বাজেটে ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচির বাস্তবায়ন চাই
২০১৫-১৬ অর্থ বছরের বাজেট সামনে। প্রথামাফিক জুনের প্রথম সপ্তাহেই, সম্ভবত ৪ জুন ২০১৫, বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী বাজেট ঘোষণা করবেন। অর্থবিল বাজেট পেশের সাথে সাথেই বলবৎ হলেও বাজেট পাশ হবে জুনের শেষে এবং জুলাই থেকে জুন অবধি এর প্রয়োগ সময়কাল বিবেচিত হবে। এজন্য তিনি বাজেট নিয়ে কাজ করা শুরু করেছেন।
কেবল যে দাপ্তরিক কাজ করছেন সেটি নয় বরং সংশ্লিষ্ট মহলগুলোর সাথে আলাপ আলোচনাও করা হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। এরই মাঝে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এই খাতের সাথে কথা বলেছে। প্রথামাফিক বিভিন্ন খাত থেকে লিখিত প্রস্তাবনাও পেশ করা হয়ে থাকবে।
এফবিসিসিআইও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাথে বাজেটের নানা দিক নিয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে থাকে। সেই ৯৭ সাল থেকেই আমরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং এফবিসিসিআই-এর সাথে কাজ করে আসছিলাম। আমি প্রত্যাশা করি এবারও একইভাবে কাজটি অব্যাহত থাকবে। তবে অন্য বছরগুলোতে যেভাবে সরাসরি কথা বলতে পারতাম এবার সেভাবে কথা বলতে পারবনা বলে প্রকাশ্যে লিখে এবং প্রস্তাবগুলো সংশ্লিষ্ট খাতের বাণিজ্য সংগঠনগুলোতে পাঠিয়ে আমার মতামতটি পেশ করতে চাই। আমি মনে করি, এই খাতের অগ্রগতির জন্য বাজেট প্রসঙ্গটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাজেটে কেবলমাত্র পুরো বছরের পরিকল্পনা পেশ করা হয়না-বাজেটকে ভিত্তি করে নির্মিত হয় সামনের দিনগুলো।
আমি যতোটা জেনেছি, দেশের তথ্য প্রযুক্তি খাতের বাণিজ্য সংগঠনগুলো জোরালোভাবে তাদের দাবিগুলো তুলে ধরেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণাটি ২০০৮ সালে দেবার পর থেকে বাজেটে তথ্যপ্রযুক্তির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়ে আসছে। আমি স্মরণ করতে পারি ২০০৯-১০ সালের বাজেটে ১০০ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ দিয়ে অর্থমন্ত্রী ডিজিটাল বাংলাদেশ বান্ধব বাজেটের সূচনা করেছিলেন। আমি মনে করি, অর্থমন্ত্রীর দিক থেকে এখনও সেই সদিচ্ছা অব্যাহত রয়েছে। তবে বাজেট বাস্তবায়নে ও পরিকল্পনা গ্রহণে এখনও রয়ে গেছে নানা অসম্পূর্ণতা। আমি দুটি দিক থেকে এই অপূর্ণতা দেখি।
প্রথমত আমাদের এই খাতের বাণিজ্য সংগঠনসমূহ যথাযথভাবে তাদের কথাগুলো তুলে ধরতে পারেনা। তারা যদি যৌক্তিকভাবে বিষয়গুলো উপস্থাপন করতে পারে তবে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকগণ ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারেন। দ্বিতীয়ত আমাদের রাজনীতিক ও আমলাতন্ত্র এখনও সাধারণভাবে ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণাও বোঝেন না। যে কজন এই ধারণাটিকে কোনও না কোনওভাবে একটু বোঝেন তারাও বহু বিষয়ে বিভ্রান্তিতে থাকেন।
নাম উল্লেখ না করে আমি বলতে পারি যে, সরকারের অনেক টাকা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলায় ব্যয় হলেও সেটি পরিকল্পিতভাবে করা হয় না। এমনসব খাতে টাকা ব্যয় করা হচ্ছে যার প্রয়োজন নাই। আবার এমনসব খাত রয়ে গেছে যার দিকে তাকানোও হয় নাই। কোনও কোনও খাতে সমন্বয়ের অভাবও আছে। একই কাজে সরকারের একাধিক প্রতিষ্ঠান কাজ করে এবং একাধিক বরাদ্দ প্রদান করা হয়। সরকারি টাকা অপচয়ের একটি ছোট দৃষ্টান্ত এখানে তুলে ধরতে পারি। আইসিটি ডিভিশনের একটি কর্মসূচিতে দেশব্যাপী সাইবার ক্রাইম সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য টাকা খরচ করা হচ্ছে। টেলিভিশনে এই বিষয়ে বিজ্ঞাপন দেয়া হচ্ছে। গ্রামে-গঞ্জে সেমিনারও করা হচ্ছে। অথচ এই খাতের প্রথম কাজটি ছিলো একটি সাইবার ক্রাইম আইন প্রণয়ন করা। তেমন কোনও আইন না করে এই সচেতনতার পেছনে টাকা খরচ করা কার স্বার্থে সেটি বোঝা যায় না।
