শিক্ষাকেন্দ্রে আচরণবিধি ও একটি চলচ্চিত্রের কথা

তানজীনা ইয়াসমিন
তানজীনা ইয়াসমিন তানজীনা ইয়াসমিন , কলামিস্ট, গবেষক
প্রকাশিত: ১০:০০ এএম, ১৮ মার্চ ২০২১

২০১১ এর অক্টোবর। ৪০ লক্ষ কোরিয়ান নাগরিক ক্ষোভে উন্মাতাল। তাঁদের একতাবদ্ধ দাবিতে পার্লামেন্ট নতুন আইন পাস করলো গুরু পাপের লঘু শাস্তি মোচনে। বিলুপ্ত হলো অপ্রাপ্তবয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধের সীমাবদ্ধ শাস্তির বিধি। এই স্ফুলিঙ্গ জ্বালাতে সক্ষম হয়েছিল এর মাত্র এক মাস আগে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি চলচ্চিত্র , “সাইলেন্সড” এবং এই চলচ্চিত্র যার অবলম্বনে, অর্থাৎ নেপথ্যের সেই ভয়ানক সত্য ঘটনা।

ছবিটির গল্প ছিল শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের স্কুলে নবনিযক্ত একজন আর্টের শিক্ষককে ঘিরে। স্কুলে ঢুকেই সে আঁচ করে কিছু অস্বাভাবিক ভারী বাতাস, কিছু চাপা আশঙ্কার বোবা গুনগুন। তাঁর নিজেরো ছিল বেদনাময় অতীত। এক বছর আগে স্ত্রী তাঁর আত্মহত্যা করেছে, মায়ের কাছে রেখে এসেছে একমাত্র সন্তান অসুস্থ কন্যাকে। ভাঙ্গা মনকে জোড়া দিয়েই নতুন শহরের চাকরিতে সে এই প্রতিবন্ধী শিশুদের ভালোবাসা দিতে চায়। কিন্তু শিশুগুলো যেন কি নিয়ে আতংকিত, কেবলি কুঁকড়ে থাকে। শিক্ষক কাং ইন শুধু তাঁদের জন্য ভাবেন তা দেখানোতেই তাঁর দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখেন না, তিনি পা বাড়ান এই কুঁকড়ে থাকার রহস্য ভেদে। এবং তাঁর এই জেদের হাত ধরেই গর্ত খুঁড়ে বেরিয়ে আসে কাল কেউটেরা আর তাঁদের ব্যাপক যৌন নির্যাতনসহ জঘন্য নারকীয় কর্মকাণ্ড , যার প্রতিবাদ করার সাহস বাক প্রতিবন্ধী শিশুগুলোর কোনোদিন হয়নি। জবানের মতই তাদের আত্মাও কব্জা করেছিল মূক ও বধিরতা।

দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই অন্ধকারটি আলোকপাত করানোতে প্রধান ভাগের কৃতিত্ব লেখক গোং জি ইয়ং এর। দক্ষিণ কোরিয়ার সেরা স্কুল হিসেবে পুরষ্কৃত “গওয়াংজু ইনহওয়া” বিদ্যালয়ের ভয়াবহ অপকর্ম নিয়ে মুখোশ উন্মোচনকারী তাঁর বই “দ্য ক্রুসিবল” লিখেই তিনি তাঁর কলমের ক্ষমতার সর্বোচ্চ সুবিচার করেন। আর চলচ্চিত্রটির নির্মাতা এই গল্প অবলম্বনে অনবদ্য এক চলচ্চিত্র নির্মাণ করে তা তুলে ধরেন দক্ষিণ কোরিয়ার আপামর জনতার নজরে।

অতঃপর এই ফিল্মটি আদালতের সুষ্ঠু রায় নিয়ে জনগণের ভেতরে মুহূর্তে দাবানল ছড়িয়ে দেয়। পুলিশ প্রশাসনকে মামলাটি পুনরায় উত্থাপন করতে এবং আইনজীবীদেরকে দুর্বলদের মানবাধিকার আইন পরিবর্তনে নতুন বিল প্রবর্তন করতে প্ররোচিত করে। “গওয়াংজু ইনহওয়া” বিদ্যালয়ের ছয় শিক্ষকের মধ্যে পূর্বে সীমাবদ্ধতার আইনের আওতায় শাস্তি থেকে বেঁচে যাওয়া চারজনকে শিক্ষা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গুরুতর শাস্তির সুপারিশ করা হয়।

