ডাক্তারের মান নিয়ন্ত্রণ এবং শৃঙ্খলা : কি করছে বিএমএন্ডডিসি?

আজকাল সংবাদপত্র কিম্বা ফেসবুক খুললেই দেখা যায় চিকিৎসকদের প্রতি ভুক্তভোগীদের আক্ষেপ। বেশির ভাগ ঘটনাই অতিরিক্ত ফিস আদায়, চিকিৎসক কর্তৃক অতিরিক্ত পরীক্ষা নিরীক্ষা, ভুল চিকিৎসা অথবা ময়নাতদন্তে অসত্য প্রতিবেদন সংক্রান্ত। চিকিৎসকদের গায়ে হাত দেওয়ার ঘটনাও ঘটে চলেছে একের পর এক। তার ভিতর অনেকগুলো ঘটনার আদ্যোপান্ত ঘেটে দেখা গেছে অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের দায় এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। তারা শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। সবকিছু বিবেচনায় একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, বাংলাদেশে এখন চিকিৎসা পেশার ক্রান্তিকাল চলছে যার দ্রুত বিহিত হওয়া প্রয়োজন।

যে আশা নিয়ে দেশের ভাল ছাত্রছাত্রীগণ চিকিৎসা পেশাকে বেছে নিয়েছিল তার অনেকটাই এখন ফিকে হয়ে গেছে। চিকিৎসক হয়েও অন্য ক্যাডারে যাওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টাও একারণেই। নিজ পেশার মানুষগণ যেমন উচ্চ ডিগ্রিধারী বা পদধারী না হলে জুনিয়রদের গোনায় আনেন না, তেমনি অন্য পেশা বা ক্যাডার এমন কি আমজনতা পর্যন্ত চিকিৎসকদের যথাযথ সম্মান দিতে চান না। এই অবস্থার জন্য দায়ী কে? এই অবস্থা কি একদিনে সৃষ্টি হয়েছে? এমতাবস্থায়, বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে? চিকিৎসকরা কি বিচার কিম্বা শাস্তির আওতামুক্ত? আজ এ ব্যাপারে লিখব বলেই কলম ধরেছি। আশাকরি জনমনে ভ্রান্তধারণা নিরসনে এ লেখা সহায়ক হবে।

স্কুল জীবনে আমি ছিলাম গর্বিত ব্যাক বেঞ্চার। ক্লাসে শ্রেণি শিক্ষক যখন আমাদের ভবিষ্যতে কি হতে চাই জিজ্ঞাসা করতেন, তখন সমস্বরে বলতাম ডাক্তার। উদ্দেশ্য একটাই যে এরপর তিনি যদি আমাদের রচনা লিখতে বলেন তাহলে গৎবাধা নীতিবাক্যসমেত মুখস্থ লিখতে পারি। তখন কি জানতাম, আমি একদিন বড় হয়ে আসলেই ডাক্তার হবো!! কালের পরিক্রমায় যখন মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলাম তখন বুঝলাম জীবনের পরিবর্তন। মুরুব্বিরা আমাদের প্রতি তাদের স্নেহ বাড়িয়ে দিয়েছে, পাড়া প্রতিবেশি সুন্দরী অসুন্দরী সবাই যেন ভালবাসায় পূর্ণ হাসির ফোয়ারা নিয়ে বসে আছেন। চোখের নিমিষে একদিন নামের আগে ডাক্তার পদবী বসে গেল! কি যে প্রশান্তি ! শুরু থেকেই মেডিকলিগ্যাল কেস নিয়ে কাজ করতাম তাই পুলিশের সাথে সখ্য এবং সম্মান প্রাপ্তিতে কোন ঘাটতি ছিল না। পুলিশের ইন্সপেক্টর পদবীধারীরা যখন স্যার বলে সম্বোধন করত তখন খুব ভাল লাগত। মনে হত, ডাক্তারি পড়ে ভুল করিনি।

