জীবন অনেককে ছুটি দিয়ে দিচ্ছে

অঘোর মন্ডল
অঘোর মন্ডল অঘোর মন্ডল , এডিটর, দীপ্ত টিভি
প্রকাশিত: ০৯:১২ এএম, ১৯ এপ্রিল ২০২০

বাঙালি ছুটি চায়। ছুটি উপভোগ করে। করোনার সৌজন্যে বাঙালি এবার লম্বা ছুটি পেয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে করোনার সংক্রমণ, মহামারি, আগামীর অনিশ্চয়তা, মৃত্যুর মিছিল, দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি- এর কোনো কিছুর আঁচ তাদের গায়ে লাগছে না। বাঙালি আছে ছুটির মেজাজে! উৎসবের আমেজে! শহরের বড় রাস্তাগুলো কিছুটা ফাঁকা। কিন্তু পাড়া-মহল্লায় গলির মুখে আড্ডা চলছে। হাট-বাজারের যে অবস্থা তা দেখে মনে হয়, রমজানের আগেই ‘ঈদ’ এসে পড়েছে! শহর থেকে গ্রাম এই চিত্র ভিন্ন কিছু নয়।

করোনা আক্রান্ত কত মানুষকে প্রতিদিন জীবন ছুটি দিয়ে দিচ্ছে; টেলিভিশনের পর্দায় সেই চিত্র দেখানো হচ্ছে। মানুষের জীবন বাঁচাতে গিয়ে কত ডাক্তার-স্বাস্থ্যকর্মী প্রতিদিন ঢলে পড়ছেন মৃত্যুর কোলে! চিকিৎসক স্বামীর লাশ পড়ে আছে, পিপিই পরে দূরে দাাঁড়িয়ে দেখতে হচ্ছে স্ত্রীকে! শেষবিদায় জানানোর সময়ও কাছে গিয়ে দুফোটা চোখের জল ফেলার সুযোগ মিলছে না! কী নিদারুণ এক সময়ের মুখোমুখি আজ মানুষ!

কবিগুরু অনেক আগেই লিখে গেছেন; ‘আজ দারুণ দুর্দিন। সভ্যতার শ্মশান সজ্জায় সংক্রমিত মহামারি।........।’ জীবনের এই প্রাণযুদ্ধ কবে কোথায় থামবে কেউ জানেন না। হয়তো থামবে। জীবনের জয় হবেই। কিন্তু এই বাংলায় আমরা কি এ যুদ্ধে জিততে চাই? মানুষ কি মানুষকে বাঁচাতে চায়? যদি তাই চাইতাম, তাহলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জানাজার নামে যে মিছিল, তা কীভাবে সম্ভব! প্রশাসনের আইন-নির্দেশ-চিকিৎসকদের পরার্মশ সব উপেক্ষা করে, এটা হয় কীভাবে? হয়। কারণ-আমরা বাঁচতে চাই না। অন্যকে বাঁচতে দিতে চাই না। তাই করোনার এই মহামারির সময়ও এদেশে গার্মেন্টস শ্রমিকদের চাকরি বাঁচাতে পায়ে হেঁটে দলবেঁধে ছুটে আসতে হয় মালিকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আরও স্ফীত করতে! আবার ফিরতে হয় খালি হাতে। বকেয়া বেতনের জন্য মিছিল করতে হয়। বিক্ষোভ করতে হয়!

হয় কারণ, বাঙালি সামাজিক দূরত্ব, শারীরিক দূরত্ব, লকডাউন, জনতার কারফিউ, কোভিড-১৯, এসব বোঝে না। তারা বোঝে ছুটি! ছুটির দিনে আনন্দ মিছিলে নেমে পড়েছেন তারা! একদিকে আর্তমানবতা, বিপন্ন সভ্যতা, অন্যদিকে আবার চলছে সরকারি ত্রাণচুরির উৎসব! মানবতার সেবায় চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য পিপিই কেনা আর ব্যবহার নিয়ে হচ্ছে পুুকুরচুরি। সেটা ডাক্তারদের কথায় বেরিয়ে আসছে বারবার। উন্নয়নের গণজোয়ারের মাঝেও আজ বেরিয়ে পড়েছে আমাদের স্বাস্থ্যখাতের রুক্ষ চেহারা। অবশ্য উন্নত বিশ্ব যেখানে মানুষকে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ আর কী করবে? কিন্তু গত উনপঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশে এই স্বাস্থ্যখাত কতটা গুরুত্ব পেয়েছে সেটা আজ হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে।

আজকের এই মহামারির সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে এমন একজন লোক রয়েছেন, যার না আছে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, না আছে চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে কোনো জ্ঞান। অবস্থা যা দাঁড়াচ্ছে তাতে দিন কয়েক পর স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিতে হতে পারে। কিংবা তাকেই রোজকার ব্রিফিং করতে হতে পারে। জনমানসে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর যে ইমেজ তৈরি হয়েছে তাতে সরকারকে বিব্রত হতে হচ্ছে। গণমাধ্যমের কাছে তিনি যা বলছেন তা, মাঝেমধ্যে হাস্যকর পর্যায়ে যাচ্ছে! সবকিছু মিলিয়ে করোনা দেখিয়ে যাচ্ছে, সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের সেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিজেই রুগ্ন। তার চিকিৎসা এখন জরুরি।

করোনার সংক্রমণ, মহামারি একদিন থেমে যাবে। কারণ যার শুরু আছে তার শেষও আছে। মহামারি শেষ হলে হয়তো আবার আমাদের দেখা হবে নতুন এক পৃথিবীতে। যেখানে মানুষ নতুন করে ভাববে দেশ, পৃথিবী, মানবতা, দুর্ভিক্ষ, মহামারি, স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে। কিন্তু আমরা কি ভাববো আমাদের স্বাস্থ্যখাত নিয়ে? আমরা কি ভাববো আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে? আমরা কি ভাববো সমাজের মধ্যে অসাম্য আর বৈষম্যের যে জঞ্জাল তৈরি হয়ে আছে তা দূর করা নিয়ে? যদি না ভাবতে পারি, তাহলে মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দেয়া যাবে না। গরিব মানুষের হাতে ত্রাণ পৌঁছে দিতে গেলে প্রান্তিক পর্যায়েও ক্ষমতাবান হয়ে ওঠা মানুষগুলো তা লুটেপুটে খাবে। জনকল্যাণে সরকারের সব আন্তরিকচেষ্টা এইসব লুটেরাদের সৌজন্যে জনমানস থেকে লুট হয়ে যাবে!

করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। সাধারণ মানুষের হাতে যাতে ত্রাণসামগ্রী পোঁছায় সরকার সে চেষ্টা করছে। কিন্তু যেভাবে প্রশাসন ঢিলেঢালাভাবে সরকারের নির্দেশনা পালন করছে, তাতে ভয় আগামী দিনগুলো নিয়ে। প্রশাসন যদি শক্ত হতো তাহলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এভাবে মানুষ রাস্তায় নেমে আসতে পারতেন না। প্রশাসনের কর্তারা বলবেন, তাদের কিছু করার ছিল না! ত্রাণ চুরি করা হচ্ছে, তাতে তাদের কিছু করার নেই! আইন-কানুন অমান্য করে মানুষ যেভাবে ছোটাছুটি করছে, সেটা ঠেকাতে তাদের কিছু করার নেই! এভাবে নেই.. নেই চলতে থাকলে, সাধারণ ছুটির মধ্যেও কত মানুষ জীবন থেকে ‘ছুটি’ নেবেন কে জানে!

লেখক : সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলাম লেখক।

এইচআর/বিএ/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]