কৃষি অব্যবস্থাপনা: বেশি উৎপাদনেও কৃষকের কান্না!

মোস্তফা হোসেইন
মোস্তফা হোসেইন মোস্তফা হোসেইন
প্রকাশিত: ০৯:৪৯ এএম, ১৬ জুন ২০২২

বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সুপরিবর্তনের কথা যদি বলতে হয়, তাহলে প্রথমেই বলতে হবে কৃষি খাতের কথা। খাদ্যদ্রব্য উৎপাদনই শুধু নয়, কৃষি সংশ্লিষ্ট প্রতিটি খাতই ঈর্ষণীয় সাফল্য লাভ করেছে উৎপাদনের দিক থেকে, যা বিশ্ব খাদ্য সংস্থা থেকে শুরু করে দুনিয়ার সব গবেষণা প্রতিষ্ঠানই স্বীকার করে।

আমাদের কৃষকরা দেখিয়ে দিয়েছেন, তারা সহযোগিতা পেলে অসাধ্য সাধন করতে পারেন। এর সুফল ইতোমধ্যে দেশের মানুষ পাচ্ছে। কিন্তু তারপরও আমাদের বলতে হবে, বাংলাদেশে কৃষি ব্যবস্থাপনার অবস্থান উৎপাদনের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে।

মনে করার যৌক্তিক কারণ আছে যে, খাদ্য চাহিদা পূরণের জন্য সব পক্ষ উৎপাদন বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিয়ে যুদ্ধে নামলেও পরবর্তী প্রতিক্রিয়া কিংবা ফলাফল সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা তেমন করা হয় না। করলেও তাদের চিন্তা-পরিকল্পনাগুলো গতি লাভ করতে পারেনি। অন্তত উৎপাদন বৃদ্ধির সমান্তরালে যেতে পারেনি।

আমাদের দেশের কৃষকরা আসলে লাভ লোকসানের কথা গভীরভাবে চিন্তা করেন না। তাদের মনোজগৎজুড়ে থাকে মাটি, আর উৎপাদিত ফসল। একাগ্রভাবে তাদের শ্রম মেধা প্রয়োগ করে উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে। আগেই বলেছি তারা এক্ষেত্রে শতভাগ সফলও বটে।

উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরকারের সহযোগিতার প্রসঙ্গ বলতে গেলে কৃতজ্ঞতাসহ স্বীকার করতে হবে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো দায়িত্বশীলতার প্রমাণ রাখছে অধিকাংশক্ষেত্রে। তাদের গবেষণা সাফল্যের ছোঁয়া প্রতিটি স্তরে চোখে পড়ার মতো। নতুন বীজ উদ্ভাবন, অধিক উৎপাদনশীলতা এবং সংরক্ষণ, চাষাবাদ প্রযুক্তি সবক্ষেত্রে এর প্রতিফলন দেখা যায়। কর্মচাঞ্চল্যটা আসলে ঢাকা কিংবা গবেষণাগারকেন্দ্রিক নেই। তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার কারণে ভোক্তারা এর সুফল ভোগ করছেন।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করতে চাই। বছর তিনেক আগে আমি ফলের বাগান করি গ্রামের বাড়িতে। সঙ্গত কারণেই ফসলি জমিতে মাটি ফেলে অনেকটা উঁচু করতে হয়। কুমিল্লা হর্টিকালচার বিভাগ এবং স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন হয় সেই সুবাদে। আমার চাহিদা অনুযায়ী ফলের কলম চারা ইত্যাদি দিয়ে তারা সহযোগিতা করেন সরকারি মূল্যে। বিনামূল্যে দেন পরামর্শ। ইউনিয়ন পর্যায়ের কৃষি কর্মীদের যখনই ফোন করা হয়, তারা বাগান দেখেন, তারা প্রয়োজনীয় পরামর্শও দেন।

গত বছর জুন মাসে বাড়ি যাওয়ার সময় বাসার কাছের একটি মোদি দোকানে দেখি একটি বস্তার নিচে পড়ে আছে কিছু আদা। মাত্র ৬০০ গ্রাম। সবই চারা গজানো। নিয়ে যাই বাড়িতে। উদ্দেশ্য পরীক্ষামূলক লাগিয়ে দেখা। গ্রামে যেই শুনেছে সেই হাসাহাসি করেছে এই দেখে। তাদের কথা আদা-হলুদ লাগাতে হয় বৈশাখে। আমি তারপরও লাগাই। গত বছর আষাঢ় মাসে লাগানো আদা বৈশাখে তোলা হলো। ৬০০ গ্রাম আদা লাগিয়ে পাওয়া গেলো ৬ কেজি। নতুন মাটি ছিল। কোনো সার ওষুধ কিছুই লাগেনি। কোনো নিড়ানি কিংবা আলাদা শ্রমও দিতে হয়নি।

