নায়িকা শাবানার ‘তওবা’ ও আজীবন সম্মাননা!

জব্বার হোসেন
জব্বার হোসেন জব্বার হোসেন , সাংবাদিক, কলামিস্ট
প্রকাশিত: ০৭:০৮ এএম, ২৬ জুলাই ২০১৭

বাংলাদেশের ফিল্ম ইতিহাসে শাবানা মহানায়িকা। নিজেই এক ইতিহাস। দীর্ঘ বছর ধরে অভিনয় করেছেন, নায়িকা হিসেবে জনপ্রিয়তম জায়গাটি ধরে রেখেছেন। তবে আমার খুব দুর্ভাগ্য, শাবানার তেমন কোন ছবি, হলে গিয়ে দেখা হয়নি কখনও। ফিল্ম দর্শক হিসেবে আমি সরয়ার ফারুকী যুগের, ফলে আমি যখন হলে যাওয়া, ফিল্ম বোঝা শুরু করি, শাবানা তার অনেক আগেই অভিনয় ছেড়ে দেন পুরোপুরি। তবে হলে গিয়ে শাবানার অভিনয় দেখার সুযোগ না হলেও, টেলিভিশনে পুরনো ছবির প্রচার সেই সুযোগ এনে দেয় আমাকে। অসাধারণ অভিনয় দক্ষতা। যখন যে চরিত্রে অভিনয় করেন, মনে হয় সেটিই তিনি। অসম্ভব রকমের মেধাবী আর জাত শিল্পী না হলে এমনটি হওয়া সম্ভব নয়। শাবানার অভিনয় দেখি আর বিস্মিত হই, কত বড় মাপের শিল্পী তিনি।

ফিল্ম দুনিয়ার খবর খুব একটা রাখা হয় না আমার। তারপরও ভেতরে ভেতরে একটা চাপা কৌতূহল। শাবানা ছবি ছেড়েদিলেন কেন? ফ্লপ হচ্ছিল? দর্শক নিচ্ছিল না তাকে? জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ছিল? কৌতূহল আর জিজ্ঞাসার কোন উত্তরই হ্যাঁ বোধক নয়। বরং আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে সকল প্রশ্নের না বোধক উত্তর খুঁজে পাই। খুব বিস্মিত হই আরো জেনে যে, জনপ্রিয়তা তো কমেইনি বরং এসএস প্রোডাকশন নামে একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের মালিকানাও ছিল তাদের পারিবারিক ভাবে। নাম, যশ, খ্যাতি, প্রতিপত্তি এক জীবনে যা কিছু অর্জন করেছেন তিনি ও তার পরিবার, তার সবটুকুই অভিনয় আর চলচ্চিত্রের কারণে।

আমার বিস্ময়ের সকল ঘোর কাটে তখন, যখন তাকে পারিবারিকভাবে চেনেন এমন কিছু মানুষের কাছে জানতে পারি, তিনি কেবল অভিনয়ই ছাড়েননি, রীতিমত ‘তওবা’ করেছেন। হ্যাঁ, ‘তওবা’ করেছেন শাবানা, ১৯৯৭ সালে অভিনয় ছেড়েছেন। শোনা যায়, তার আমেরিকা প্রবাসী মেয়েকে কিছুতেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন তিনি মনে মনে মানত করেন, মেয়েকে যদি ফিরে পান, তাহলে জীবনে আর কখনও অভিনয় করবেন না। মেয়েকে ফিরে পেয়ে তিনি অভিনয়, চলচ্চিত্র এবং দেশ-তিনই ছাড়েন। স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন আমেরিকায়।

shabana

একজন শিল্পী অভিনয় ছাড়তেই পারেন। এটি তার ব্যক্তিগত অভিপ্রায় ও অধিকার। কিন্তু ‘তওবা’ করার বিষয়টিতে আমার কিছু প্রশ্ন রয়েছে। তওবা একটি ধর্মীয় বিধান। একজন মুসলিম হওয়ার কারণে আমি জানি যে, কোন ব্যক্তি যদি অন্যায় অপরাধ করে, পাপাচারে লিপ্ত হয়, সে যদি একাগ্রচিত্তে, নিবেদিত হয়ে আল্লাহ’র কাছে ক্ষমা চান যে, তিনি এই কাজ আর কখনও করবেন না, তিনি তওবা করেছেন, তখন তার সেই পাপের জন্য যে গুনাহসমূহ হয়েছে তা ক্ষমা করে দেয়া হয়। কিংবা স্রষ্টা চাইলে তার যে কোন গুনাহ ক্ষমা করে দিতে পারেন। এটাই ধর্মীয় বিধান, রীতি। শাবানা কি তবে পাপ করেছেন? দীর্ঘ জীবন তিনি যে অভিনয় করেছেন, তা কি তিনি পাপাচার বলে ভেবেছেন? যদি তা-ই না হয়, পাপাচার ও গর্হিত অন্যায় বলে না ভেবে থাকেন, তাহলে ‘তওবা’র প্রসঙ্গটি আসবে কেন? তওবা আসবে তখনই একমাত্র, যখন তিনি তা গুনাহ হিসেবে ভাববেন।