আমার নিজের কাছে মনে হয় বাজেট বরাদ্দের কথা ভাবার সময় অর্থমন্ত্রীর উচিত সকল মন্ত্রণালয়ের সকল আইসিটি কর্মকাণ্ডকে ডিজিটাল বাংলাদেশ নামে আলাদা করে চিহ্নিত করে আলাদাভাবে বাজেট বরাদ্দ করা। যেমন: যদি সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব করতে চায় বা সরকারি কর্মকর্তাদেরকে ল্যাপটপ দিতে চায় তবে সকল মন্ত্রণালয়ের সকল বরাদ্দ একটি সমন্বিত বরাদ্দে উল্লেখ করা ভালো। সরকারের সকল তথ্যপ্রযুক্তি কেনাকাটা আইসিটি ডিভিশন থেকে হতে পারে। যে মন্ত্রণালয়েরই যা চাহিদা থাকুক সেটি আইসিটি ডিভিশনে পাঠানো হলে তারা তার প্রয়োজনীয়তা ও স্পেসিফিকেশন যাচাই করে টেন্ডার করবে, সংগ্রহ করবে এবং যাদের প্রয়োজন তাদের কাছে পাঠিয়ে দেবে। সামরিক বাহিনীতো এভাবেই কেনাকাটা করে। আইসিটি ডিভিশনে কেনাকাটার একটি অধিদপ্তর থাকতে পারে বা বিদ্যমান অধিদপ্তরকে সেভাবে সাজানো যেতে পারে। আমি ঠিক জানি না যে, সরকার এভাবে ভাবছে কিনা। বরং পুরো সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ ভাবনায় কেবল সমন্বয়হীনতাই চোখে পড়ছে।
আমরা প্রতি বছরই দেখি যে, অর্থমন্ত্রী ডিজিটাল বাংলাদেশ বিষয়ে আলাদা একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। আমি মনে করি সেই পুস্তিকাটি ডিজিটাল বাংলাদেশ বিষয়ক একটি বাজেট দলিল হতে পারে যাতে সকল মন্ত্রণালয়ের সকল বরাদ্দ সমন্বিত আকারে সন্নিবেশতি হতে পারে। ওখানে থাকতে পারে সকল প্রকল্পের বিবরণ। এমন ব্যবস্থা গড়ে না তোলার ফলে আমরা যেভাবে ডিজিটাল বাংলাদেশ দেখতে চাই সেভাবে তা দেখতে পাইনা।
আমরা যখন বাজেট প্রস্তাবনা পেশ করি তখন সেই অপূর্ণতাটিকে কাটিয়ে ওঠার জন্যই করে থাকি। আসুন দেখা যাক ২০১৫-১৬ সালের বাজেটে কোন কোন বিষয়-এর ওপর গুরুত্ব প্রদান করা উচিত।
১. ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণার ছয় বছরের বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও সরকারের কাজ করার পদ্ধতি এখনও ডিজিটাল হয়নি। জেলা-উপজেলা স্তরে প্রশাসনের কাজে ডিজিটাল ছোয়া লাগলেও বাংলাদেশ সচিবালয় এখনও আগের অবস্থাতেই রয়েছে। বাজেটে সরকারের কাজের পদ্ধতি ডিজিটাল করার জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ থাকতে হবে। এর মানে হচ্ছে সরকারের প্রচলিত কাগজের ফাইলের ব্যবস্থাপনার বদলে ডিজিটাল পদ্ধতিতে কাজ করার ব্যবস্থা করা।
২. ২০০৯ সাল থেকেই সরকার ভূমি ব্যবস্থাকে ডিজিটাইজ করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করে আসছে। কিন্তু কাজটিতে এখনও সফলতা আসেনি। এবারের বাজেটে ভূমি ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল করাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আমরা লক্ষ্য করেছি যে সাম্প্রতিককালে গ্রামাঞ্চলের ভূমি অফিসগুলোতে আগুন লাগানো হয়েছে। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি কাজ। এর ফলে ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা ব্যাপকভাবে বাড়বে। এজন্য বিদ্যমান ভূমি রেকর্ড জরুরি ভিত্তিতে ডিজিটাল করার জন্য এবারের বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ থাকতে হবে।
৩. বাংলাদেশে ৩জি নেটওয়ার্ক চালু হবার পর এখনও গ্রামাঞ্চলে ৩জি নেটওয়ার্ক চালু হয়নি। গ্রামে গ্রামে ৩জি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ থাকতে হবে। অন্যদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। আমি খুব খুশি হবো যদি এই বাজেটে দেশের কোনও কোনও স্থানে ফ্রি ওয়াইফাই স্থাপনের জন্য বরাদ্দ থাকে বা যদি ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের ক্যাবল লাইন স্থাপনের বরাদ্দ থাকে।
৪. দেশের শিক্ষাকে ডিজিটাল করার অঙ্গীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, তার সন্তানেরা ল্যাপটপ নিয়ে যেন স্কুলে যায়। আমি প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা বাস্তবায়নের প্রতিফলন দেখতে চাই। আমি চাই, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্লাশরুম ডিজিটাল করার জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ থাকতে হবে।
৫. দেশের ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি অবধি বাধ্যতামূলক তথ্য প্রযুক্তি শিক্ষা চালু করে যদি কম্পিউটার ল্যাব গড়ে তোলা না হয় তবে এই শিক্ষাব্যবস্থার কোনও দাম থাকবে না। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ থাকতে হবে।
