মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে কে বাঁচাবে?

সম্পাদকীয় ডেস্ক
সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:৩৩ এএম, ০৭ আগস্ট ২০২২

চিত্রা গোস্বামী

গত ২৫-২৭ জুলাই অনুষ্ঠিত হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা। আমার বাসায় কয়েকজন আত্মীয় পরীক্ষা দিতে এসেছিল। গত ২৬ জুলাই পরীক্ষা দিয়ে ওরা ২৭ জুলাই চলে যায়। ২৭ জুলাই সকাল ৬টায় আমি ওদের নিয়ে স্টেশনে গিয়েছিলাম ট্রেনে তুলে দিতে।

স্টেশনে অনেক ভিড় দেখে আমার ড্রাইভার বললো ম্যাডাম আপনি গাড়িতেই বসে থাকুন আমি গিয়ে তুলে দিয়ে আসছি। কয়েক দিন আগে পায়ে একটু ব্যথা পেয়েছিলাম বিধায় আমি আর এগোলাম না। কারণ আমার পায়ের যে অবস্থা তাতে আমার পক্ষে ট্রেনে ওঠাটা কষ্টকর হয়ে যেত। তাই আমি গাড়িতেই বসে থাকলাম।

গাড়িতে বসে থেকে বাইরের মানুষগুলো দেখছিলাম। অনেক পরীক্ষার্থী এবং তাদের বাবা-মা সবাই ছুটছেন ট্রেন ধরার জন্য। গাড়িতে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ আমার চোখ পড়ল একটা মেয়ের দিকে। তার দিকে চোখ যাওয়ার পর থেকে আমি কিছুতেই আমার চোখ সরাতে পারলাম না।

মেয়েটির বয়স কতই বা হবে? হয়তো ১৮-১৯? অথবা আরেকটু কম বেশি। ওকে দেখে আমার মেয়ের বয়সেরই মনে হচ্ছিল। মেয়েটার গায়ে একটা ছেঁড়া জামা ও ছেঁড়া পায়জামা এবং কোলে একটি ফুটফুটে বাচ্চা। বাচ্চাটির বয়স হয়তো দু-তিন মাস।

মেয়েটিকে দেখে বুঝতে পারলাম সে পুরোপুরি না হলেও কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন। সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল হয়তো রাতের আঁধারে মেয়েটির অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে কেউ তার সর্বনাশ করেছে। আর তারই ফলশ্রুতিতে আজকের এই সন্তান তার কোলে। আমাদের সমাজে গরিব অসহায় মেয়েদের-যাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, লজ্জা নিবারণের জন্য একটা ভালো কাপড় নেই, রাস্তাই একমাত্র ভরসা।

এই ধরনের মেয়েদের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই বিধায় যে কেউ চাইলেই তাদের দেহটা নিজেদের খুশি মতো ভোগ করতে পারে। আবার কাম-লালসা চরিতার্থ হলে সাথে সাথে ছুড়ে ফেলে দিতে পারে রাস্তায়। আমার মনে হয় এদের জন্ম হয় শুধু একশ্রেণির মানুষের কাম-লালসা মেটানোর জন্য।

আমি মেয়েটি ও তার বাচ্চাটি দেখে ভাবছিলাম মেয়েটি নিজেও হয়তো জানে না কে তার সন্তানের বাবা! এই বাচ্চাটি যখন বড় হবে তখন আমাদের এই সমাজ কি তাকে স্বীকৃতি দেবে? যখন স্কুলে ভর্তি হতে যাবে তখন স্কুল কি তাকে তার পিতৃপরিচয় ছাড়াই ভর্তি নেবে? আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি যে এই বাচ্চাটি কোনো দিনই তার বাবাকে খুঁজে পাবে না। কোনো দিনও জানবে না কে তার বাবা?

মেয়েটি মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ায় তা একেবারেই সম্ভব নয়। হয়তো বাচ্চাটির বাবা তারই আশেপাশে থাকবে কিন্তু সে কোনো দিনই জানবে না বা খোঁজ নেবে না যে, রাস্তাঘাটে তারা এরকম কত সন্তানের জন্ম দেয়!

