নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন

লীনা পারভীন
লীনা পারভীন লীনা পারভীন , কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১০:৩০ এএম, ২২ মে ২০২২

নারীরা এদেশের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক নয়। এদেশের প্রতিটি ইঞ্চির উপর তাদের সমান অধিকার আছে। এদেশের নাগরিক হিসেবে এই সংবিধান তাদের উপর কোন প্রকার বিধিনিষেধ আরোপ করেনি। আর সেই অধিকারেই প্রতিটি নারী কোথায় কেমন করে চলবে, কী পরবে, কী খাবে বা কার সাথে কেমন করে মিশবে সেই সিদ্ধান্ত কেবল সেই ব্যক্তিটিই নিবেন। একজন নারীর জীবনাচরণের প্রণালী ঠিক করে দেয়ার অধিকার আর কারও নেই।

এমন একটি ঘটনা আজ পর্যন্ত ঘটেনি যেখানে কোন পুরুষ কেবল তাঁর পোশাকের জন্য নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। এমন একটি উদাহরণ নেই যেখানে পুরুষ কী পরবে বা কেমন করে চলবে এ নিয়ে কোথাও আলোচনা, সমালোচনা বা ওয়াজ হয়েছে। তাহলে একজন নারীকে নিয়ে কেন এসব চলছে? কোন অধিকারে? কারা নির্ধারণ করে দিলো আপনাদের? সম্প্রতি নরসিংদীর রেল স্টেশনে যে ঘৃণিত ঘটনাটি ঘটে গেলো এর ব্যাখ্যা কে দিবে? কেবল নিজের পছন্দ ও আরামদায়ক পোশাক পরার অপরাধে একটি মেয়েকে যেভাবে আক্রমণ করা হয়েছে এর বিচার হবে কি?

পোশাক হচ্ছে একান্তই একজন মানুষের নিজস্ব রুচি ও স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়। কোথায়, কখন, কেন কে কী পোশাক পরে যাবে সেটি নির্ধারণ করবে সেই ব্যক্তির পছন্দ ও রুচি। এই সমাজ নয়। তাহলে একজন নারী ওড়না পরলো কি পরলোনা এ নিয়ে এতো হৈ চৈ কেন? বিশ্বের কোনো সভ্য রাষ্ট্র ব্যক্তিস্বাধীনতার এহেন লংঘনকে গ্রহণ করবে না। আমরাতো উন্নত বিশ্বের স্বপ্ন দেখছি তাহলে আমাদের মন মানসিকতা কেন দিনে দিনে এমন আদিম হয়ে যাচ্ছে? আদিমকালেতো পোশাক ছিলোনা তাহলে সেখানে মানুষে মানুষে ব্যবধান হতো কেমন করে?

পোশাকের আবিষ্কারতো বেশি দিনের নয়। এর মধ্যে কেন ধর্মের চিহ্ন খোঁজা হচ্ছে? পোশাকের সৃষ্টি হয়েছে সভ্যতার অংশ হিসাবে। এখানে শ্লীল বা অশ্লীলের ধারণা যুক্ত করেছে মূর্খরা। আমাদের দেশে এখন ধর্মের নামে যা চলছে সেটি কখনই ধর্মকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করছে না। সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের উগ্রবাদকে ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে কৌশলে। ধর্ম মানুষকে সঠিক ও বেঠিকের জ্ঞান দেয়া শেখায়। কিন্তু রাস্তা-ঘাটে কাউকে ধরে মারধোর বা যৌন হয়রানিকে শেখাতে পারে কী?

কয়েকমাস আগেও আমরা দেখেছি একটি পাবলিক বাসে বাচ্চা একটি মেয়েকে তার পোশাকের জন্য হয়রানি করা হয়েছে। অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়েছে। আবারও দেখলাম নরসিংদীর রেল স্টেশনে। প্রশ্ন হলো, রেল স্টেশনের মত একটি জায়গায়তো রেলওয়ে পুলিশ থাকার নিয়ম। সংশ্লিষ্ট থানার লোকেরা বা কোথায় ছিলেন? এমনভাবে কিছু মানুষকে টানাহেঁচড়া করা হলো, মারধোর করা হলো অথচ লোকাল থানার কেউ টের পেলেন না কেন? রেলওয়ে পুলিশ কোথায় ছিলো? ভিডিওতে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, মেয়েটি যদি দৌড়ে না পালাতো তাহলে হয়তো তার কপালে আরও বড় বিপদ লেখা ছিলো।