উল্লেখ্য, এদের মধ্যে দু'জনই এর আগে আটজন তরুণ ছাত্রীকে বারবার ধর্ষণের জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়েও মাত্র এক বছরেরও কম সময়ের জেল পেয়েছিল। আমলে নেয়া হয় স্কুলটির ৭১ বছর বয়সী প্রাক্তন শিক্ষক কিম ইয়াং-ইল এর দাবি , যিনি তাঁর শিক্ষকতাকালে , সেই ১৯৬৮ সনে নিপীড়নে মারা যাওয়া দুটি শিশুর ঘটনা নিয়ে সোচ্চার হওয়ায় তাঁকে কর্তৃপক্ষ মারধর করে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য করে।

চলচ্চিত্রটি প্রকাশের সাথে সাথেই তুমুল বিতর্কিত হওয়ার দু'মাস পরে গোয়াংজু সিটি ২০১১ সালের নভেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে স্কুলটি বন্ধ করে দেয়। ২০১২ সালের জুলাইয়ে, গোয়াংজু জেলা আদালত এপ্রিল ২০০৫ সালে ১৮ বছরের এক ছাত্রকে যৌন নির্যাতনের জন্য গোয়াংজু ইনহওয়া স্কুলের ৬৩ বছর বয়সী প্রাক্তন প্রশাসককে ১২ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। তার বিরুদ্ধে ১৭ বছর বয়সী প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীকে হত্যা প্রচেষ্টার অভিযোগও ছিল। কিম নামক সেই প্রশাসককে আদালত মুক্তি দেবার পরেও ১০ বছর একটি বৈদ্যুতিক অ্যাঙ্কলেট পরে থাকার আদেশ জারি করে।

এবং অবশেষে ২০১১ সালে কোরিয়ান জাতীয় পরিষদ ১৩ বছরের কম বয়সী এবং প্রতিবন্ধীদের ওপর যৌন নির্যাতনের সীমাবদ্ধতার যে কোনও বিধিমালা সরিয়ে "দোগানী ( মূল চলচ্চিত্রের কোরিয়ান নামে , অর্থ, ক্রুসিবল / অগ্নিপরীক্ষা) আইন" পাস করেছে। এই আইনের সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং এতে ক্ষতিগ্রস্তরা প্রমাণ করতে পারে যে তারা তাদের অক্ষমতার কারণে তারা "প্রতিরোধ করতে অক্ষম" ছিল। বলা বাহুল্য, সচেতন পাঠক মাত্রেই বুঝতে পারছেন, কেন আজ ধান ভানতে এই কোরিয়ান গীত।

আমাদের বিদ্যাপীঠে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের উপর সহিংসতা, যেটা সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের ভেতরেও থেমে নেই, যেই কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকেছিল বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার হত্যাকাণ্ড , মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত হত্যাকাণ্ড এবং সম্প্রতি আবাসিক মাদ্রাসার হেফজখানার দশ বছরের শিশু তওহীদুলের নির্মম হত্যাকাণ্ড।

অবকাঠামোগত কারণেই আমাদের দেশের আবাসিক মাদ্রাসায় এই নির্মমতার চর্চা অতি পর্যায়ে। কারণ সেখানে শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে একেবারে নিম্নবিত্ত ঘরের, অনেক শিশুই এতিম এবং যাদের অভিভাবকও আছে তারাও স্বল্পশিক্ষিত এবং সামাজিক অর্থনৈতিক ঝুঁকিমূলক অবস্থানের কারণেই ধর্মীয় শিক্ষকের সামনে আরো জুবুথুবু। এদের সন্তানকে মেরে ফেললেও হুজুরের হুমকি বা কাকুতিতে তারা মার্জনা পত্র বা দায়মোচন পত্রে সই স্বাক্ষর দিতে বাধ্য।

সম্প্রতি থানা শিক্ষা কর্মকর্তার জবানেও প্রকাশ, মাদ্রাসা-মক্তবে শারীরিক শাস্তির প্রতিবিধানই কঠিন। কারণ, অভিভাবকদের জ্ঞানার্জন নিয়ে বদ্ধমূল ধারণা এই যে নির্যাতন শিক্ষারই অংশ। সবাই একই ধরনের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছেন। আরও সমস্যা এই যে তাঁদের ধর্মজ্ঞানও অন্ধকারাচ্ছন্ন আদিম। ধর্মাচরণ শিখতে পাঠিয়েছেন, তাঁদের প্রতিবাদ বা শিক্ষকের বিরুদ্ধে নালিশ কত বড় গুনাহগারী, এই তাঁদের আশঙ্কা। অন্যদিকে এই নিয়মে বেড়ে ওঠা হুজুরদের কাছে এটাই তো নিয়ম, এতে ওজর আপত্তি বিচার দাবির প্রশ্ন কোথায়? অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে সবচেয়ে জঘন্য পাপ, যেই পাপে জাতির পর জাতি,বহু সম্প্রদায় ধংসব হয়ে গেছে সেই সমকামীতার জঘন্য চর্চা এদেশে এসকল মাদ্রাসাতেই সর্বোচ্চ।