এই বছরও জ্যৈষ্ঠ মাসেই লাগালাম ১৫ কেজি আদা ও হলুদ। এটাও পরীক্ষামূলক। এবার দোঁয়াশ ও বালু মাটিতে লাগানো হয়েছে এবং সনাতন ধারায় বৈশাখে লাগানোর পরিবর্তে জুন মাসে। প্রথম বছর পরীক্ষামূলক লাগানোর পর যে ফল পাওয় গেছে তার অর্ধেক ফলনও যদি হয়, আর সেটা যদি হয় সারাদেশে তাহলে কোনো কারণেই কোটি কোটি টাকার আদা আমদানির প্রয়োজন হবে না। এখনও আমাদের কোটি কোটি টাকার আদা ও হলুদ আমদানি করতে হয়।

চাহিদার সামান্য অংশই দেশীয় উৎপাদিত মসল্লায় পূরণ হয়। এবারও আদা লাগানো হয়েছে ফলের বাগানে। হয়তো সবখানে এভাবে দ্বৈত চাষ সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি বাড়িরই আঙ্গিনা আছে, আম-জাম গাছতলা আছে। সেখানে দুটি মসলাই চাষ করা যায়। শুধু আদা-হলুদ চাষ করার জন্য আলাদা জমি না হলেও চলে। এটা আমার অভিজ্ঞতার কথা বলছি। একটা পরিসংখ্যানে দেখলাম ২০২০ সালেই ২ হাজার টন হলুদ আমদানি হয়েছে।

তাহলে সমস্যাটা কোথায়? মসল্লা উৎপাদন করা সম্ভব হওয়ার পরও উৎপাদন হচ্ছে না কেন? মসলা গবেষণা সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য হচ্ছে প্রয়োজনীয় বীজ পাওয়া যায় না আদা ও হলুদের। প্রশ্ন হচ্ছে আমরা প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতে পারি মসলা আমদানি করতে গিয়ে, সেখানে বীজ আমদানি করতে নিরুৎসাহী কেন। অধিকাংশ মসলা চাষে জমির প্রয়োজন হয় কম। অনেক মসলা পরিত্যক্ত জমিতে চাষাবাদ সম্ভব। তাহলে বলতে হবে আমাদের কৃষি ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির কারণেই প্রতি বছর দুর্বিষহ অবস্থার মুখে পড়তে হয়।

কৃষি ব্যবস্থাপনার অন্যতম আরেকটি দিক হচ্ছে বিপণন ব্যবস্থা। বিপণন ব্যবস্থা যে কতটা নাজুক তার প্রমাণ আমরা প্রায়ই সংবাদ মাধ্যমে দেখতে পাই। গত রমজানে ৭০-৮০ টাকা কেজি দরে তরমুজ বিক্রি হয়েছে। সেই তরমুজ রোজার পর মৌসুমে এসে বিক্রি হয়েছে ১০-১৫ টাকা কেজি হিসেবে। শুধু তাই নয়, এমন ছবিও পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে, কৃষকরা তরমুজ নদীতে ভাসিয়ে দিচ্ছে।

যেমন বিপাকে পড়েন পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ এলাকার আনারস চাষীরা। আমাদের কৃষি সমস্যায় দুটো দিক। একবারে শাখের কড়াতের মতো। উৎপাদন হয় না, হলে কৃষক উৎপাদন ব্যয় ঘরে তোলতে পারে না। অথচ আন্তরিকতা এবং শ্রমের ঘাটতি নেই। আরেকটি ব্যক্তিগত উদাহরণ দেই।

আমার গ্রামে কৃষি বিভাগীয় একজন কর্মীর সহযোগিতায় কুমিল্লা কৃষি গবেষণা সংস্থা থেকে এবার কচুরলতির আবাদের জন্য বিনামূল্যে ৪ হাজার চারা দেওয়া হয় একই জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার চান্দলা গ্রামের মোস্তফা ছারওয়ারকে। উদ্দেশ্য ওই এলাকায় একেবারে নতুন সবজির চাষ শুরু করা।

স্থানীয় কৃষি বিভাগ থেকে পরামর্শ সহযোগিতার পাশাপাশি সারও দেওয়া হয়। মোস্তফা ছারওয়ার অর্ধেক চারা লাগান পরীক্ষামূলকভাবে। বাকি চারা আরেকজনকে দিয়ে দেন। মোট তিনজন কৃষক এবছর কচুরলতির চাষ করেন ৩ বর্গকিলোমিটার এলাকায়। প্রথম বছরই অবাক করার মতো উৎপাদন হয়। শুধু মোস্তফা ছারওয়ারের জমিতে প্রতিদিন ৪০-৫০ কেজি লতি তোলা যাচ্ছে। কিন্তু খুশি থাকতে পারলেন না এই লতি চাষী।

তিনি উৎপাদিত সবজি বিক্রি করতে পারছেন না। বিক্রিমূল্য অস্বাভাবিক কম হওয়ার কারণে উদ্ভাবনের চেষ্টাকে বোকামি ভাবতে শুরু করেছেন। লতি বিক্রয়যোগ্য হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ব্যয় বাদ দিয়ে শুধু জমি থেকে লতি বাজার পর্যন্ত নিতে যে ব্যয় হয় সেটাও পাচ্ছেন না লতি বিক্রি করে।

