মানুষ যেন কোরবানি না হয়
ন্যায্যমূল্যে গরু কেনা যাবে তো? এমন একটা সন্দেহ কোরবানির ঈদের আগে অনেকেরই থাকে। আবার কেউ ধরেই নেয়—কোরবানির পশুর দাম অনেকটা লটারির মতো। ভাগ্য ভালো হলে কম দামে পাওয়া যেতে পারে পছন্দের গরু, না হলে পকেট ফাঁকাও হয়ে যেতে পারে। দাম যাই হোক, তারপরও যারা কোরবানি দেন তাদের তৃপ্তি থাকে আল্লাহর নামে কোরবানি দিতে পেরে।
কিন্তু এবার গরুর খামারিদের অবস্থা ভিন্ন। তাদের উদ্বেগ খরচ পোষানো যাবে তো, বছর ধরে লালন-পালন করা গরু বিক্রি করে? তাদের ভয়ের কারণ চোরাই পথে আসা ভারতীয় গরু। সারাবছর উচ্চমূল্যে গরুর খাবার কিনে, পরিশ্রম করে তারা গরু-ছাগল রেডি করেছে এই ঈদে দুটি পয়সা পাওয়ার আশায়। কিন্তু তাদের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে চোরাই পথে আসা গরু। সরকারও বিষয়টি অবগত আছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ সম্প্রতি বলেছেন, তারা বিজিবির সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠক করেছেন, যাতে সীমান্ত পথে ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু প্রবেশ না করতে পারে। মন্ত্রীর আশ্বাস বাণী যখন সংবাদ আকারে প্রকাশ হয়েছে, তখনও গণমাধ্যমে সংবাদ হয়েছে- ময়মনসিংহ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত এলাকায় চোরাচালানিরা অবৈধ পথে গরু আনছে। সীমান্ত পথে অবৈধভাবে গরু আসা বন্ধ না হলে দেশের খামারিদের সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে। সাম্প্রতিক ইতিহাসও তেমনই ইঙ্গিত দেয়।
প্রতি বছর এভাবে ভারত ও মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে গরু আসে প্রায় ১০ লাখ। এবারও যদি সেই পরিমাণ গরু আসে, তাহলে গরুর বাজার এতটাই কমে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে যে খামারিদের গরু বিক্রি করতে হবে তাদের উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে অনেক কম দামে। অবশ্য এই বছর দেশে কোরবানির পশুর চাহিদা গত কয়েক বছরের মধ্যে বেশি। গত বছর মূল্যস্ফীতির কারণে তার আগের বছরের তুলনায় অনেক কম চাহিদা ছিল। ২০১৫ সাল থেকেই কোরবানির পশুর চাহিদা বাড়তে থাকে। ওই সময় যেখানে পুরো দেশে কোরবানির পশুর চাহিদা ছিল মাত্র ৮৫–৮৬ লাখ, সেখানে ২০২৪ সালে তা দাঁড়িয়েছিল ১ কোটির বেশি। ২০২৫-এ কিছুটা কমেছিল মূল্যস্ফীতির কারণে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, এ বছর পশুর চাহিদা ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি; কিন্তু উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। চাহিদার চেয়ে বেশি সরবরাহের উপযোগী পশু থাকার কারণে খামারিদের লোকসানের আশঙ্কা এমনিতেই ছিল। এর পর যদি সীমান্ত পথে চোরাই হয়ে আরও অন্তত ১০ লাখ গরু আসে, তাহলে বাজারে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে- তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বছরের এই উৎসব ঘিরে যে বড় একটি অর্থনৈতিক যজ্ঞ চলে, এর পেছনে সরকারি নজর খুব একটা চোখে পড়ে না। যেটুকু নজরদারি তা উৎপাদন বৃদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু পারিপার্শ্বিক প্রস্তুতি এবং সেবাদানের বিষয়টি একেবারেই অবহেলিত। বিপণন ব্যবস্থা পুরোই উৎপাদনকারীদের দায়িত্বভুক্ত। সরকার গরুর হাটগুলো থেকে ইজারা বাবদ কোটি কোটি টাকা আদায় করেই দায়িত্ব শেষ করে।
এই পর্যন্ত কোরবানির পশুর হাটের অবস্থা সহনীয় বলেই জানা গেছে। ঈদের আগের এই কয়েকদিনে কী অবস্থা তৈরি হয় তা দেখার বিষয়। তবে মূল্যস্ফীতির কারণে এবার অনেকেই ভাগে কোরবানি দেবে, যে কারণে হয়তো দু-এক লাখ পশু কম প্রয়োজন হতে পারে। সেক্ষেত্রে খামারিদের লোকসানের সম্ভাবনা আরও বেড়ে যাবে। এই মুহূর্তে তাদের ক্ষতি কমিয়ে আনার উপায় হচ্ছে চোরাচালানি বন্ধ করে দেওয়া।
এই কোরবানির পশুর আর্থিক বলয়ের মধ্যে বাংলাদেশের অন্যতম শিল্পখাত ট্যানারি ব্যবসাও জড়িত। এখানেও চলছে চরম অব্যবস্থাপনা। অথচ বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে চামড়া শিল্প বিশাল অবদান রেখে চলেছে। প্রক্রিয়াজাত চামড়া, চামড়ার জুতা, জ্যাকেট, ব্যাগ ও বেল্ট ইত্যাদি পণ্য ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার প্রায় ৫৩টি দেশে রপ্তানি করে বার্ষিক প্রায় ১১৪ কোটি ডলার আয় করে।
