‘সক্ষম’দাবিদাররাই প্রকৃতপক্ষে ‘অক্ষম’

শাহানা হুদা রঞ্জনা
শাহানা হুদা রঞ্জনা শাহানা হুদা রঞ্জনা
প্রকাশিত: ০৯:৫৩ এএম, ২৯ জুলাই ২০২১

আমাদের বিল্ডিং-এর ৬ তলায় একজন বয়স্ক শিশু ছিল, যার কথা আমি আগেও একবার লিখেছিলাম। চলতি একটি ঘটনার কারণে আমার মনে হল শিশুটি আর ওর মায়ের কথা। মা ও ছেলের সাথে আসা যাওয়ার সময় মাঝেমধ্যে দেখা হয়ে যেতো। বাচ্চাটিকে নিয়ে ওর মা যখন চলাফেরা করতেন, তখন তাকে দেখলেই বোঝা যেত দারুণ একটা কষ্ট বুকে চেপে আছেন। উনি খুব সন্তর্পণে, চোখ আড়াল করে বাচ্চাটিকে নিয়ে ঘরে ঢুকে যেতেন।

তাও মাঝেমাঝে তাদের শেষরক্ষা হতো না। হঠাৎ করে বাচ্চাটি লিফটের ভেতরেই পেশাব করে ফেলতো। তাই নিয়ে আমরাই বিরক্ত হয়েছি, ক্ষোভ প্রকাশ করেছি। তাই হয়তো লজ্জায় ১৭ বছরের ঐ ছেলেটির মা, মুখ লুকিয়ে চলতেন। প্রতিবন্ধী শিশুটির মা ছিলেন অসহায়, কারণ ডাক্তার বলেছিল প্রতিদিন বাচ্চাটিকে বাইরে হাঁটতে নিয়ে যেতে, নতুবা ও আরো অসুস্থ হয়ে পড়বে। তাই মাকেই এই অপ্রিয় কাজটি করতে হতো। সেই অবুঝ শিশুটি তার মায়ের সকল যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে একদিন চলে গেল। জানি মায়ের একার পক্ষে কঠিন দায়িত্ব ছিল এই প্রতিবন্ধী সন্তানকে মানুষ করা। ছেলেটির বাবা মারা গেছেন। কিন্ত তাওতো একমাত্র সন্তানটি ছিল তার কোলজুড়ে।
একটা সময়ে আমরা মনে করতাম মানুষ শুধু শারীরিকভাবেই প্রতিবন্ধী হয়। পরিবারে এবং পৌরনীতি বইতে শেখানো হয়েছিল, ”খোঁড়াকে খোঁড়া, কানাকে কানা ও বোবাকে বোবা বলা উচিৎ নয়, বললে তারা কষ্ট পায় ” ব্যস এই পর্যন্তই। মানসিক প্রতিবন্ধিতা বলে যে কিছু আছে, তা জানতেও পারিনি। এ নিয়ে এখনো তেমন কিছু জানানো বা শেখানো হয় না অধিকাংশ পরিবারে, স্কুলে এবং মিডিয়াতে।

আমরা জানতাম কারো কোন মানসিক ভারসাম্যহীনতা থাকলে তাকে পাগল বলা হয়। একবার নড়াইলের এক গ্রামে গিয়ে একটি শিশুর সাথে পরিচয় হলো, যে ঠিকমতো কথা বলতে পারতো না এবং অন্যান্য শিশুদের সাথে বিশেষ মিশতো না। গ্রামের লোকের ধারণা ওর দাদা মানুষ ঠকানোর ব্যবসা করতো বলে ছেলেটির উপর এই অভিশাপ পড়েছে। বাচ্চার মা কাঁদতে কাদঁতে আমাদের এই তথ্য দিলো।

আর মানিকগঞ্জের শহরতলীতে বাস ১৬ বছরের সুমনার। সুমনা অসম্ভব ভালো ছবি আঁকতে পারে। যাকে দেখতো, তাকেই হুবহু এঁকে ফেলতে পারতো। কিন্ত ওর এই গুণটাকে কেউ কদর করেনি, এমনকী ওর বাবা-মাও নয়। বরং তারাও মানুষজন, পাড়া-প্রতিবেশিকে এড়িয়ে চলতো। কারণ সুমনা তাদের মানসিক প্রতিবন্ধী সন্তান। ওর বাবা মা জানালো সুমনার এই অবস্থার জন্য পাড়া-প্রতিবেশিরা আমাদের বিভিন্নভাবে দায়ী করেন, আমাদের এড়িয়ে চলেন।

আমরা সবাই সবসময় এদের এড়িয়ে চলেছি, এড়িয়ে চলি। ধরেই নেই এরা মানসিক রোগী। কোন প্রতিবন্ধী বা ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষকে আমরা আমাদের মত করে ভাবতে পারিনা। তাদের কষ্ট, চাওয়া-পাওয়াকে গুরুত্ব দেইনা। তাদের প্রান্তিক করে রাখি, লুকিয়ে রাখি, বঞ্চিত করি সব অধিকার থেকে।

