বেসরকারি স্কুল-কলেজের জনবল কাঠামো ও বিজ্ঞান শিক্ষা প্রসঙ্গ

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:০৪ এএম, ০৬ এপ্রিল ২০২১

মো. রহমত উল্লাহ্

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবলকাঠামো ও এমপিও নীতিমালা- ২০২১ এ বর্ণিত জনবল কাঠামো সংক্রান্ত ধারা ৬.১ এর একাধিক উপধারা অনুসারে দেখা যাচ্ছে:

গ) উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় (৬শ - ১২শ) পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, উদ্ভিদবিজ্ঞান/ প্রাণিবিজ্ঞান বিষয়ে ল্যাব চালু থাকলে প্রতি বিষয়ে ১ (এক) জন করে প্রদর্শক এবং ১ (এক) জন করে ল্যাব সহকারী পাবে। [উপধারা ২১ ও ২৬)]। অর্থাৎ ৪ (চার) জন প্রদর্শক ও ৪ (চার) জন ল্যাব সহকারী মিলে মোট ৮ (আট) জন পর্যন্ত নিতে পারবে!

ঘ) উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ (১১শ - ১২শ) পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, উদ্ভিদবিজ্ঞান/ প্রাণিবিজ্ঞান বিষয় অনুমোদন ও ল্যাব চালু থাকলে ঐচ্ছিক প্রতি বিষয়ে ১ (এক) জন করে প্রদর্শক পাবে। [উপধারা ৭]। অর্থাৎ মোট ৪ (চার) জন প্রদর্শক পাবে। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, উদ্ভিদবিজ্ঞান/ প্রাণিবিজ্ঞান বিষয় অনুমোদন ও ল্যাব চালু থাকলে ঐচ্ছিক প্রতি বিষয়ে ১ (এক) জন করে ল্যাব সহকারী পাবে। [উপধারা ১১] অর্থাৎ মোট ৩ (তিন) জন ল্যাব সহকারী পাবে। এক্ষেত্রে কেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ের প্রদর্শক পাবে কিন্তু ল্যাব সহকারী পাবে না তা পরিষ্কার নয়! তবে ৪ (চার) জন প্রদর্শক ও ৩ (তিন) জন ল্যাব সহকারী মিলে মোট ৭ (সাত) জন পর্যন্ত নিতে পারবে!

ঙ) স্নাতক (পাস) কলেজ (১১শ - ১৫শ) পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, উদ্ভিদবিজ্ঞান, প্রাণিবিজ্ঞান বিষয় অনুমোদন ও ল্যাব চালু থাকলে ঐচ্ছিক প্রতি বিষয়ে ১ (এক) জন করে প্রদর্শক এবং ১ (এক) জন করে ল্যাব সহকারী পাবে। অর্থাৎ ৫ (পাঁচ) জন প্রদর্শক ও ৫ (পাঁচ) জন ল্যাব সহকারী মিলে মোট ১০ (দশ) জন পর্যন্ত নিতে পারবে!

প্রশ্ন হচ্ছে, হাতে গোনা দুই একটি প্রতিষ্ঠান ব্যতীত সারা বাংলাদেশের স্কুল-কলেজে যেখানে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সবচেয়ে কম, যেখানে প্রতিদিন ব্যবহারিক ক্লাসের প্রয়োজন পড়ে না ও হয় না; সেখানে ব্যবহারিক ক্লাসের জন্য এত বেশি সংখ্যক জনবল রাখা হলো কেন? উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের রসায়ন বিষয়ে পাঠদানকারী একজন বিখ্যাত সহকারী অধ্যাপক বলেছেন, নির্ধারিত সিলেবাস অনুসারে একাদশ শ্রেণির জন্য ১২ (বার) টি এবং দ্বাদশ শ্রেণির জন্য ১২ (বার) টি মিলে দুই বছরে মোট ২৪ (চব্বিশ) টি ব্যবহারিক ক্লাস হলেই যথেষ্ট। এক বছরে ১২টি অর্থাৎ মাসে মাত্র ১টি করে ব্যবহারিক ক্লাস নেওয়ার জন্য একটি বিষয়ে ১জন শিক্ষক, ১জন প্রদর্শক ও ১জন ল্যাব সহকারী কী কারণে প্রয়োজন হবে তা বোধগম্য নয়! এতে সরকারি টাকার অপচয় ছাড়া আর কী হবে? যারা এই নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন তারা কি বাংলাদেশের বাস্তবতা জানেন না?

