সাফ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন

নারীর জন্য ছাদখোলা বাংলাদেশ চাই

লীনা পারভীন
লীনা পারভীন লীনা পারভীন , কলামিস্ট
প্রকাশিত: ০৯:৫৯ এএম, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২

নারীর জন্য ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে বাংলাদেশের সীমানা। প্রতিমুহূর্তে নিজের যোগ্য স্থানটুকু নিশ্চিত করতে লড়াই করে যাচ্ছেন আমাদের বাংলাদেশী নারীরা। কখনও পোশাক নিয়ে, কখনও বাইরে বেরিয়ে আসা নিয়ে চলছে নারীর সীমানাকে বেঁধে ফেলার চক্রান্ত। অথচ আমরাও এই বাংলাদেশের নাগরিক।

একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এই ভূখণ্ডের ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে রয়েছে আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের গল্প। স্বাধীনতা মানে পুরুষের স্বাধীনতা বলা নেই কোথাও। তারপরও এতো কেন লাঞ্ছনা, গঞ্জনা আর অবহেলা?

আমাদের নারীরা কোথায় নেই? সীমাবদ্ধ সুযোগের যতটাই তারা অর্জন করতে পেরেছে তার পুরোটাই সফলতার গল্পে মোড়া। আজকে গোটা বিশ্বের যত বাংলাদেশী আছে সবাই গর্বের স্ট্যাটাস দিচ্ছি। কেন? উপলক্ষ নারী ফুটবল দলের সাউথ এশিয়ান ফুটবল টুর্নামেন্ট বিজয়।

অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে আমাদের মেয়েরা। বিশ্ব ফুটবল র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে থাকা বাঘা বাঘা দলকে একের পর এক গোল দিয়ে জিতে এসেছে তারা। হ্যাঁ। আজকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সেরা ফুটবল দল।

এই সম্মান, এই গৌরব কারা এনেছে? এনেছে সেই মেয়েগুলোই যারা দুই বেলা খাবারের নিশ্চিয়তা পায় না এখনও। সেই মেয়েদের হাত ধরেই আজ আমরা লাল সবুজের গর্বিত পতাকা উড়াচ্ছি যাদেরকে ভালো বেতন দেয়া হয় না।

যাতায়াতের জন্য ভালো পরিবহনের ব্যবস্থা হয় না। সাফ ফুটবলে জিতে আসার পর যাদেরকে লোকাল বাসে নিজ বাড়িতে ফিরতে হয়েছিল। এখনও যারা কেবল ফুটবল খেলে বলে হেনস্তার শিকার হচ্ছে সংরক্ষণবাদী মানসিকতার কাছে।

নারী ফুটবল দলের এক কঠিন বাস্তবতা ফুটে উঠেছে ফাইনালের আগের দিন ফুটবলার সানজিদার দেয়া ফেসবুক স্ট্যাটাসে। পাশাপাশি লৌহসম দৃঢ়তার পরিচয়ও একই স্ট্যাটাস। পাঠকের জন্য তার স্ট্যাটাসের কিছু অংশ তুলে ধরছি- ‘যারা আমাদের এই স্বপ্নকে আলিঙ্গন করতে উৎসুক হয়ে আছেন, সেই সকল স্বপ্নসারথিদের জন্য এটি আমরা জিততে চাই। নিরঙ্কুশ সমর্থনের প্রতিদান আমরা দিতে চাই। ছাদখোলা চ্যাম্পিয়ন বাসে ট্রফি নিয়ে না দাঁড়ালেও চলবে, সমাজের টিপ্পনী কে একপাশে রেখে যে মানুষগুলো আমাদের সবুজ ঘাস ছোঁয়াতে সাহায্য করেছে, তাদের জন্য এটি জিততে চাই। আমাদের এই সাফল্য হয়তো আরো নতুন কিছু সাবিনা, কৃষ্ণা, মারিয়া পেতে সাহায্য করবে। অনুজদের বন্ধুর এই রাস্তাটুকু কিছু হলেও সহজ করে দিয়ে যেতে চাই।

পাহাড়ের কাছাকাছি স্থানে বাড়ি আমার। পাহাড়ি ভাইবোনদের লড়াকু মানসিকতা, গ্রাম বাংলার দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষদের হার না মানা জীবনের প্রতি পরত খুব কাছাকাছি থেকে দেখা আমার। ফাইনালে আমরা একজন ফুটবলারের চরিত্রে মাঠে লড়বো এমন নয়, এগারোজনের যোদ্ধাদল মাঠে থাকবে, যে দলের অনেকে এই পর্যন্ত এসেছে বাবাকে হারিয়ে, মায়ের শেষ সম্বল নিয়ে, বোনের অলংকার বিক্রি করে, অনেকে পরিবারের একমাত্র আয়ের অবলম্বন হয়ে।