দিন বদলেছে। নতুনরা এড়িয়ে চললেও আগের পরিচিত পুলিশ অফিসাররা দেখা হলে এখনও সম্মান করে আর স্মৃতিচারণ করে। বর্তমানের সাথে তুলনা করে। সেদিন এক পুলিশ অফিসারের কাছে জানতে চাইলাম, এখন ডাক্তারদের দশা এমন কেন ? তিনি যা বললেন, তা শুনে ক্ষণিকের জন্য আমি নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছিলাম। কি শুনছি আমি! যে চেয়ার আমাকে সম্মান দিয়েছে, যে চেয়ারের কারণে একজন সাব ইন্সপেক্টর অনুমতি ছাড়া আমার অফিস কক্ষে কোনদিন ঢোকেনি, সেই চেয়ারের সন্মানিত মানুষটি নাকি ঘুষ গ্রহণ করতে যেয়ে ধরা পড়েছেন, পুলিশের অফিসার আর সিপাহীরা তাকে উত্তম মধ্যম দিয়েছে এবং সেই দলে তিনিও ছিলেন!

আমি ভুল শুনলাম না তো!! কিছুদিন আগে টিভির টক শোতে উপস্থিত একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখলাম তিনি বলছেন, একজন ডাক্তার কর্তৃক সরকারি মানসিক হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী পাঠানোর গল্প। ডাক্তারদের গ্রুপে ঢুকলে প্রায়শ প্রতিকার চেয়ে ডাক্তারদের আর্ত চিৎকার। সম্প্রতি বিএমএন্ডডিসির এক কেরানি কর্তৃক উচ্চ ডিগ্রিধারী কন্সালট্যান্ট চিকিৎসকের সাথে দুর্ব্যবহার করার ঘটনাসমূহ পড়ে আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না ডাক্তারদের অধঃপতনের মূল কারণ এই মানহীন চিকিৎসক, যাদের রয়েছে কোড অফ মেডিকেল প্র্যাকটিস পালনে অনীহা আর অসততা। এখন প্রশ্ন হলো, ডাক্তারদের মান নিয়ন্ত্রণ, কোড অফ মেডিকেল প্র্যাকটিস পালনে বাধ্য করা আর অসততার শাস্তি দেওয়ার কি কেউ নেই?! কি করছেন তারা !

দেশে দেশে মেডিকেল কাউন্সিল গুলোর কাছে ডাক্তারদের দায়বদ্ধতা রয়েছে যেমন আমাদের দেশে রয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল অর্থাৎ বিএমএন্ডডিসির কাছে। এই বিএমএন্ডডিসি আমাদের দেশের মেডিকেল শিক্ষা এবং মেডিকেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের মাননিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা কারিকুলাম আর ডাক্তারদের মাঝে শৃঙ্খলা বজায় রাখার কাজে নিয়োজিত আছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তাদের কাজ আজকাল দৃশ্যমান নয়। সংবাদপত্রে কিছু বিজ্ঞাপন, আদেশ, উপদেশ প্রচারের মধ্যে তারা নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছেন। ভুক্তভগী সাধারণ মানুষ কিভাবে প্রতিকার পাবে তা তারা জানেন না। কাজের গতি এতটাই মন্থর যে কোন ডাক্তারের বিরুদ্ধে দৈবক্রমে যদি কোন নালিশ জমা পড়ে প্রক্রিয়া শেষে ফলাফল যখন বের হয় তখন সেই অভিযুক্ত ডাক্তার অবসরে চলে যান নতুবা অবসরে যাওয়ার সময়ে মানবিক অনুকম্পা পেয়ে যান।