তাদেরই রক্ত রাস্তাঘাটে অবহেলায় পড়ে থেকে মানুষ হয়। মেয়েটিকে দেখলাম বাচ্চাটা কোলে নিয়ে এক পাশে বসলো এবং বাচ্চাটাকে দুধ খাওয়াতে লাগলো। অত্যন্ত অবহেলায় বাচ্চাটার একহাত ধরে টেনে তুলছিল এবং এপাশ-ওপাশ করাচ্ছিল। বাচ্চাটার মনে হয় হাতে ব্যথা লাগছিল বিধায় সে খুব কান্নাকাটি করছিল। মেয়েটি তার বাচ্চাটাকে খাওয়াতে খাওয়াতে বার বার ওড়না দিয়ে তার নিজের গা হাত-পা ঢাকছিল। তার পরনের জামা পায়জামা দুটোই ছেঁড়া।

আমি জানি না যে মেয়েটি আদৌ জানে কি না যে সন্তান কি জিনিস! আমাদের সমাজের কত বিত্তবান মানুষ আছে যারা একটা সন্তানের জন্য সারাজীবন হাহাকার করছে! লাখ লাখ টাকা ডাক্তারের পেছনে খরচ করছে একটা সন্তানের জন্য! তারপরও ঈশ্বর তাদের কোলজুড়ে একটা সন্তান দেয় না! যে সন্তান তাদের জন্য মানুষ করা কোনো ব্যাপারই না। আবার সন্তানের অভাবে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তির মালিকানা পেয়ে যাচ্ছে অন্যরা। অথচ মানসিক ভারসাম্যহীন সে মা হয়তো বোঝেই না সন্তান কি জিনিস! তার কোলজুড়ে ঈশ্বর দিয়ে রেখেছেন ফুটফুটে একটি দেবদূত!! যে কি না মানুষ হবে রাস্তাঘাটে পড়ে থেকে, একবেলা খেয়ে না খেয়ে, মানুষের ঝাটা-লাত্থি খেয়ে! হায়রে কি অসম বণ্টন!

মেয়েটিকে দেখার পর থেকে আমি কেন যেন তাকে ভুলতেই পারছি না! এসব মেয়ের দায়িত্ব কি রাষ্ট্র নিতে পারে না? বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তার বাবা সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য নিরলসভাবে পরিশ্রম করে চলেছেন। তিনি দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন। গৃহহীনদের জমির মালিকানাসহ ঘর দিয়েছেন।

এবার প্রয়োজন এই ছিন্নমূল মানুষদের দিকে দৃষ্টি দেওয়া। বাংলাদেশে হাজার হাজার এই ধরনের মানসিক ভারসাম্যহীন ছিন্নমূল নারী রয়েছে। আমাদের সমাজে একশ্রেণির মানসিক বিকারগ্রস্ত পুরুষ রয়েছে যারা এ ধরনের মেয়েদের ভোগের বস্তু হিসেবে মনে করে। তাদের বুদ্ধিহীনতার সুযোগ নিয়ে তাদের ভোগ করে রেখে যায় ভোগের চিহ্ন হিসেবে অনাগত সন্তান। এই সন্তানরাই এক সময় বিভিন্ন অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়ে।

ফলে সময় এসেছে এসব মেয়ের জন্য কিছু করার। আমরা জানি যে সরকারের বিভিন্ন বিভাগ রয়েছে এসব মেয়েকে দেখাশোনার জন্য। প্রতিটি জেলায় এ ধরনের মেয়েদের খুঁজে বের করে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে তাদের চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় সেবা প্রদান করা প্রয়োজন।

এ ধরনের মেয়েদের সন্তানদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা করা হলে একটি প্রজন্ম নষ্ট হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাবে। আমি বিশ্বাস করি আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়গুলো বিবেচনা করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এই বিষয়গুলো সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে উন্নয়ন অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।

এইচআর/ফারুক/এমএস

আমি মেয়েটি ও তার বাচ্চাটিকে দেখে ভাবছিলাম মেয়েটি নিজেও হয়তো জানে না কে তার সন্তানের বাবা! এই বাচ্চাটি যখন বড় হবে তখন আমাদের এই সমাজ কি তাকে স্বীকৃতি দেবে? যখন স্কুলে ভর্তি হতে যাবে তখন স্কুল কি তাকে তার পিতৃপরিচয় ছাড়াই ভর্তি নেবে?

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।