আতঙ্কিত হয়ে দেদার কেনাকাটার চোটে অস্থির বাজার

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা , প্রধান সম্পাদক, জিটিভি
প্রকাশিত: ০৮:৪১ এএম, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০

করোনাভাইরাস আক্রমণের একদম শুরুর দিকে পৃথিবীর সভ্য দেশ থেকেও প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কিত কেনাকাটার খবর পাচ্ছিলাম আমরা। ফোর্বস ম্যাগাজিনে একটা লেখা পড়েছিলাম সে সময়, ‘দ্য ইকোনোমিক্স অব প্যানিক বায়িং’। লেখক বলছেন, এক প্রকার নার্ভাসনেস থেকে মানুষ এমনটা করে। বাংলাদেশেও মার্চ মাসের ৮ তারিখে করোনা রোগী শনাক্তের পর এমন আতঙ্কিত কেনাকাটা দেখেছিলাম। শুধু খাবারদাবার নয়, মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত ওষুধও কিনে রাখছিল। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই শোনা গেল বাজারে স্যানিটাইজার নেই, প্যারাসিটামল নেই, আরও অনেক কিছু নেই। পাওয়া গেলেও অত্যধিক দাম।

যাই হোক একটা পর্যায়ে গিয়ে সবকিছু সহনীয় হয়েছে। তবে নতুন করে আবার আমরা প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কিত কেনাকাটা দেখলাম পেঁয়াজের বাজারে। যেই না রাতের বেলায় টেলিভিশন স্ক্রলে খবর বের হলো- ভারত পেঁয়াজ রপ্তারি বন্ধ করেছে, সাথে সাথে মানুষ হামলে পড়ে বাজারে। এবং যা হবার তাই হলো। দুপুরের মধ্যেই ৩০ টাকার পেঁয়াজের দাম উঠল কেজি প্রতি ১০০ টাকা। যার ঘরে কয়েক সপ্তাহের পেঁযাজ আছে, তিনিও ছুটেছেন বাজারে, সুপারশপে। যার দরকার ৫ কেজি, তিনি হয়তো কিনে ফেললেন ২৫ কেজি।

গত বছর সেপ্টেম্বরে পেঁয়াজ নিয়ে একই ধরনের রাজনীতি ও কূটনীতি হয়েছে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে। আমাদের বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা আছে, ভারতের আচরণে সমস্যা আছে একগুলো সবই সত্যি। কিন্তু নাগরিকরা যদি আতঙ্কে নিজেদের বাড়িতে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি খাদ্যসামগ্রী মজুত করে রাখেন তখন এমনিতেই দুর্বল যে বাজার ব্যবস্থাপনা সেটা আরও ভেঙে পড়ে।

পেঁয়াজ রপ্তানি ভারত বন্ধ করেছে মানে দেশে একবারে পেঁয়াজ নেই, এমন ভাবনা কেন মানুষ ভাবতে শুরু করে সেটা বড় এক প্রশ্ন। পর্যাপ্ত মজুত এবং জোগান আছে, সরকারের তরফে এমনটা বারবার বলা হলেও মানুষ আতঙ্কিত হয়ে দেদার কেনাকাটা শুরু করে। কোনোভাবেই তাদের এ থেকে দূরে রাখা সম্ভব হয়নি। ভোক্তা অধিদপ্তর ও প্রশাসন বাজারে অভিযান পরিচালনা করছে কে বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি করছে সেটা দেখার জন্য। কিন্তু বাজারে হুমড়ি খেয়ে পড়া মানুষের মনের চিকিৎসা করবে কে?

সংকটের সময় বিত্তশালীরা যেমন প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য কিনে রাখে, তেমনি এই সুযোগে মুনাফা খোর ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীরা অতিরিক্ত খাদ্য মজুত করতে শুরু করে। আর এর জন্য সময় সমস্যায় পড়ে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ আর দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারীরা। এই পরিস্থিতি যাতে না-তৈরি হয়, সে জন্য সরকারকে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহে কড়া নজরদারি রাখতে হয়। খাবার নিয়ে যাতে কোনো ধরনের কালোবাজারি না-হয় দিকেও নজর দিতেই হবে। বিকল্প সূত্র থেকে পেঁয়াজ আমদানি করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হবে।

প্রথম দিন একটি সুপারশপে আমার নিজের অভিজ্ঞতাই সুখকর নয়। একজনকে দেখলাম তার ট্রলিতে যতটা পেঁয়াজ ধরে ততটা নিয়ে এগুচ্ছেন ক্যাশ কাউন্টারের দিকে। একজন কর্মী ছুটে এসে বললেন, ‘স্যার অল্প করে নিন, সবাইকে কেনার সুযোগ দিন’। কিন্তু তিনি নেবেনই। বুঝতে কষ্ট হয় না যে, এদের জন্যই জিনিসপত্রের আকাল শুরু হয়।

নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র থেকে ওষুধের সরবরাহ ঠিক রাখা সরকারের দায়িত্ব। সব কিছুতে কালোবাজারি রুখতে প্রশাসনকে সদা তৎপর থাকতে হয়। সরবরাহের দিকে তাকালে কখনও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, ওষুধের অভাব চোখে পড়ে না। কিন্তু যেকোনো একটা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নাগরিকদের একাংশ ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত কেনাকাটা করতে বাজারে ছুটে চলেন। তারা প্রয়োজন মতো জিনিস না কিনে যার যার ঘরে মাত্রাতিরিক্ত মজুদের লক্ষ্যেই এমনটা করে। এদের সাথে তখন যোগ দেয় সুযোগসন্ধানী পাইকার, আড়তদার বা অন্যান্য ব্যবসায়ী।

করোনার শুরুতে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির সময় লোকজন প্যানিক বায়িং করছিল। অর্থাৎ সবাই দরকারের অতিরিক্ত জিনিস কিনে বাড়িতে জমা করছিল। যেসব কিনছিল সেগুলোর বেশিরভাগ দরকারি জিনিস ছিল কিনা সেটাও ভেবে দেখেনি এসব ক্রেতা।

ভারত বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ার পর নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটির বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, বাংলাদেশে এখন যেই পরিমাণ পেঁয়াজের মজতি আছে, সেই হিসাবে একমাস সময় পেলে 'বিকল্প' বাজার থেকে পেঁয়াজ আমদানি করে বাজারে চাহিদা-জোগানের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব। মানুষ প্যানিক বায়িং করে এটা যেমন সত্য, তেমনি আরেক বড় সত্য হলো মন্ত্রীসহ সরকারি কর্তাদের কথায় মানুষ আস্থাও রাখতে পারে না। গত বছর সেপ্টেম্বরেই সরকারে বিভিন্ন মহলের বড় বড় আশ্বাসের পরও পেয়াঁজের দাম উঠেছিল কেজিপ্রতি ২৫০ টাকা।

খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের মান এবং দাম সবক্ষেত্রেই ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এখানেই সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন। প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কিত কেনাকাটা এক মানসিক সমস্যা। সরকারের বাজার ব্যবস্থাপনা ভালো না হলে অনাস্থায়ও মানুষ অনেক সময় এমন আচরণ করে।

লেখক : প্রধান সম্পাদক, জিটিভি।

এইচআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]