ভূস্বর্গের গতি কি নরকের দিকে

মোস্তফা হোসেইন
মোস্তফা হোসেইন মোস্তফা হোসেইন
প্রকাশিত: ০৯:৫২ এএম, ১১ আগস্ট ২০১৯

হাত-পা বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়া মানুষের মতো এখন কাশ্মীরের জনগণ। ৫ আগস্টের পর থেকে এই নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত সেখানকার জনজীবন বিপর্যস্ত। মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছে না- কারণ টানা সান্ধ্য আইন। আতঙ্কিত তারা। ঘরে চালডাল শেষ। দোকানে যেতে পারছে না। বাহিরে জানাতে পারছে না নিজেদের অবস্থা, বহির্জগতের সঙ্গে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে। যোগাযোগ ব্যবস্থা সব বন্ধ করে দেয়া হয়েছে কাশ্মীরের সঙ্গে। ইন্টারনেট সুবিধা, মোবাইল ও ল্যান্ডফোন সুবিধাও সব বাতিল করা হয়েছে। মানুষ জরুরি প্রয়োজনে এটিএম থেকে টাকা উত্তোলন করবে সেই সুবিধাও নেই আর। চরম আতঙ্কের মধ্যে তাদের দিন কাটছে। রাস্তায় রাস্তায় পুলিশি ব্যারিকেড, বন্দুকের ব্যবহার সবই চলছে। এর মধ্যেও চলছে প্রতিবাদ। সরকারি বাহিনীর গুলিতে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। পুলিশি অ্যাকসনের খবর বন্ধ করার চেষ্টার পরও বাইরের দুনিয়ায় যেতে শুরু করেছে ওখানকার প্রতিবাদী মানুষের খবর। কাশ্মীরিদের স্বাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের খবর। এই পরিস্থিতির উদ্ভব হলো কেন?

তাদের এই বিপদের ট্রিগার ভারত সরকারের কাছে। সেই ট্রিগারটিতেই চাপ দিয়েছে তারা, সংবিধান থেকে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করার মাধ্যমে। ভারত ভাগের সময় ১৯৪৭ সালে জম্মু ও কাশ্মীর আলাদা রাষ্ট্র হিসেবেই নিজেদের চিন্তা করছিল। কিন্তু তৎকালীন কাশ্মীরের রাজা হরি সিং নিরাপদ মনে করছিলেন না বিধায়, নিজেদের স্বকীয়তা রক্ষা করেই ভারতের সঙ্গে শর্তসাপেক্ষে যুক্ত হন। শর্তগুলো এমনভাবেই রচিত হয়েছিল যাতে কাশ্মীরের নিরাপত্তা সহায়ক হিসেবেই ছিল ভারতের অবস্থান। তাদের নিজস্ব পতাকা থেকে শুরু করে নাগরিকত্ব আইন, নিজেদের নাগরিকদের ভারতীয়দের থেকে আলাদা করার জন্য কাশ্মীরে ভারতীয় কোনো নাগরিকের স্থাবর সম্পদ ক্রয় নিয়মবহির্ভূত করা, বিয়ে সাদিতেও পরোক্ষ প্রতিবন্ধকতা ছিল। হরি সিং কাশ্মীরকে স্বাধীনরাষ্ট্র হিসেবে স্থায়ী করতে না পারলেও ভারত থেকে আলাদা থাকার চেষ্টা করেছিলেন। আর সেটা নিশ্চিত হয়েছিল ভারতীয় সংবিধানে ৩৭০ অনুচ্ছেদ যুক্ত করার মাধ্যমে।

হরি সিং ভুল কি শুদ্ধ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সেটা গবেষণার বিষয়। তিনি নিজের ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য বিশেষ করে কাশ্মীরে অবস্থানকারী পাকিস্তানি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ভারতের কাছে ধরনা দিয়েছিলেন। তবে তখন যেটুকু স্বাধীনতা তাদের ছিল ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর সেটাও হারালো তারা। এখন শতভাগ ভারতীয় নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে তারা। এখন ভারতের যেকোনো রাজ্যের মানুষ সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস, জমি ক্রয় করে বাড়িঘর নির্মাণ করতে পারবে। আর এর ফলে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানিদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য হরি সিং যেভাবে ভারতের সমর্থন চেয়েছিলেন সেই রক্ষাটা আর হলো না। হরি সিং তখন মনে করেছিলেন পাকিস্তানিরা কাশ্মীর দখল করে নিতে পারে, আজকে বিনাযুদ্ধে ভারত তাদের ভূখণ্ডকে করায়ত্ব করে নিল। এখন তাদের পতাকা থাকবে না শুধু তাই নয়, তাদের নিজেদের বলতে আর কিছুই থাকবে না।