কিছু ব্যতিক্রম ব্যতীত সারাদেশের কলেজ পর্যায়ে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রতিষ্ঠানভেদে ১৫ থেকে ৩০ জন। আমরা সবাই জানি যে, তারা বোর্ড পরীক্ষায় প্রায় সবাই ২০ থেকে ২৫ নম্বর পেয়ে থাকে ব্যবহারিক পরীক্ষায়। তাদেরকে আর কত নম্বর পাওয়ানোর জন্য এত জনবল বৃদ্ধি করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে? এতে করে কি বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও মান বৃদ্ধি পাবে, প্রতিষ্ঠান অন্যান্য শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে? এই অতিরিক্ত প্রদর্শকগণ তো ব্যবসায় শিক্ষা শাখার কিংবা মানবিক শাখার শিক্ষার্থীদের কোন ক্লাস নিতে সক্ষম হবেন না।

বাংলা পড়াতে পারবেন না, ইংরেজি পড়াতে পারবেন না। উল্লিখিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্বিগুণ হলেও তো তাদের ব্যবহারিক ক্লাসের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে না। তাহলে সারাবছর বসে বসে কী করবেন তারা? অথচ এদের স্থলে বাংলা, ইংরেজি, আইসিটি ইত্যাদি আবশ্যিক বিষয়গুলোতে একাধিক শিক্ষক নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হলে প্রতিষ্ঠানের সকল শিক্ষার্থী অনেক বেশি লাভবান হতো। সকলের দাবিও ছিল সেটি। সেই দাবি উপেক্ষা করে সকল শিক্ষার্থীর জন্য আবশ্যিক বিষয়গুলোতেও পূর্বের ন্যায় মাত্র একজন করে শিক্ষক রাখার বিধান করা হয়েছে! যা শিক্ষার্থীদের জন্য চরম ক্ষতির কারণ!

বাংলা, ইংরেজিতে তো শিক্ষার্থীদের পাঠ দানের প্রয়োজনীয়তা আরো অনেক বেশি। কেননা, বাংলা ও ইংরেজিতে যুগ যুগ ধরে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়ে থাকে বা কম নম্বর পেয়ে থাকে। বিশেষ করে ইংরেজিতে দুর্বল থাকার কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষায় ও কর্মক্ষেত্রে গিয়ে খুব বেশি ভালো করতে পারে না এবং বিদেশে যাওয়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়।

বিজ্ঞান শিক্ষার উন্নতি চাইলে, বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়াতে চাইলে সরাসরি শিক্ষার্থীদের প্রণোদনা দেওয়া উচিত এবং তাদের কর্মক্ষেত্র সম্প্রসারণ করা উচিত। বিজ্ঞান শাখার শিক্ষার্থীদের যদি প্রতিমাসে ৫০০ টাকা হারে শিক্ষা ভাতা প্রদান করা হয় তাহলে খুব বেশিদিন লাগবে না বিজ্ঞান শিক্ষায় মেধাবী বিশেষ করে দরিদ্র-মেধাবী শিক্ষার্থীদের আগ্রহ তৈরি করার জন্য। যখন শিক্ষার্থীরা আর্থিক প্রণোদনা পাবে এবং কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পাবে তখন এখানে অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থী আসতে চাইবে এবং মেধাবী শিক্ষার্থী বাছাই করে নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবেই বিজ্ঞান শিক্ষার সত্যিকারের উন্নতি সাধিত হবে। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজনের অতিরিক্ত উল্লিখিত জনবলের বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয়ের তুলনায় শিক্ষার্থীদের পিছনে শিক্ষাভাতা বাবদ ব্যয় অনেক কম হবে এবং শিক্ষার্থীরা অধিক উপকৃত হবে ও সরকারের প্রতি চির কৃতজ্ঞ থাকবে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়টি যেহেতু ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই আবশ্যিক ও ব্যবহারিক সেহেতু এই বিষয়ে সকল পর্যায়ে একজন করে প্রদর্শক ও একজন করে ল্যাব সহকারী রাখা যেতে পারে। অবশ্যই তাদের এমন যোগ্যতা থাকা উচিত যেন তারা শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি কম্পিউটারের সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার এর সাধারণ মেরামত কাজ করতে জানেন ও পারেন। যারা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষক হয়ে আসেন তাদেরও এ বিষয়ে আরো বেশি ব্যবহারিক জ্ঞান থাকা আবশ্যক। তাছাড়া প্রায় ৯০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে যেখানে বিজ্ঞান বিভাগে খুব বেশি শিক্ষার্থী না থাকলেও প্রতি বিষয়ের জন্য পৃথক শিক্ষক রয়েছেন; সেখানে বিজ্ঞান বিভাগের একাধিক ল্যাবের জন্য বর্তমান বাস্তবতায় ১জন প্রদর্শক ও ১জন ল্যাব সহকারী থাকাই যথেষ্ট।

অপরদিকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়, উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও উচ্চমাধ্যমিক কলেজে কর্মচারীর সংখ্যা অত্যন্ত কম রাখা হয়েছে। ধারা ৬.১ এর উপ ধারা (খ), (গ) ও (ঘ) অনুসারে দেখা যায় যে, এসকল প্রতিষ্ঠানে ১জন নৈশপ্রহরী, ১জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও ১জন নিরাপত্তাকর্মী রাখা হয়েছে। সহশিক্ষা ও বালিকা বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে আরও একজন আয়া রাখা বিধান করা হয়েছে। এটি মোটেও যথেষ্ট নয়। কেননা, নৈশ প্রহরী বাদ দিলে দেখা যাবে দিনের বেলা একটি বালক বিদ্যালয়ে মাত্র একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও একজন নিরাপত্তাকর্মী থাকবে।

নিরাপত্তাকর্মী গেটে অবস্থান করলে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী দ্বারা পুরো প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কাজ সম্পাদন করা মোটেও সম্ভব হয় না। এখানে বলা হয়েছে, প্রয়োজনে প্রাতিষ্ঠানিক বেতন-ভাতায় অতিরিক্ত লোক নিয়োগ দিতে হবে। অথচ বিজ্ঞান বিভাগে যেসকল প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী আছে তাদের তো আয়ও পর্যাপ্ত আছে। প্রয়োজনে তারা ল্যাবে অতিরিক্ত লোক নিয়োগ দিতে পারত। সেটিইতো সারা বাংলাদেশের বাস্তবতায় উচিত ছিল। সেটি না করে সকল স্কুল-কলেজের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী কমিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত হয়নি।

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে (৬শ-১০শ) ১জন মাত্র 'অফিস সহকারী কাম হিসাব সহকারি' রাখা হয়েছে। পাঁচটি শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বেতন-ফি আদায় সংক্রান্ত হিসাব রাখা, পুরো প্রতিষ্ঠানের একাউন্টস মেনটেন করা, যাবতীয় অফিসিয়াল চিঠিপত্র লেখালেখি করা, শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন ও ফরম ফিলাপ সংক্রান্ত কাজ করা এবং প্রয়োজনে ব্যাংক ও অন্যান্য অফিসে যাতায়াত করার জন্য একজন লোক কোনভাবেই যথেষ্ট নয়।

বর্তমানে প্রতিদিন সরকারি অফিস থেকে সময়ে অসময়ে যে হারে মেইল আসতে থাকে সেগুলো চেক করে জবাব তৈরি করার জন্যই একজন লোককে হিমশিম খেতে হয়। তাই এ পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে 'অফিস সহকারী কাম হিসাব সহকারী' এর পাশাপাশি 'অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর' নামে আরো একটি পদ সৃষ্টি করা আবশ্যক।

উল্লেখিত বিষয়গুলো বাংলাদেশের মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতার নিরিখে নিরপেক্ষভাবে বিবেচনায় নিয়ে জনবল কাঠামো ২০২১ এর এসকল ধরা/উপধারা পুনর্বিন্যাস করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আন্তরিক হবেন বলে আশা করি। মনে রাখতে হবে, কেবল ঢাকা বা অন্য শহরে অবস্থিত বড় বড় দু'একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল চিত্র কিন্তু সারা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিদ্যমান নেই।

লেখক : সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ এবং অধ্যক্ষ -কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, ঢাকা।
[email protected]

এইচআর/জিকেএস

মনে রাখতে হবে, কেবল ঢাকা বা অন্য শহরে অবস্থিত বড় বড় দু'একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল চিত্র কিন্তু সারা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিদ্যমান নেই।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]