সে কারণেই প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়সের বিএমএন্ডডিসি কর্তৃক এযাবৎ যতজন ডাক্তার শাস্তি পেয়েছে সেই সংখ্যা হাস্যকরভাবে অতি নগন্য। অবশ্য এই নগন্য সংখ্যার পেছনে শুধু বিএমএন্ডডিসিকেও এককভাবে দায়ী করা যায় না। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জনমনে বিএমএন্ডডিসির কাজের পরিধি সম্পর্কে স্পষ্ট কোন ধারণা নেই। সাধারণ মানুষ জানেন না যে, একজন ভুক্তভোগী হিসেবে কিভাবে প্রতিকার পাওয়া যায়। তাছাড়া এটি একটি দীর্ঘ মেয়াদী প্রক্রিয়া যা কোনভাবে বাধাগ্রস্ত না হলে সম্পন্ন করতে ছয় মাসও লেগে যেতে পারে। বিএমএন্ডডিসি সুত্রে জানা যায়, বর্তমানে মীর সায়েম দাখিলকৃত এক অভিযোগের উপর গঠিত স্বরক নং : বিএমএন্ডডিসি/১২-ই-২০১৯ তারিখ ১২/০২/২০২০ইং বলে শৃঙ্খলা কমিটির সিদ্ধান্ত রিভিউ সমাপন্তে শাস্তি ঘোষণার জন্য প্রায় এক বৎসর যাবত অপেক্ষমান।

একজন ভুক্তভোগী কিভাবে প্রতিকার পেতে পারেন-
এ জন্য সর্বপ্রথম একজন ভুক্তভোগী প্রমাণসহ বিএমএন্ডডিসি সভাপতি বরাবর স্বনামে দরখাস্ত করবেন। বিএমএন্ডডিসি সভাপতি সেটিকে আমলে নেওয়ার উপযুক্ত মনে করলে প্রাথমিক অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে পরীক্ষা করবেন। এই কমিটি উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে অভিযোগের স্বপক্ষে যদি মেজর কোন গাফিলতি পান তবে চার্জ গঠন এবং মূল অনুসন্ধান শুরু করবেন। এক্ষেত্রে রেজিস্টার্ড চিকিৎসক যদি নিজের দোষ স্বীকার করেন বা তার দোষ প্রমাণ হয় তবে তাকে তা খণ্ডন বা বাইরে নিষ্পত্তির সুযোগ দেওয়া হয়। সেটি করতে ব্যর্থ হলে শৃঙ্খলার ধারা চিকিৎসককে শাস্তি দিয়ে থাকেন।

বিএমএন্ডডিসি ডাক্তারদের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ হলেও রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে নয়। ফলে অপরাধ করেও দোষী প্রাক্টিশনারগণ নানাভাবে দায় মুক্তির চেষ্টা করে থাকেন। দোষ করলে তাকে শাস্তি পেতেই হবে এটি প্রতিষ্ঠা করা না গেলে ডাক্তারদের মাঝে শৃঙ্খলার পরিবর্তে হতাশার সৃষ্টি হবে। আশার কথা, বিএমএন্ডডিসির বর্তমান সভাপতির সুযোগ্য নেতৃত্বে কাজের গতি মন্থর হলেও থেমে নেই।

লেখক : ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান। বর্তমানে অধ্যাপক, ফরেনসিক মেডিসিন, ইউনিভার্সিটি টেকনোলোজি মারা (UiTM) মালয়েশিয়াতে কর্মরত।
[email protected]

এইচআর/এমএস

যে আশা নিয়ে দেশের ভাল ছাত্রছাত্রীগণ চিকিৎসা পেশাকে বেছে নিয়েছিল তার অনেকটাই এখন ফিকে হয়ে গেছে। চিকিৎসক হয়েও অন্য ক্যাডারে যাওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টাও একারণেই। নিজ পেশার মানুষগণ যেমন উচ্চ ডিগ্রিধারী বা পদধারী না হলে জুনিয়রদের গোনায় আনেন না, তেমনি অন্য পেশা বা ক্যাডার এমন কি আমজনতা পর্যন্ত চিকিৎসকদের যথাযথ সম্মান দিতে চান না। এই অবস্থার জন্য দায়ী কে?

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]