আমাদের সন্তান হোক শুধুই মানুষ


প্রকাশিত: ০৪:৪৫ এএম, ০৮ মার্চ ২০১৬

কাল রাতে ঘুমুতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তা তো কোনো কারণ বা অজুহাত হতে পারে না। ভোরে উঠে সব কাজ সাড়ার দায়িত্ব যে একা নীরার। সকালের আলো ফোটার আগেই নাস্তা তৈরি করে টেবিল সাজাতে হবে। ঠিক ছটায় ছেলে মেয়েকে ডাকতে হবে স্কুলের জন্য। ঘড়ির কাটা যেন সাতটা না ছোঁয়। অফিসে যাবার কাপড় গুছিয়ে তবে ডাকতে হবে স্বামী রাতুলকে।

ছেলে মেয়ের টিফিন স্বামীর লাঞ্চ বক্স গুছিয়ে তবেই কিনা অফিসের জন্য তৈরি হবে নীরা। আর সাড়ে সাতটার মাঝে যদি বাড়ি থেকে বের হতে না পারে, তবে বাচ্চাদের স্কুলে দিয়ে অফিসে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যাবে। খুব তাড়াহুড়োর সকালে যেন দম নেয়াই দায়। চা আর সকালের পেপার হাতে রাতুল উঠে এল খাবার টেবিলে। চায়ে চুমুক দিয়েই চেচিয়ে উঠল রাতুল। “এটা চা নাকি বিষ? এক কাপ চা বানানোরও যোগ্যতা নেই। দিনটাই নষ্ট করে দিল।”

নীরবে সহ্য করে নীরা আবারো চা বানায়। কিন্তু রাতুল আর চা খায় না। এমনি সময় ছেলে প্রশ্ন করে মা টিফিনে কী দিয়েছ? রুটি ভাজি বলে সারতে পারে না নীরা, আর অমনি ছেলে টিফিন বক্স ধাক্কা দিয়ে বলে “এটা কী কোন টিফিন হলো।‘’ নীরা শাসনের সুরে কিছু বলবে তখনই রাতুলের মন্তব্য “তোর মায়ের যোগ্যতা ওটুকুই।“ নীরার অপমানে চোখ ভিজে উঠে। ছেলেটিও বাবার পথে হাঁটছে। ঠিক সে সময় আলতো করে হাত ধরে মেয়ে, বলে, মা চল তোমার দেরি হয়ে যাবে।

প্রতিদিন হাজারো নারী শিকার হচ্ছে শাব্দিক বা বাচনিক সহিংসতার। প্রতিনিয়তই মানসিক আঘাত নারীর ব্যক্তিত্বকে করে তোলে সঙ্কুচিত। আর জীবনের প্রতি পদে লেখা হয় নারীর বঞ্চনার গাথা। স্বনির্ভরতা নাকি নারীকে সাহসী করে আর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এনে দিতে পারে নারীর মুক্তি। কিন্তু এ মুক্তি কোথা থেকে? এর সাহসই বা কোথায় দেখানোর জন্য। নারীতো সাহস সঞ্চার করতে চায় তার পরিবার পরিজনকে সুরক্ষিত করার জন্য। নাকি এ সাহস- স্বাবলম্বিতা নারীকে মুক্তি দিবে তারই পরিবার পরিজন থেকে? যে মুক্তি একেবারেই কাম্য নয় নারীর। আর তাই ৮৭ শতাংশ বাঙালি নারী শিকার হন স্বামীর নির্যাতনের। অন্যদিকে ৭৮ শতাংশ নারী কোনো না কোনো ভাবে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হন।

এই সহিংসতার শুরু কোথায় বা শেষ ই বা কোথায় তা-ই আজ বড় প্রশ্ন। পরিবারের ছোট্ট শিশুটি যখন তার বাবাকে দেখেই শিখে নেয় অন্যকে হেয় করার আচরণ তখন সহিংসতা জন্ম নেয় সামাজিকরণের পথ পরিক্রমায়। আর যখন পরিবারের কন্যা শিশুটি নীরবে সহ্য করতে দেখে মাকে, মায়ের মতো সেও যখন পরিবার নামক কাঙ্খিত খাঁচায় ভীত সংকুচিত হয়ে শুধু একটি ঠাঁই খুঁজে ফিরে তখন প্রতাপশালী হয়ে ওঠে পুরুষতান্ত্রিকতার বীজ, যা দিনে দিনে পুরুষের পাশাপাশি নারী মনেই মহিরুহ হয়ে উঠে, ডাল পালা ছড়ায় নির্বিচারে আর ছায়া দেয় নারী (অব)দমনের মূল মন্ত্রকে।
 
