নদীপাড়ের মানুষের দুর্দশা কবে যাবে?

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:৫৮ এএম, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১

এবারে নদী ভাঙ্গনের তীব্রতা খুব বেশি। অতি বেশি বৃষ্টি হচ্ছে উজানে। হঠাৎ পাহাড়ি ঢল নেমে আমাদের দেশে বার বার বন্যা ও নদীভাঙ্গনে মানুষ সর্বস্বান্ত হচ্ছে। উত্তরের সবগুলো নদীতে বার বার বান ডাকছে। ধুয়ে মুছে যাচ্ছে আবাদী জমির সবকিছু। নদীপাড়ের ভাঙ্গনে ঘরবাড়ি, জোত-জমি হারিয়ে নদীপাড়ের মানুষ দিশেহারা।

করোনাকালে শহরের মানুষ রোগ ও রোগী নিয়ে ব্যস্ত। নেতারা ব্যস্ত নৈমিত্তিক ব্রিফিং-এ পারস্পরিক সামান্য বিষয়ে বিষোদগার করতে। প্রশাসন ব্যস্ত নেতাদের প্রটোকল নিয়ে। আর নদীপাড়ের মানুষ ভিটেমাটি ও জীবন-জীবিকা হারিয়ে মহা বিপদের মধ্যে বাঁচার তাগিদে ঘরের চালা, গবাদিপশু, দৈনন্দিন ব্যবহার্য্য তৈজসপত্র সরানোর কাজে অসহায়ের মত ছুটাছুটি করে দিনাতিপাত করছেন।

ভাঙ্গন কবলিত সবার মধ্যে শুধু উৎকণ্ঠা। শুধু কষ্ট আর চাপা কান্না। পরিচিত কাউকে দেখলে সে কান্না তাঁরা আর চেপে রাখতে পারেন না। ডুঁকরে হাউমাউ করে বিলাপ শুরু করে দেন। তিস্তাপাড়ের গৃহস্থ বধূ মালতী রানী ইতোপূর্বে দেখা হলে বাড়িতে সমাদর করে ডেকে বসতে তক্তার পিড়ি পেতে দিতেন, পান-সুপারি খাবার আমন্ত্রণ জানাতেন। এবারে নদীভাঙ্গনে তাঁর সব শেষ। বসতভিটা হারিয়ে পাগলিনীপ্রায় তিনি। পরিচিত কাউকে দেখলে বিলাপ করছেন আর বলছেন, ‘ বাড়ি পুড়লে ভিটা থাকে নদী ভাঙ্গলে সব ধূয়া’। নদীভাঙ্গন নিমিষেই মানুষকে বাস্তুহারা করে পথের ফকির বানিয়ে ফেলে। এটা বড়ই মর্মান্তিক ব্যাপার।

আসলেই তাই। বাড়িতে চুরি হলে চোর সবকিছু নিতে পারে না। অগ্নিকাণ্ডে সবকিছু পুড়ে গেলেও ভিটা থাকে। ভিটায় আবার ঘর উঠে, গাছপালা লাগানো হয়। কিন্তু নদী ভাঙ্গলে দরিয়া বানিয়ে ফেলে ভিটাকে। ভিটা চলে যায় মাঝ নদীর গভীর পেটে। ঘরহারা মানুষের আর্তকণ্ঠ গুমরে কেঁদে ফেরে। যেদিকে তাকানো যায়, শুধু অথৈ পানি আর পানি। দরিয়ার পানিতে তাকালে সেটা বুকে উঠে, মুখে উঠে তারপর চোখ গড়িয়ে নীরবে মাটিতে পড়ে মিশে যায়।

গত ১১.০৮.২০২১ তারিখে কুড়িগ্রামে এক সপ্তাহে ৫০টি বাড়িঘর তিস্তা নদীর পেটে চলে গেছে। এই জেলায় ছোট-বড় ১৬টি নদ-নদী। রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নে ভয়াবহ ভাঙ্গনে অসংখ্য ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। মানুষের দিকে তাকানো যায় না। ভাগ্যের ইশারা করে আকাশের পানে উদাস নয়নে তাকায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ। কেউ কেউ ৫০ বছরে ২০ বার বাড়ি ভেঙ্গে সরাতে সরাতে নিঃস্ব হয়ে পথের ফকির হয়েছেন। বাঁধের উপর চালাঘর তুলে বাস করছেন অনেকে। নদী কাছে চলে আসায় সেই বাঁধ থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরে ড্রেজার দিয়ে মাটি কেটে জিও ব্যাগ ভরিয়ে নদীতে ফেলা হচ্ছে। একথা শোনালেন বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। কিন্তু সরকারি লোক তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলতে লাগলেন নদীর চর থেকে নৌকায় বালু এনে জিও ব্যাগ ভরানো হচ্ছে। বালুর ব্যাগ ফেলে এলাকাটাকে নদীভাঙ্গন থেকে রক্ষা করা হচ্ছে। অথচ, নদীর চর এখন অথৈ পানির নিচে।