শিশুদের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ একেবারেই করা যাবে না, তার বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে ১৯৯১-এর জাতিসংঘ শিশুবিষয়ক সনদের ধারায়। ধারাগুলোকে আমলে নিলে পিতা-মাতার বাইরে অন্য কেউ শিশুদের উচ্চ স্বরে ভর্ৎসনা বা তিরস্কারও করার অধিকার রাখেন না। অন্যদিকে, মক্তব-মাদ্রাসাবিরোধীদের মাদ্রাসায় নির্যাতন নিয়ে যতটা সরব দেখা যায়, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে ততটা সরব দেখা যায় না। কিন্তু সমস্যাটি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই আছে।

তবে ২০১২ সালে বাংলা-ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে মারধরের চল কমে আসছিল বলে প্রতিবেদনে প্রকাশ। পাশাপাশি আলিয়া মাদ্রাসাগুলো থেকেও শারীরিক শাস্তি উঠে যাচ্ছিল। এর কারণ সরকারি নির্দেশনা। ইউনিসেফ, সেভ দ্য চিলড্রেন এবং কয়েকটি এনজিও বাংলাদেশের স্কুলগুলোতে শাস্তির ব্যাপকতা এবং ক্ষতির ধরন নিয়ে ২০০০ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে কয়েকটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাদের প্রতিবেদনে ‘করপোরাল পানিশমেন্ট’ বা শারীরিক শাস্তির কুফল হিসেবে অসংখ্য শিশুর চিরতরে স্কুল ছেড়ে দেওয়া, মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়া, আক্রমণাত্মক আচরণপ্রবণতা রপ্ত করা, শারীরিক বৈকল্য ইত্যাদি বহু বিষয় ওঠে আসে।

এবং হেফজখানার প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ, মাদ্রাসার সবচেয়ে কম বয়েসী শিক্ষার্থীরা হাফেজি পড়ে এবং এই অমানবিক শিক্ষাদানের পদ্ধতিতে মাত্র ২০ শতাংশ হাফেজ হতে পারে। বাকি সবাই ঝরে পড়ে। আজ আলেম ওলামাগণও ফজর থেকে এশা অব্ধি অন্ধ মুখস্তের হেফজখানার অমানবিক পদ্ধতির শুদ্ধিকরণ দাবি করছে।

উল্লেখ্য, পদার্থের যেমন ধর্ম থাকে, আদর্শ চাপ ও তাপমাত্রায় সে আদর্শ মান দেয়, তেমন মানুষেরও ধর্ম তাঁকে শৃঙ্খলিত এবং আদর্শ অবস্থায় রাখতে আবশ্যক । কিন্তু মানুষ যখন মানুষের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে, তখনি ধর্মে , ঈশ্বরে অন্ধ আস্থা রাখতে বাধ্য হয়। এটা নিয়ম, ভক্তি বা ভালোবাসার চেয়ে অনেক বেশি অসহায়ত্ব। যখন রাষ্ট্র সমাজসহ কোনো দৃশ্যমান শক্তির উপর আস্থা রাখা যায় না, তখনি অদৃশ্য শক্তিকে অন্ধভাবে আঁকড়ে ধরে।

প্রমাণ, এক বছর ধরে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থেকে থেকে বহু স্কুল বিলোপ পেতে থাকলেও বেড়েই চলেছে মাদ্রাসার সংখ্যা । শুধু পটুয়াখালী পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের তথ্য মতে সেখানে প্রাইমারি স্কুল আর কিন্ডারগার্টেনের মোট সংখ্যার দশগুণ মাদ্রাসার সংখ্যা- যার ৭০%ই গড়ে উঠেছে খোদ করোনাকালে, যে কালে বহু স্কুল বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

সুতরাং অনতি বিলম্বে প্রশাসন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলির সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন আবাসিক মাদ্রাসাসহ সর্বক্ষেত্রে শিক্ষকদের ট্রেনিং, শিক্ষাদান পদ্ধতির ট্রেনিং, আইন করে নিয়ম আরোপসহ সরাসরি হস্তক্ষেপের।

লেখক : গবেষক। হেড অব ওভারসিজ বিজনেস, ফুকুওকা জাপান।
[email protected]

এইচআর/এমকেএইচ

অনতি বিলম্বে প্রশাসন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলির সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন আবাসিক মাদ্রাসাসহ সর্বক্ষেত্রে শিক্ষকদের ট্রেনিং, শিক্ষাদান পদ্ধতির ট্রেনিং, আইন করে নিয়ম আরোপসহ সরাসরি হস্তক্ষেপের

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]