এখন সরকার এবং বিভিন্ন সংস্থা থেকে শেখানো হচ্ছে ভিন্নভাবে সক্ষম এই মানুষগুলো অন্য জগতের কেউ নয়, ভিনগ্রহের প্রাণী নয়। বাবা মা বা পরিবারের কোন দোষত্রুটি বা আচরণের দায় এদের নয়। এরা আমাদের পাশে থাকা মানুষ, যাদের মধ্যে রয়েছে অপরিমিত শক্তি। যারা আচার-আচরণে খানিকটা বা অনেকটাই অন্যরকম হলেও, এদের ভেতর লুকিয়ে রয়েছে মেধা। এদের ভালবাসতে হবে, যত্ন নিতে হবে, উৎসাহ দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা সন্তান ভেবে তাকে বুকে টেনে নিতে হবে।

অথচ এই সময়ে এসেও আমাদের নাটকে দেখানো হয়েছে বাবা মা চোর বলে তাদের সন্তান হয়েছে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন। নাটকের শেষে দৈববাণীর মতো ভয়েজওভারে আসে, ‘পাপের ফল মানুষ কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। প্রত্যেককেই তার নিজ নিজ কর্মের ফল কোনো না কোনোভাবে ভোগ করতে হয়, এটাই নিয়তি।’ এরকম কুসংস্কার প্রচার করে নাটকটির নির্মাতা ও পাত্রপাত্রীরা কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছেন। ‘ঘটনা সত্য’ নামের নাটকে সত্য বলে যে বিষয়টির প্রচার করা হয়েছে তার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং তা অনেক সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা একটি অপপ্রচার মাত্র।

যদিও নির্মাতা সমালোচনার পর বলছেন, তাদের ভুল হয়ে গেছে। নাটকটি তারা তাদের ইউটিউব চ্যানেল থেকে নামিয়ে নিয়েছেন। অবাক হয়ে গেলাম এই দেখে যে একজন নাট্যকার কিভাবে কুসংস্কারের উপর ভিত্তি করে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষকে খাটো করে একটি নাটক লিখলেন। আর আমাদের জনপ্রিয়তম নায়ক নায়িকা তাতে অভিনয় করলেন। কারোরই মনেহলো না যে তারা এটা একটা অপরাধ করছেন। অসম্মানিত করছেন সেইসব বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু ও তাদের পরিবারকে। নাটকটি নিয়ে তোলপাড় না হলে তারা হয়তো এই ভুলটা তারা বুঝতেই পারতেন না। আমাদের চিন্তার চরম দুর্বলতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এই নাটক।

’রেইন ম্যান, ’ ’এ বিউটিফুল মাইন্ড’,’ মাই লেফট ফুট ’ এবং ” তারে জামিন পার” এমন কিছু সিনেমা যা অনেককেই নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছিল ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষদের নিয়ে। সিনেমাগুলো যেমন চমৎকার, জীবন ঘনিষ্ঠ, তথ্য সমৃদ্ধ, তেমনি ছিল হৃদয় ছোঁয়া। সিনেমাগুলো দেখে ঝরঝর করে কেঁদেছি। সেইসাথে সিজোফ্রেনিয়া, সেলিব্রাল পালসি, সেভান্ট সিন্ড্রম ইত্যাদি বিষয়গুলো সম্পর্কে যে ধারণা হলো, চোখ খুলে দিল এবং অনেক ভুল ধারণা ভেঙে দিলো।

বুঝতে পারলাম সেভান্ট সিন্ড্রমে আক্রান্ত একজন মানুষ, যাকে আমরা খানিকটা অস্বাভাবিক বলে মনেকরি, কিন্তু সেই মানুষটাই কতটা বেশি জ্ঞান তার মাথায় ধারণ করতে ও দ্রæত সেই তথ্যগুলো স্মরণ করতে পারে। দেখলাম শিশুকাল থেকে যে মানুষটি শুধু তার বাম পায়ের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলেও একসময় সে বিশ্বের সেরা একজন লেখক ও আঁকিয়ে হয়ে উঠেছিল। কীভাবে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত একজন মানুষও হতে পারে দারুণ গণিতবিদ, যার হাতে তৈরি হয় গাণিতিক থিওরি ।

আমরা যারা নিজেদের ’সক্ষম ’বলে মনেকরি, প্রকৃতপক্ষে আমরাই সবচেয়ে ’অক্ষম’। মানুষকে বুঝতে না পারাটাই একধরণের অক্ষমতা। ’অটিজম’ স্নায়ুবিকাশজনিত একটি ডিসঅর্ডার, যা জীবন ধরে চলে। আগে মানুষ এই বিষয়টি বুঝতো না। এখনও যে খুব একটা বোঝে, তা নয়। শহরের শিক্ষিত লোকেরা কিছুটা জানলেও, গ্রামের অগণিত মানুষ কিছুই জানেনা। তারা মনে করে হয় এরা ’পাগল’ ’ জীনে ধরছে’ ’বাতাস লাগছে বা ’অভিশাপের শিকার’।

দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে এই্ কুসংস্কারগুলোর উপর নির্ভর করেই রচিত হয়েছে ” ঘটনা সত্যি” নাটকটি। যেখানে নাটক, গান, নাচ, সিনেমা ও লেখালেখির মাধ্যমে অটিজম বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের নিয়ে জনগণকে সঠিক বিষয়টি জানাতে ও বোঝাতে হবে, কুসংস্কার ভেঙে দিতে হবে, তাদের নিয়ে কাজ করার ব্যাপারে উৎসাহ যোগাতে হবে, সেখানে এধরণের নাটক প্রচার করাটা ভয়াবহ অপরাধ।

যে বাবা-মায়ের একটি শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী বাচ্চা আছে, তারা জানেন কতটা কষ্টের মধ্যে দিয়ে তাদের যেতে হয়। কী ভয়াবহ প্রতিকূলতাকে তারা মেনে নিয়ে প্রতিবন্ধী সন্তানকে প্রতিপালন করেন। যেখানে একজন সুস্থ শিশুকেই ঠিকমতো বড় করে তোলা অভিভাবকের জন্য কঠিনতম কাজ, সেখানে একজন শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী বাচ্চার অবস্থা কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। এখনো এই দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় সংসারে ও সমাজে এই বাচ্চাগুলো ভীষণভাবে অযাচিত।

আমাদের একটু ভালবাসা, সমর্থন ও দৃষ্টিভঙ্গীর বদল, একটু হাত বাড়িয়ে দেয়া- এদের বেঁচে থাকার শক্তি যোগাতে পারে। বাবা মায়ের কাজের পাপ-পুণ্যের নিরীখে নয়, যে কারো ঘরে এমন একটি চাহিদাসম্পন্ন শিশুর জন্ম হতে পারে। যে শিশু আমাদের সাদা চোখে ”অক্ষম”, কিন্তু সেই হতে পারে ”ভিন্নভাবে সক্ষম”। এদের প্রত্যকের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বিভিন্নধরণের শক্তি, যাকে জাগিয়ে দেয়ার দায়িত্ব আমাদের।

অটিস্টিক বাচ্চাকে লুকিয়ে না রেখে তাকে সবার সাথে মেশার সুযোগ করে দিতে হবে পরিবারকে, সমাজকে, রাষ্ট্রকে। অটিস্টিক বাচ্চার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাদের বুঝতে পারা। খেয়াল করতে হবে বাচ্চাটির ভিতরে লুকানো গুণগুলো কী কী? তাকে সবসময় উৎসাহিত করতে হবে। তাদের জন্য সীমিত পরিসরে বিশেষধরনের চিকিৎসার ব্যবস্থা চালু হয়েছে দেশে। স্কুলে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সেইসাথে স্কুলে এই বাচ্চাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা চালু করা উচিৎ, যাতে এরা স্কুলে যেতে পারে এবং স্কুলে কোনরকম ঠাট্টা-ইয়ার্কির শিকার না হয়। প্রতিবন্ধিতা ও অটিজম নিয়ে আমাদের অনেক প্রচারণা চালাতে হবে।

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী মানুষ সবধরনের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। বাবা, মা ছাড়া কেউ তাদের যত্ন করে না, ভালবাসে না। সবাই মনে করে এরা পরিবার বা সমাজের বোঝা। একজন অসৎ, বদমাশ, লম্পট ও খুনিকে সমাজ যতটা না এড়িয়ে চলে, এর চেয়ে বেশি এড়িয়ে চলে প্রতিবন্ধী মানুষকে। তবে সমাজ ও রাষ্ট্র যদি এদের পাশে এসে দাঁড়ায়, তাহলে হয়তো সত্যিকার অর্থেই ইতিবাচক কোন ”ঘটনা সত্য” ঘটতেও পারে।

লেখক : সিনিয়র কোঅর্ডিনেটর, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন।

এইচআর/জিকেএস

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী মানুষ সবধরনের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। বাবা, মা ছাড়া কেউ তাদের যত্ন করে না, ভালবাসে না। সবাই মনে করে এরা পরিবার বা সমাজের বোঝা। একজন অসৎ, বদমাশ, লম্পট ও খুনিকে সমাজ যতটা না এড়িয়ে চলে, এর চেয়ে বেশি এড়িয়ে চলে প্রতিবন্ধী মানুষকে। তবে সমাজ ও রাষ্ট্র যদি এদের পাশে এসে দাঁড়ায়, তাহলে হয়তো সত্যিকার অর্থেই ইতিবাচক কোন ”ঘটনা সত্য” ঘটতেও পারে।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]