ভারতীয় জনতা পার্টির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভারত এই পদক্ষেপ নিয়েছে। তাদের বক্তব্য ছিল- সেখানে জঙ্গিগোষ্ঠী বিচ্ছিন্নতাবাদে উদ্বুদ্ধ করেছে সেখানকার মানুষকে। বিচ্ছিন্নতাবাদকে দমনের জন্য তাদের জন্য এটাই হচ্ছে প্রধান অস্ত্র। প্রশ্ন হচ্ছে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে তাদের জোর করে কি স্বাধীকারের ইচ্ছাকে দমন করা যাবে? ইতিহাস কিন্তু অন্য কথা বলে- তারা পাকিস্তানিদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই ভারতের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। তাদের স্বাধীনতাকে বাতিল করে সেটা ছিল না।

আজকে যখন ভারত ক্ষমতাবলে পার্লামেন্টে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল, তখন কি বিচ্ছিন্নতাবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে না? এর পরিণতি যে কী হতে পারে তার ইঙ্গিত পাওয়া যায় ভারতীয় কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধীর টুইট বার্তায়। তিনি লিখেছেন, ‘সংবিধান লঙ্ঘন করে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জেলে পুরে ও জম্মু ও কাশ্মীরকে দ্বিখণ্ডিত করে জাতীয় সংহতিকে শক্তিশালী করা যায় না। শুধু কিছু জমির খণ্ড দেশকে গড়ে তোলেনি, দেশ গড়ে তুলেছেন দেশের নাগরিকরাই। প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার দেশের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক।’

রাহুল গান্ধীর উক্তিতে নাগরিক, সংবিধান ও ক্ষমতার অপব্যবহার এই তিনটি শব্দই আশঙ্কার কথা বলে দেয়, কাশ্মীর ইস্যুটি ভবিষ্যতে অন্ধকারের দিকে যাবে নাকি মোদি সরকারকে শেষ হাসি হাসতে সাহায্য করবে?

২০১৬ সালের আগস্ট থেকেই সেখানে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়। ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী জনগণের মুখোমুখি অবস্থান নেয়। অসংখ্য মানুষকে প্রাণ হারাতে হয় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে। অন্যদিকে কাশ্মীরের বিদ্রোহী গোষ্ঠী সেনাছাউনিতে অতর্কিত হামলা করার পাশাপাশি গুলিবর্ষণকারী নিরাপত্তাবাহিনীর বিরুদ্ধেও লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। এটাকে যতই পাকিস্তানিদের উসকানি বলে আখ্যায়িত করা হোক না কেন, কাশ্মীরিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের আকাঙ্ক্ষাটাই যে মুখ্য তা কিন্তু বলার অপেক্ষা রাখে না।

১৯৮৯ থেকে কাশ্মীরের মানুষ সরকারের বিরোধিতাকারী হিসেবে গণতান্ত্রিক পথে নেই, তারা সরাসরি ভারত রাষ্ট্রের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে সশস্ত্র আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। এই সংকট কি বাইরের কেউ তৈরি করে দিতে পারে? অবশ্য এক্ষেত্রে পাকিস্তানিরা যে ধোঁয়া তুলসি পাতা সেটাও বলা যাবে না। কিন্তু তারা ওখানকার মানুষকে সহযোগিতা করলেও তাদের চাহিদা এবং সমর্থনের কারণেই করতে পেরেছে। আর ওখানকার জনগণকে পাকিস্তানিদের পক্ষে না যেতে যে প্রণোদনা দেয়া দরকার সেটা কি ভারত সরকার দিয়েছিল? কাশ্মীরিদের তো তারা গত প্রায় ৭০ বছর ধরে শাসন করে চলেছে। দীর্ঘ সময়ের মধ্যে কাশ্মীরের জনগণের মধ্যে এই আস্থা তৈরি করতে পারেনি তারা যে, কাশ্মীর ভারতের অংশ এবং কাশ্মীরিরা ভারতীয়ও বটে। ভারতীয়রা কি এমন আস্থা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে যে, কাশ্মীরের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার কেড়ে নেয়ার কোনো উদ্দেশ্য ভারতের নেই। বাস্তবতা হচ্ছে তারা পারেনি। এই ব্যর্থতার সুযোগ যদি জঙ্গিরাষ্ট্র পাকিস্তান গ্রহণ করে থাকে, তাতে কি অবাক হওয়ার কিছু আছে? আজকে কাশ্মীরের আন্দোলন যে ধারায় মোড় নিয়েছে, অর্থাৎ ওই আন্দোলন যে ইসলামীকরণ হয়েছে সেটা হওয়ার পেছনেও তো ভারত সরকারেরই ব্যর্থতাই প্রধান।