৬. বাধ্যতামূলক তথ্য প্রযুক্তি শিক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে একজন করে কম্পিউটার শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে ও তাকে এমপিওভুক্ত করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ থাকতে হবে।
৭. তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ থাকতে হবে।
৮. শিশু শ্রেণি থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর অবধি সকল পাঠ্য বইয়ের ইন্টারএ্যাকিটিভ মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যার প্রস্তুত করার জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ থাকতে হবে।
৯. কম্পিউটারের ওপর বিদ্যমান শুল্ক ও ভ্যাট অব্যাহতি বহাল রাখতে হবে। কম্পিউটার ও টেলিকম যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে এইচএস কোড ও অন্যান্য জটিলতা নিরসন করতে হবে। মোবাইলের ওপর কোনও করারোপ করা যাবে না- আমদানীতে ব্যাটও থাকতে পারবে না। তবে এটি এমন হতে পারে যে যন্ত্রাংশের জন্য শুল্ক ও ভ্যাট থাকবে না, কিন্তু সম্পূর্ণ প্রস্তুত মোবাইলের ওপর কর ও ভ্যাট থাকবে। এটি কম্পিউটারের ওপরও প্রযোজ্য হতে পারে।
১০. সফটওয়্যার ও আইটি সেবা খাতের কর ও ভ্যাট অব্যাহতি ২০২১ সাল অবধি বাড়াতে হবে।
১১.ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর থেকে শতকরা ১৫ ভাগ মূসক প্রত্যাহার করতে হবে।
১২. সরকারি বেসরকারী উদ্যোগে দেশব্যাপী ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড ধরনের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মেলা আয়োজনে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ থাকতে হবে। এসব মেলায় সরকারি সেবার পাশাপাশি কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার, টেলিকম যন্ত্রপাতি ও সেবা প্রদর্শনের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
১৩. দেশে উৎপাদিত হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের জন্য ইনসেনটিভ দেবার ব্যবস্থা করতে হবে। দেশে উৎপাদিত হয় এমন সফটওয্যারের ওপর উচ্চহারে করারোপ করতে হবে এবং একাউন্টিং, ইআরপি, বাংলা সফটওয্যার ও ব্যাংঙ্কিং সফটওয্যার আমাদানী নিষিদ্ধ করতে হবে। বিসিএস-বেসিস-এর অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের সফটওয্যার আমদানী করা যাবে না।
১৪. যথাযথ মূল্যায়নের পর শিল্পখাতের সাথে আলোচনা করে হাইটেক পার্ক স্থাপনে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিতে হবে। কালিয়াকৈর, জনতা টাওয়ার ও মহাখালী আইটি ভিলেজ স্থাপনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
১৫. বাংলা ভাষার প্রযুক্তিগত উন্নয়নে, যেমন ওসিআর, টেক্সট টু স্পীচ, স্পীচ টু টেক্সট, ব্যাকরণ ও বানান শুদ্ধকরণ, অনুবাদ ইত্যাদি খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ থাকতে হবে। সরকারকে দেশে উৎপাদিত সফটওয্যারের লাইসেন্স কিনতে হবে।
১৬. তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক গবেষণা ও মেধাস্বত্ত্ব সংরক্ষণ খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিতে হবে। কপিরাইট অফিস ও ডিপিডিটিকে একটি আইপি অফিসে রূপান্তরের বরাদ্দ থাকতে হবে।
১৭. ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদেরকে জামানতবিহীন ঋণ সুবিধা দিতে হবে।
১৮. শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতসহ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় থাকে এমন স্বল্পমূল্যে ডিজিটাল যন্ত্র সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।
১৯. ডিজিটাল কমার্সের ওপর কোনও ভ্যাট আরোপ করা যাবে না।
২০. ঢাকার সাথে দেশের অন্য অঞ্চলের ই-১, এনটিটিএন চার্জ সরকারকে বহন করতে হবে এবং দেশের সকল অংশে কানেকটিভিটির দাম একই হতে হবে।
যদিও আমি প্রত্যাশা করি না যে আমার প্রস্তাবনাগুলোর পুরোটা বাস্তবায়িত হবে, তবুও আমি জানি এই প্রস্তাবনাগুলো কেবল আমার নয়-দেশের এই খাতের সকল মানুষেরই দাবি এগুলো।
লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও কলামিস্ট