একজন কৃষিশ্রমিকের পক্ষে দিনে ৪০ কেজি লতির বেশি তোলা সম্ভব হয় না। প্রথম দিকে যখন দৈনিক ১৫-২০ কেজি উৎপাদন হতো তখন তিনি বিক্রি করতেন ২০-২৫ টাকা কেজি। কিন্তু যখনই দৈনিক উৎপাদন ৪০ কেজি বা তার বেশি হওয়া শুরু করে তখন স্থানীয় কয়েকটি বাজারে নিয়ে তিনি কচুরলতি বিক্রি করতে পারছেন না।

তিন চাষীর লতি যখন একই এলাকায় যেতে শুরু করেছে তখন স্থানীয় চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি লতি বাজারে মজুত হয়। ফলে এক লাফে লতির দর নেমে যায় ১০ টাকা কেজিতে। এতে শুধু বাজারজাতকরণের জন্য তার পকেট থেকে দৈনিক ২-৩শত টাকা লোকসান গুনতে হয়। কারণ লতি তোলার জন্য একজন শ্রমিককে তার দৈনিক দিতে হয় ৪০০-৫০০ টাকা। পরিবহন খরচ ১০০ টাকা যোগ করে খরচ হয় ৬০০ টাকা। সেখানে বিক্রি করে পাচ্ছেন ৪০০ টাকা।

এমন পরিস্থিতিতে কয়েক মণ লতি তিনি জমির পাশে ডোবায় ফেলে দেন। কিন্তু জমিতে লতিগুলো গাছে থেকেই চারা গজাতে শুরু করায় তিনি বাধ্য হন জমি থেকে লতি তোলার জন্য। ফলে বেশি ফলনের কারণেও তিনি বিপাকে পড়েছেন। কিন্তু ৫-১০ মণ লতি নিয়ে শহরে যাওয়া সম্ভব নয় তার পক্ষে। দ্বিতীয়ত দূরের শহরে বিক্রি করতে গেলে তার যে সময় ব্যয় করতে হবে, তাতে অন্যদিক দিয়ে ক্ষতি আরও বেড়ে যাবে।

এখানে বড় ঘাটতি হচ্ছে কৃষি বিপণন ব্যবস্থার। স্থানীয় কৃষিকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানলাম উপজেলা পর্যায়েও কৃষি বিপণন কার্যালয় নেই। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কি?

যেহেতু সবজির চাহিদা আছে এবং এই সবজির উৎপাদন বেশি। সেক্ষেত্রে কৃষি বিভাগকে এদিকে নজর দিতে হবে। নতুন এলাকা হওয়ার কারণে মধ্যস্বত্বভোগী পাইকাররাও জানে না এ খবর। সেক্ষেত্রে স্থানীয় কৃষি বিভাগ বিপণন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে যদি প্রথম বছরই বিক্রি সহায়তা করে তাহলে আগামীতে এই এলাকায় লতি চাষ বাড়বে। অন্তত নতুন চাষীরা বিক্রির নিশ্চয়তা পেলে এই এলাকাই হতে পারে বিশেষায়িত অঞ্চল।

শুরুতে কৃষি ব্যবস্থাপনার কথা বলছিলাম। এখানেও আমার দেখা কৃষি ব্যবস্থার কথা বলি। আমাদের শৈশবে আমাদের এলাকায় উন্নতজাতের ধান চাষ হতো না। আমন আউশ আর পাট চাষের ওপরই নির্ভর করতো মানুষ। আর হতো রবিশস্য চাষ। কিন্তু খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে মানুষ ধান চাষের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

সরকারিভাবেও সহযোগিতা বেড়ে যায় ধান চাষের ক্ষেত্রে। এখন রবিশস্য চাষ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে ওই এলাকায়। এলাকায় ধানের চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন হওয়ায় ধানের দাম উৎপাদন ব্যয়ের চেয়েও কমে যায়। কিন্তু কৃষক নতুন আবাদের পরামর্শ পাচ্ছে না কিংবা দিকনির্দেশনাও পাচ্ছে না। ফলে ধান উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্যের পরও তার হতাশা যাচ্ছে না।

এই পরিস্থিতিতে ধান চাষের পাশাপাশি রবিশস্য চাষে উদ্বুদ্ধ করতে পারলে মনে হয় কৃষক বাঁচবে একইসঙ্গে শত শত কোটি টাকার ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, আদা আমদানিও করতে হবে না। হলেও তার পরিমাণ অনেকাংশে কমে যাবে। সবার আগে সরকারিভাবে কৃষি বিপণনের বিষয়টিকে জোরালো করতে হবে অবশ্যই। কৃষককে যেন চিৎকার করতে না হয় কোন ‘গুণ নাই তার কপালে আগুন’ বলে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট।

এইচআর/ফারুক/এএসএম

আমাদের দেশের কৃষকরা আসলে লাভ লোকসানের কথা গভীরভাবে চিন্তা করেন না। তাদের মনোজগৎজুড়ে থাকে মাটি আর উৎপাদিত ফসল। একাগ্রভাবে তাদের শ্রম মেধা প্রয়োগ করে উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে। আগেই বলেছি তারা এক্ষেত্রে শতভাগ সফলও বটে

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।