আইএসের মতো সভ্যতাবিরোধী সংগঠনের পতাকা এখন কাশ্মীরের মাটিতে চোখে পড়ে। ভারতীয় সৈন্যরা সেই পতাকাকে বুলেটবিদ্ধ করতে পারে কিন্তু এই পতাকায় উদ্বুদ্ধ হয়ে যে জনগোষ্ঠী বিপথগামী হয়েছে, তাদের মনের কথাগুলো জানার চেষ্টা কি কখনও করেছে ভারত? নাকি তারা মনে করেছে কাশ্মীর তাদের করদরাজ্য হিসেবে চিরদিনই থেকে যাবে?

হয়তো কাশ্মীর এই মুহূর্তেই আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ফিরে পাবে না। কিন্তু কাশ্মীরিদের দাস বানিয়ে রাখার চেষ্টার ফলটা যে শুভ হবে না তাও মনে হচ্ছে। হয়তো ওখানে ইয়াসির আরাফাতের মতো কোনো নেতা নেই। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের মধ্যে যে স্বাধীনতার অদম্য বাসনা আছে, কাশ্মীরিদের মধ্যেও তাই আছে। আর সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে তারা পাকিস্তানের মতো উগ্র সাম্প্রদায়িক দেশের কাছে ধরনা দিতেও দ্বিধা করবে না। হরি সিং যে পাকিস্তানি আগ্রাসন থেকে বাঁচার জন্য ভারতীয়দের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন আজকের কাশ্মীর কি উল্টো দিকেই যাবে না?

সেক্ষেত্রে ভারতের সামনে জটিল সমস্যাই অপেক্ষা করছে। পাকিস্তানিরা আগেই বুঝেছে তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে যুদ্ধ করে সুবিধা করতে পারবে না। তাই তারা জঙ্গি জন্ম দিয়ে শত্রুর ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছে। এ কাজে তারা মোটামুটি দক্ষতার প্রমাণও দিয়েছে। জঙ্গিরা কিন্তু কাশ্মীর সীমান্তকেই তাদের সীমান্ত ভাবে না। ভারত সীমান্ত পেরিয়ে যে পাকিস্তানি জঙ্গিরা বাংলাদেশেও ঢুকে যায়, সেই জঙ্গিরা কি কাশ্মীরকে ভূস্বর্গ হিসেবেই টিকিয়ে রাখবে? যুদ্ধে পাকিস্তান পারদর্শী না হলেও জঙ্গিপনায় যে ভারতের চেয়ে কয়েকগুণ এগিয়ে তা সবার জানা। ফলে এই মুহূর্তে ভারতের সামনে পাকিস্তান, কাশ্মীর, জঙ্গি সর্বোপরি বুলেটও সংকট হিসেবেই দেখা দেবে।

কিন্তু ভারত তার নিজস্ব সুনামকে কেন কাজে লাগাচ্ছে না তাও বোধগম্য নয়। পৃথিবীর সেরা গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে খ্যাতি আছে তাদের। তারা সংবিধানকে ক্ষমতার জোরে পরিবর্তন না করে কাশ্মীরে গণভোটের আয়োজন করতে পারতো। তাদের নিজেদের ইচ্ছাকে বাস্তবায়ন করতে পারতো। এখনও তা করতে পারে। ভারত সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী কিছু পথভ্রষ্ট মানুষ কাশ্মীরে অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছে, বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের জড়িতদের সংখ্যা খুবই কম। তাদের বক্তব্য যদি ঠিক হয়ে থাকে, তাহলে গণভোট দিতে তাদের আপত্তি থাকার কথা নয়। কাশ্মীরের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের অধিকার সেখানকার মানুষের ওপর ছেড়ে দিলে ভারত গণতান্ত্রিক দেশের মধ্যে শীর্ষ স্থানটিই দখল করতে পারবে। সেদিকেই কি যাওয়া উচিত নয়?

লেখক- সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।

বিএ/পিআর

আপনার মতামত লিখুন :