আমরা জীবনযুদ্ধেই লড়ে অভ্যস্ত। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের জন্য শেষ মিনিট পর্যন্ত লড়ে যাবো। জয়-পরাজয় আল্লাহর হাতে। তবে বিশ্বাস রাখুন, আমরা আমাদের চেষ্ঠায় কোনো ত্রুটি রাখবো না ইনশাআল্লাহ। দোয়া করবেন আমাদের জন্য।’

women-saf-championship-foot

আমাদের নারীরা নিজেদেরকে প্রমাণে দৃঢ় প্রত্যয়ী কিন্তু সেই আয়োজন কোথায়? একেকজন নারী ফুটবলার এই পর্যায়ে উঠে আসার পিছনের গল্পগুলো কি আমাদের জানা? এই যে চ্যাম্পিয়ন হলো, এরপরেও কিছু লোক নেতিবাচক কথা প্রচার করেই যাচ্ছে।

কেন মেয়েরা হাফপ্যান্ট পরে ওড়না ছাড়া খেলবে এটা নিয়ে আপত্তি জানাচ্ছে মৌলবাদ। কৃষ্ণার ড্রিবলিং দেখে নয়ন জুড়াচ্ছে আমাদের কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে কৃষ্ণাদেরকে সমাজের মৌলবাদী দৃষ্টির সাথে এমন ড্রিবলিং দিয়ে দিয়েই এগুতে হচ্ছে।

এই দলের প্রতিটা মেয়ে উঠে এসেছে পিছিয়ে পড়া দরিদ্র পরিবার থেকে। বঙ্গমাতা কাপ চালুর মাধ্যমে সারাদেশে নারী ফুটবলের যে জোয়ার শুরু হয়েছিলো সেটি স্তিমিত করতে তৎপর একটি গোষ্ঠী। স্কুল বা এলাকায় ফুটবল খেলাতো দূরে থাক, অনুশীলনও করতে দেয় না অনেক জায়গায়। নারী দলের কোচকে টিটকারি করা হয় নারী কোচ বলে। নারীদের খেলা নিষিদ্ধ করতে মিছিলও হয়।

এই মানসিকতা কেবল গ্রামে গঞ্জেই নয়। বিদ্যমান ফুটবল ফেডারেশনের মাঝেও লুকিয়ে আছে। নাইলে এতো কেন অবহেলা? এতো বড় একটা আয়োজনে অনুপস্থিত আমাদের ফুটবলের বড় বড় কর্তারা। কেন? একি কেবলি অবহেলা না অন্যকিছু? কাজী সালাউদ্দীন কি পারতেন না গ্যালারিতে উপস্থিত থাকতে? এতে করে অন্তত কোচ, খেলোয়াড়রা অনেক বেশি সম্মানিত হতো। সালাউদ্দীন সাহেবও পেতেন সম্মান। হয়নি।

সানজিদার আক্ষেপ যে তারা হয়তো ছাদখোলা গাড়িতে সংবর্ধিত হবেনা কিন্তু তারা জিততে চায় নিজেদের জন্য, তাদের সর্বহারা পরিবারের জন্য, আধপেটা খাওয়া দলের জন্য। এই আত্মমর্যাদাবোধ আমাদেরকে সাহসী করে স্বপ্ন দেখতে। খুলে যাক সকল বাধা। উন্মুক্ত হোক বাংলাদেশের সকল পশ্চাৎপদ চিন্তাধারা। দুপায়ে মারিয়ে এগিয়ে যাক বাংলার নারীরা। আমরা আমাদের যোগ্যতায় আগাতে চাই। কারও করুণাতো চায়নি সানজিদা।

ছাদখোলা বাস নয়, এই বাংলার গোটা আকাশটায় যে ছাদ বসানোর আয়োজন চলছে ভেঙে দেয়া হোক সেই আচ্ছাদন। খোলা আকাশে মুক্তবাতাসে ফুটবলে, ক্রিকেটে, সাতারে বা কর্মক্ষেত্রে হাত-পা ছুঁড়ে জানান দিতে চাই- হে বাংলাদেশ, আবদ্ধ থাকার জন্য নারীর জন্ম হয়নি। নারীপুরুষ সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই ধরে রাখতে চাই শরতের রোদ্দুরকে।

লেখক: অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, কলামিস্ট।

এইচআর/এমএস

ছাদখোলা বাস নয়, এই বাংলার গোটা আকাশটায় যে ছাদ বসানোর আয়োজন চলছে ভেঙে দেয়া হোক সেই আচ্ছাদন। খোলা আকাশে মুক্তবাতাসে ফুটবলে, ক্রিকেটে, সাতারে বা কর্মক্ষেত্রে হাত-পা ছুঁড়ে জানান দিতে চাই- হে বাংলাদেশ, আবদ্ধ থাকার জন্য নারীর জন্ম হয়নি। নারীপুরুষ সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই ধরে রাখতে চাই শরতের রোদ্দুরকে।

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।