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত জায়গায়ও ক্রীড়াঙ্গনে শ্রেণি বৈষম্য ছিল। এবং আছে। তাদের জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড়দের বিশেষ শ্রেণি মর্যদা পেতে আদালতে যেতে হয়েছিল। তারা অভিযোগ করেছিলেন; তারা পুরুষের সমান অর্থ, সুযোগ-সুবিধা, প্রচার কিছুই পান না। তারা সুবিধা- বঞ্চিত শ্রেণি। তারা লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার। কিন্তু পুরুষ ফুটবলারদের তুলনায় তারা পরিশ্রম খুব কম করেন না। সাফল্যও তাদের কম নয়। তারাও দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে জাতির কাছে এবং খেলাটার প্রতি দায়বদ্ধ। মার্কিন আদালতও মেনে নিয়েছেন তারা সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণি।

প্রথম বিশ্ব- তৃতীয় বিশ্ব সব জায়গায়ই এক চিত্র। বাংলাদেশে তার ব্যতিক্রম হয় কী করে? আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্যের কথা বললে, বর্তমানে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল পুরুষ দলের তুলনায় অনেক বেশি সফল। কিন্তু তার প্রচার, তাদের সুযোগ-সুবিধা কিংবা অর্থ সেটা কী পুরুষ ফুটবলারদের সমান? মোটেও না। অথচ এরা উঠে আসছেন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে। যেখানে একুশ শতকেও সামাজিক কুসংস্কার, পারিবারিক গোঁড়ামি রয়ে গেছে। সেই অচলায়তন ভেঙে তারা ছুটে আসছেন কেই ফুটবল পায়ে, কেউ ক্রিকেট ব্যাট হাতে। কেউবা তীর-ধনুক হাতে নিয়ে। দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা যদি না থাকতো, তাহলে এই সব নারীরা কিভাবে সাউথ এশিয়ায় বিভিন্ন গেমসে দাপট দেখালেন।

এশিয়া কাপ বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল এখনো জিততে পারেনি। কিন্তু নারীরা জিতে দেখিয়েছেন। ওটাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় ট্রফি। কিন্তু তাতে কী? বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীকে সামনে রেখে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড জাতির পিতার স্মৃতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে বিপিএল করছে। মাঠে গ্যালারি বেশিরভাগ ম্যাচেই ফাঁকা থাকছে। কিন্তু যদি বলা হয়; পাশাপাশি নারী ক্রিকেটারদের নিয়ে একটা বিপিএল বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে আয়োজন করা হোক; নিশ্চিত থাকতে পারেন; উত্তর আসবে;’ স্পন্সরদের আগ্রহ কম। সম্প্রচার সত্ত্ব যারা কিনেছেন তারাও খুব আগ্রগী নন। ইত্যাদি ইত্যাদি। ' কিন্তু যদি বলেন; প্রধানমন্ত্রী চান, নারীদের একটা বিপিএল হোক বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে; তাহলে হুড়মুড়িয়ে পড়বেন সবাই। ক্রিকেট বোর্ড কর্তারাও তোড়জোড় শুরু করে দেবেন। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। সব কিছুই প্রধানমন্ত্রীকে চাইতে হবে! বলতে হবে!

হ্যাঁ, তাই। তা নাহলে এদেশে কি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক হওয়ার মত কোন যোগ্য নারী সংগঠক নেই। যিনি বোর্ড পরিচালক হতে পারেন। পুরুষ কাউন্সিলররা ভোট দিয়ে নাই বা পরিচালক বানালেন, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের কোটায় একজন পরিচালক তো আছেন। সেখান থেকে তো একজন নারীকে বিসিবির পরিচালক বানানো যেতো। তা হলে নারী দল পরিচালনার দায়িত্বটা আর কোন পুরুষকে বইতে হতো না।

আসলে জাতীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলোর অভিভাবক যে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, উদ্যোগটা সেই মন্ত্রণালয়কেই নিতে হবে। যাতে কোন নারী অ্যাথলেটের মুখে আর শুনতে না হয়; মেয়েদের জন্য আন্তরিক ও সক্রিয় সমর্থন-প্রকল্প হাতে নিচ্ছে না মন্ত্রণালয়। অস্ট্রেলিয়ার ফুটবলে সম্প্রতি যুগান্তকারী ঘোষণা এসেছে, জাতীয় সংস্থা ফুটবল থেকে যে আয় করে থাকে, পুরুষ এবং নারী খেলোয়াড়রা তার সমান ভাগ পাবেন। আবার অ্যাথলেটিক্সে যে দেশের জয়জয়কার, সেই আমেরিকার ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড’ বিভাগের তিন মহিলা ক্রীড়াবিদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সন্তানজন্ম দেবার পর স্পন্সর সংস্থা তাঁদের উপার্জনে কোপ বসিয়েছে। বিশ্বের চিত্র দেখিয়া বাংলাদেশে নারীরা ক্রীড়ামুখী কতোটা হবেন, সে ব্যাপারে সংশয় রয়ে গেছে। মাঠে নামার জন্য বাংলাদেশে এখন ঘর থেকে একজন নারীকে বাইরে আসতে কী অনন্ত সংগ্রাম করতে হয় , তার খবর রাখে কে?

সংগ্রাম ছাড়া, বাংলাদেশে খুব কম নারী জীবনে সাফল্য এসেছে। সেটা খেলাধুলার মাঠ বলুন আর যে কোন ময়দান বলুন। সব জায়গায় একই চেহারা। সম্প্রতি ইতি খাতুন নামের এক নারী আর্চারিতে তিন তিনটা স্বর্ণ পদক জিতেছেন। কিন্তু তাঁর জীবনের গল্পটাই ছিল অন্যরকম। বাবা-মায়ের ঠিক করা বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে তিনি জীবনের নিশানা ঠিক করেছিলেন। ঝুঁকি নিয়েছিলেন। আজ এস এ গেমসে সফল হওয়ার পর; বাকি বাংলাদেশ জানছে তার সেই লড়াই-সংগ্রামে ভরা জীবনের গল্প। ইতিদের ক্যারিয়ারের ইতি টেনে দেয়ার জন্য আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ, আমরাই যথেষ্ট। কিন্তু তারপরও ইতির মত অনেকে আছেন যারা অদম্য। লড়াইটা চালিয়ে যেতে জানেন। তাদেরকে স্যালুট জানাতেই হবে।

শুধু মুখে নয়। বক্তৃতা-বিবৃতি আর অভিনন্দন বার্তায় যেন আটকে না যায়; ইতি-র মত অন্যান্য নারীদের প্রতি সরকার, সমাজসহ সাধারণ মানুষের প্রসারিত হাতগুলো।

লেখক: সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলাম লেখক।

এইচআর/পিআর

সংগ্রাম ছাড়া, বাংলাদেশে খুব কম নারী জীবনে সাফল্য এসেছে। সেটা খেলাধুলার মাঠ বলুন আর যে কোন ময়দান বলুন। সব জায়গায় একই চেহারা। সম্প্রতি ইতি খাতুন নামের এক নারী আর্চারিতে তিন তিনটা স্বর্ণ পদক জিতেছেন। কিন্তু তাঁর জীবনের গল্পটাই ছিল অন্যরকম। বাবা-মায়ের ঠিক করা বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে তিনি জীবনের নিশানা ঠিক করেছিলেন। ঝুঁকি নিয়েছিলেন। আজ এস এ গেমসে সফল হওয়ার পর; বাকি বাংলাদেশ জানছে তার সেই লড়াই-সংগ্রামে ভরা জীবনের গল্প