এরই প্রতিফলন দেখি সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে, বাস্তবতার রুঢ় চিত্রে। শুধু ২০১৫ সালেই বাংলাদেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮৪৬ জন নারী, যাদের ৬০ জনেরই মৃত্যু হয়। পারিবারিক সহিংসতা ঘটে ৩৭৩টি, এরমধ্যে ২১২ জন নারীকে হত্যা করে স্বামী, আর ৫৪ জন সহিংসতার এক পর্যায়ে আত্মহত্যাকেই শ্রেয় বলে মনে করেন। অন্যদিকে যৌন হয়রানির শিকার হন ২০৫ জন। যাদর মধ্যে ১০ জন নারী এই গ্লানিকে মেনে নিতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। যৌতুকের কারণে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন ১০১ জন নারী, একই কারণে হত্যা করা হয় ১৮৭ জনকে। এবং আত্মহত্যায় বাধ্য হন ১০ জন। সহিংসতার আরেক প্রকাশ এসিড সন্ত্রাসে ঝলসে যায় ৩৫ জন। আর ফতোয়া সালিশের নামে নির্যাতন চলে ১২ নারীর ওপর। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের গবেষণায় এই চিত্র উঠে এসেছে। মানবাধিকার এই সংস্থাটি সংবাদপত্র থেকেই তথ্য সংগ্রহ করে। বলার অপেক্ষা রাখে না বাস্তবে এই চিত্র আরো ভয়ঙ্কর।    

এগুলো কেবল সংখ্যা না, এই সংখ্যা সমাজে নারীর অধিকার সম্মানের যথার্থতারই নামমাত্র! নারী তবে কী? নারী কি সত্যিই মানুষ? এ প্রশ্নের উত্তর চাই নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলের কাছে। সমতার অঙ্গীকার নিয়ে নারী দিবস উদযাপন করে নারীই যখন তার ছেলে ও মেয়ে সন্তানের মাঝে বৈষম্য বিভেদের রেখা টানেন অথবা নিজের প্রতি বৈষম্য, অন্যায় সহিংসতাকে মেনে নেন তখন অঙ্গীকারের অবমাননা হয় বৈকি। আর এই অবমাননারোধে চাই সকলের বোধের পরিবর্তন। শিশুর বেড়ে উঠার কালেই যদি সচেতনভাবে তার সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়াকে লিঙ্গ বৈষম্য মুক্ত রাখা সম্ভব হয় তবে শিশুটি বেড়ে উঠবে মানুষ হিসেবে, নারী বা পুরুষ হিসেবে নয়।

বিদ্যমান মানসিকতায় ব্যক্তির পরিচায়ক বা অস্তিত্বের সাক্ষরকে যদি গুরুত্ব দেয়া যায় তবে নারী নির্ভয়ে অনেক বাধাকে অতিক্রম করতে পারবে। পাশাপাশি পুরুষ নারীকে মর্যাদা দিতে, অন্তত মেনে নিতে বাধ্য হবে। যে কোনো অন্যায় অত্যাচার বৈষম্য সহিংসতার বিরুদ্ধে কণ্ঠ জাগানো প্রয়োজন। বন্ধুর পথে যাত্রা কঠিন হবে সন্দেহ নেই কিন্তু বন্ধুও মিলবে এই পথেই।

গৎবাঁধা চিন্তাধারায় নারী পুরুষের কাজের চৌহদ্দি ঠিক করা বা আচরণ মূল্যবোধের ছাপ আঁকার দিন শেষ। কাজের সমবন্টন, অধিকারে সমমর্যাদা, সম্পদে সমঅধিকার, মনুষ্যত্বে সমতুল্য আর অস্তিত্বে সমঅবস্থানের দাবি তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে এ সমাজ একদিনের তৈরি নয় আর নারী নিষ্পেষণের ইতিহাসও একদিনের নয়। তাই নারী মুক্তির ইতিহাসও রচিত হবে বহু যুগের সম্মেলনে। আজ শুধু একটি বিষয়কে প্রাধান্য দিব আমরা-আমাদের সন্তান মানুষ হয়ে উঠুক নারী বা পুরুষ নয়। আমাদের ভবিষ্যত সেবার বীজ বুনুক, সহিংসতার নয়।

লেখক : শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এইচআর/পিআর

আপনার মতামত লিখুন :