চামড়া শিল্পে দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনার কারণে কাঁচা চামড়ার মূল্য অস্বাভাবিক কম। যার কুপ্রভাব পড়েছে পশুর প্রকৃত মূল্যে। সরকার চামড়ার মূল্য এ বছর প্রতি বর্গফুটে বাড়িয়েছে ২ টাকা। বাস্তবতা হচ্ছে, কোরবানির পশুর চামড়া বিনামূল্যে দান করে দিতেও দেখা যায় সাধারণ মানুষকে। এতিমখানা ও মাদরাসাগুলো সেগুলো নিয়ে বিক্রি করেও খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না। যদিও এই চামড়া দিয়ে তৈরি জুতা কিনতে হয় ৪-৫ হাজার টাকায়। এই অব্যবস্থাপনার প্রভাব পশুর দামেও পড়েছে।
এটুকু পড়ে মনে হতে পারে, বাজারে গরুর মাংসের দাম হয়তো খুবই কম। এখানেও শুভংকরের ফাঁকি। সাধারণ ক্রেতা কিন্তু কম দামে মাংস কিনতে পারছে না। কেন পারছে না, এটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। তবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এই পশুসম্পদ বড় অবদান রাখার পরও সরকারি ভূমিকা অপ্রাসঙ্গিক নয়।
দেশের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব থেকে মুক্তি পেতে দেশের তরুণদের বড় একটি অংশ এখন পশুপালনের দিকে ঝুঁকেছে। ক্ষেত্রবিশেষে প্রাণিসম্পদ বিভাগ তাদের উৎপাদন বৃদ্ধিতে পরামর্শক হিসেবে কাজও করে থাকে। কিন্তু সরকারের সহযোগিতা কতটা বাস্তবসম্মত তা প্রশ্নাতীত নয়।
যেমন সরকারি তথ্য অনুযায়ীই দেশে চাহিদার চেয়ে ২২ লাখেরও বেশি পশু উৎপাদন হয়েছে, সেখানে সরকার এই উদ্বৃত্ত পশু বিষয়ে কী পদক্ষেপ নিয়েছে? গুঁদের ওপর বিষ ফোঁড়া—চোরাচালানি বন্ধে কি নিশ্চয়তা দিতে পারছে সরকার? এখানে দুটি দিক লক্ষণীয়। প্রথমটি হচ্ছে উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় খামারিদের পরামর্শ ও সহযোগিতা। বলতে দ্বিধা নেই, সুষ্ঠু বিপণন ব্যবস্থা কিংবা উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় কোনো নজর দেওয়া হয় না। তেমনি সবকিছু জানা সত্ত্বেও চোরাচালানি বন্ধ হয় না। এবং চোরাচালান বন্ধ না হওয়ার কারণে কোনো জবাবদিহিতাও নেই।
চোরাচালান বন্ধে সীমান্তরক্ষীদের দায়দায়িত্ব আছে, যা পরিচালিত হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে। পশুসম্পদ বিভাগ উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করতে পারে। যে মুহূর্তে দেখা গেল উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি হচ্ছে, তখনই তাদের জানার কথা—উৎপাদনকারী লোকসানের মুখে পড়বে এবং এতে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অথচ খামারিকে দুধ উৎপাদনে সমান মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ ও সহযোগিতা করতে পারত পশুসম্পদ বিভাগ। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে কোনো খামারি লোকসানের মুখে পড়ত না।
আমার জানা গাজীপুরের এক ক্ষুদ্র খামারি কয়েক বছর আগে শুধু কোরবানির গরু পালন করতেন। দুই বছর ধরে তাকে দেখা গেল শখের কারণে কয়েকটি গরু কোরবানির জন্য রেখে পুরো খামার তিনি দুধের গাভিতে রূপান্তর করে ফেলেছেন। আসলে পশু উৎপাদন বাড়ানোই শুধু নয়, ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও এখানে জড়িত। স্থানীয় পশুসম্পদ বিভাগ সেদিকে নজর দেয় না বলেই মনে হয়।
এই পর্যন্ত কোরবানির পশুর হাটের অবস্থা সহনীয় বলেই জানা গেছে। ঈদের আগের এই কয়েকদিনে কী অবস্থা তৈরি হয় তা দেখার বিষয়। তবে মূল্যস্ফীতির কারণে এবার অনেকেই ভাগে কোরবানি দেবে, যে কারণে হয়তো দু-এক লাখ পশু কম প্রয়োজন হতে পারে। সেক্ষেত্রে খামারিদের লোকসানের সম্ভাবনা আরও বেড়ে যাবে। এই মুহূর্তে তাদের ক্ষতি কমিয়ে আনার উপায় হচ্ছে চোরাচালানি বন্ধ করে দেওয়া। সেজন্য প্রয়োজনে প্রতিবেশী ভারতের সীমান্তরক্ষীদের সঙ্গে আলোচনা ও সহযোগিতা চাওয়া যেতে পারে, যাতে ভারত থেকে গরু আসা বন্ধ হয়ে যায়। না হলে খামারিদের দুর্দিন শুধু বাড়বেই। অনেককেই হয়তো ব্যবসাও গুটিয়ে নিতে হতে পারে। এমনটা কারও কাম্য নয়।
লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক।
এমএফএ/এইচআর/জেআইএম