কেন? কারা করছে এমন? একই ধরনের অভিজ্ঞতা আমারও হয়েছে। অফিসে যাচ্ছি। সকালবেলা হন্তদন্ত হয়ে দৌড়াচ্ছি। একজন বয়স্ক নারী এসে সামনে পথ আটকে দাঁড়িয়ে গায়ের ওড়না কেন সঠিক জায়গায় নেই তারজন্য ফালতু কথাবার্তা শুরু করে দিলো। আমি পালটা রুখে দাঁড়ানোয় সে চলে যেতে বাধ্য হলো। এগুলো এখন নিত্যকার ঘটনা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সমাজে এমন ঠিকাদারি কারা দিলো? নারীদেরকে সহি রাস্তায় আনার দায়িত্ব পরিবার পরিজন ফেলে রাস্তার লোকেদের হাতে চলে যাচ্ছে কাদের আশ্রয় প্রশ্রয়ে?

আমি হলফ করে বলতে পারি, এই যে নারীরা অন্য নারীদের পোশাক নিয়ে রাস্তায় অশ্রাব্য গালিগালাজ বা একটা বাজে পরিস্থিতি তৈরি করে তারা কোন না কোনভাবে সংগঠিত কোন শক্তির অংশ। এদের পিছনে একটি শক্তি কাজ করছে। নাহয় রাস্তাঘাট বা যানবাহনে এভাবে এগিয়ে আসার সাহস পেতোনা কখনও।

আমাদের সরকার নিশ্চিতভাবেই নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করছে। প্রশংসাও পাচ্ছে কিন্তু নারীর ক্ষমতায়নের সাথে নারীর পোষাশাকের স্বাধীনতাও জড়িত। একজন নারী যদি তাঁর স্বাচ্ছন্দ্যের পোশাকটি চাইলেও কেবল সমাজের ভয়ে পরতে না পারে তাহলে বলতে হবে যে সেখানে নারীর ক্ষমতায়ন এখনও অনেক দূরের বিষয়।

এর আগেও অনেকবার বলেছি, ওয়াজের নামে নারীদের নিয়ে যে নোংরা কথাবার্তা প্রচার করা হচ্ছে, নারীদেরকে খোলামেলা চলাফেরা করতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকে উৎসাহিত করা হচ্ছে নরসিংদীর ঘটনা তারই প্রতিফলন। সামাজিক মাধ্যমে নারীদেরকে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। কোন একটি ঘটনার এখনও পর্যন্ত বিচার হয়নি।

নরসিংদীর ঘটনায় একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে কিন্তু সেখানে ঘটনা শুরু করেছিলো একজন নারী। সেই নারীকে গ্রেফতার করে তার কাছে থেকে আসল কথা বের করে আনতে হবে। সে কেন, কাদের প্ররোচনায় এমন দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। কেবল গ্রেফতার নয়, উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা না করলে এমন ঘটনা বাড়বে বৈ কমবে না।

পরিকল্পিতভাবে নারীর জন্য একটি ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে যাতে করে নারীরা সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে চলতে ফিরতে না পারে। সংকোচ আর দ্বিধার জালে বাঁধতে চাইছে নারীদেরকে। মনে রাখতে হবে, সংকোচ আর দ্বিধায় আটকে রেখে নারীস্বাধীনতা বা নারীর ক্ষমতায়ন অর্জন হবে না কখনও। তাই সরকারের কাছে দাবি করছি, অবিলম্বে নারীর প্রতি এহেন হেনস্তার সঠিক ও উপযুক্ত বিচার নিশ্চিত করুন। এই দেশ, এই সমাজকে নারীর জন্য নিরাপদ করাটা আপনাদের নির্বাচনী ওয়াদা।

লেখক: অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, কলামিস্ট।

এইচআর

অফিসে যাচ্ছি। সকালবেলা হন্তদন্ত হয়ে দৌড়াচ্ছি। একজন বয়স্ক নারী এসে সামনে পথ আটকে দাঁড়িয়ে গায়ের ওড়না কেন সঠিক জায়গায় নেই তারজন্য ফালতু কথাবার্তা শুরু করে দিলো। আমি পালটা রুখে দাঁড়ানোয় সে চলে যেতে বাধ্য হলো। এগুলো এখন নিত্যকার ঘটনা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]