শাবানা অসম্ভব বড় শিল্পী। কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি, তার ভেতরে শিল্প নেই। অভিনয় যে শিল্প তা তিনি কখনও মনে করেননি, ভাবেননি শিল্প বলেও। তার যেমন শিল্পের প্রতি সম্মান নেই, তেমনি নেই নিজের প্রতিও। যদি থাকতো, শিল্পী বলে ভাবতো নিজেকে, তাহলে দীর্ঘদিনের যে পেশা তার, তাকে অসম্মান করতে পারতেন না। কত দরিদ্র শিল্পী আছেন যারা আজীবন অভিনয়কে শিল্প ভেবে সাধনা করে গেছেন। শাবানা অভিনয় কে দেখেছেন নেহাত টাকা উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে। তিনিও অশিক্ষিত লোকের মতো, অনগ্রসর মানুষদের মতো, ধর্মান্ধদের মতো ভেবেছেন । ভেবেছেন অন্যের চরিত্রের অনুকরণ করছি এখানে আর শিল্পের কি আছে? পরপুরুষের সঙ্গে নাচগান করছি, প্রেম করছি, ঝগড়ায়-আবেগে জড়াচ্ছি- এ আর এমন কী মহৎ কাজ? শাবানা হয়তো জানেন না, শিল্প হচ্ছে জীবনের অনুকরণ। ইমিটেশন অব লাইফ। এই যে অন্যের জীবন, জীবনের সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনা তা অনুকরণের মাধ্যমে তুলে ধরা এক বিরাট মহৎ শিল্প। সে কারণেই অন্যের জীবনের রূপদানকে অভিনয় শিল্প বলা হয়।

আমরা মনে করি, কেউ অভিনয় করলে, গান গাইলে, ছবি আঁকলে বা লেখালেখি করলে সে অগ্রসর মানুষ। সে আধুনিক। সে উদার, উন্নত চিন্তার অধিকারী। তা কিন্তু নয় সবসময়। আধুনিকতা, উদারতা, অগ্রসরতা মনের ব্যাপার, চিন্তার ব্যাপার। চিন্তার অসারতা মুক্ত না হলে, যুক্তিপ্রবণ না হলে, বিজ্ঞানমনস্ক না হলে তাতে আধুনিকতা বা প্রগতিশীলতার কিছু নেই। শাবানা বাণিজ্যিকভাবে সফল একজন অভিনেতা, শিল্পী নন কখনই।

প্রায় কুড়ি বছর পর শাবানা দেশে ফিরেছেন। ফিরেছেন তার পরিচিত পরিসরে। তার প্রযোজক স্বামী ওয়াহিদ সাদিক আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে চান। যশোর-৬ আসনে ইতিমধ্যে প্রচারণাও চালাচ্ছেন। শাবানা ও তার স্বামীর অর্থায়নে কেশবপুরে মসজিদ উদ্বোধন করা হয়েছে। সঙ্গে মক্তবও। শাবানা এখন ধর্মের কথা বলছেন, রাজনৈতিক কারণে। তিনি কেবল বুদ্ধিমান নন, চতুর ও হিসেবিও। তার যে অর্থের উৎস, যার কারণে আজ তিনি শাবানা তা সে ‘অভিনয়ই’, যা তিনি ‘তওবা’ করে ছেড়েছিলেন।

দেশে এসেই শাবানা চলচ্চিত্রে তার দীর্ঘদিনের অবদানের জন্য, রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘আজীবন সম্মাননা’ পদক পেয়েছেন। পদকটি হাতে নেয়ার সময় একবারও কী ভেবেছেন, এই অভিনয় ছাড়বার জন্যই ‘তওবা’ করেছিলেন তিনি।
সত্যিই শাবানা অনেক বড় অভিনেত্রী!

এইচআর/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।