গত ১ সেপ্টেম্বর ভোর রাত থেকে হঠাৎ করে তিস্তা নদীতে পানি বৃদ্ধি হতে থাকে। ডালিয়া ব্যারাজের পানি ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি পানি জমা হতে থাকায় ব্যারাজের নিরাপত্তা রক্ষায় ৪৪টি গেটের সকল কপাট খুলে দেয়া হয়। ডালিয়ায় অবস্থিত ৬১৫ মিটার লম্বা তিস্তা ব্যারাজের পানি ডিসচার্জ করার ক্ষমতা ১২,৭৫০ কিউসেক। উপরের বেশি পানির চাপ সৃষ্টি হলে যথাসময়ে সব জলকপাট এবং ফ্লাড বাই-পাস খুলে না দিলে এর নিরাপত্তা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ বছর চারমাসে ১০ বার পানি বিপৎসীমার উপরে উঠে গিয়েছিল। তাই বার বার জলকপাট খুল দিতে হয়েছে। সিকিম ও আসামে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ায় এই পানি সপ্তাহ ধরে নামতে থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এখন উত্তরাঞ্চলের ২০টি জেলায় বন্যা চলছে। আগামী সপ্তাহে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে বন্যা শুরু হতে পারে।

প্রতিবছরের ন্যায় এবছরেও উজানে ভারী বৃষ্টিপাত অথবা পাহাড়ি ঢলের তথ্য সঠিক সময়ে না পাওয়ায় আমাদের দেশে হঠাৎ বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলার গ্রামীণ বাড়িঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন পানির নিচে। দেশের সকল নদ-নদীতে পানি বেড়ে যাওয়ায় আগামী সপ্তাহে সারা দেশে বন্যার আশঙ্কা করছেন নদী বিশেষজ্ঞরা। এর সাথে ব্যাপক হারে নদীতীর ভাঙ্গনের ফলে গৃহহারা ভাসমান মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পবে। এছাড়া দক্ষিণের জেলাগুলোতে রাস্তাঘাট, বাজার, স্কুল-কলেজ সবকিছু পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে। সেসময় সেপ্টেম্বরের ১২ ও ১৩ তারিখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেবার ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। কারণ, বন্যার পরে সাধারণত: নানা ধরনের মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঘটে। করোনা ও ডেঙ্গি ভীতির এই সময়ে ডায়রিয়া, আমাশয়, সর্দিজ্বর ইত্যাদি দেখা দিলে শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে।

যাদের ভিটেমাটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে সেসব পরিবারের শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারবে না। এদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় পাঠদানের সুযোগ নেই। ফলে তারা আরো বেশি পিছিয়ে পড়তে পারে। বন্যার কারণে শহরের শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারলেও গ্রামের শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারবে না। ফলে এক্ষেত্রেও এক ধরনের বৈষম্য তৈরি হতে পারে। ভিটেমাটিহারা মানুষ যেমন চারদিকে চোখে অথৈ পানি দেখে তারে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া সন্তানরাও নদীভাঙ্গনের কারণে চারদিকে অথৈ পানির মত সমস্যা দেখতে থাকবে। এ অবস্থা নিরসনে ‘ব্লেন্ডেড লার্নিং’ পরিকল্পনার আওতায় তাদের শিক্ষা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে প্রতিটি সমস্যাগ্রস্ত শিক্ষার্থীর জন্য নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিশেষ যত্নবান হয়ে তাদের প্রতি সুনজর দিতে হবে।

যখন আমাদের সেচের জন্য পানির দরকার তখন আমরা উজান থেকে বাধা পাই। যখন পানির দরকার নেই তখন উজানের পানি এসে আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়। প্রতিবছর আমন ধানের থোড় আসার মুহূর্তে বন্যার প্রকোপ আমাদের জন্য বড় অভিশাপ। এটা আমাদের আর্থ-সামাজিক উন্নতির ক্ষেত্রে চরম অন্তরায়। এ অবস্থা নিরসনের জন্য সরকারে গতি এতটাই মন্থর যা কৃষক ও কৃষির জন্য বেশ কষ্টদায়ক ও ক্ষতিকর। তাই ডেল্টা প্লান দ্রুত বাস্তবায়ন করে তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ সকল নদীর পানিব্যবস্থাপনার দিকে আশু জোর তাগিদ দিতে হবে। তা করা না গেলে নদীভাঙ্গনে ভিটেমাটি হারিয়ে চোখে অথৈ দরিয়া দেখা মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে সার্বিক উন্নয়নের গতি শ্লথ হতে হতে সব খাতে সহ্যের শূন্যসীমা অতিক্রম করে ফেলতে পারে।

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান। [email protected]

এইচআর/জিকেএস

ডেল্টা প্লান দ্রুত বাস্তবায়ন করে তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ সকল নদীর পানিব্যবস্থাপনার দিকে আশু জোর তাগিদ দিতে হবে। তা করা না গেলে নদীভাঙ্গনে ভিটেমাটি হারিয়ে চোখে অথৈ দরিয়া দেখা মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে সার্বিক উন্নয়নের গতি শ্লথ হতে হতে সব খাতে সহ্যের শূন্যসীমা অতিক্রম করে ফেলতে পারে।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]