বিএনপির লিফলেটভিত্তিক ইশতেহার
কোটি মানুষের কর্মসংস্থান-মাধ্যমিকে শেখানো হবে চতুর্থ ভাষা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারকে কেন্দ্রীয় ইস্যু হিসেবে সামনে রেখে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করার প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। শিগগির এ ইশতেহার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে। লিফলেটভিত্তিক এ ইশতেহার প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে।
বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সাম্প্রতিক বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। দলটির একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করে।
‘লিফলেট’ কৌশলেই ইশতেহারের রূপরেখা
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিএনপি একাধিক খাতভিত্তিক লিফলেট প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে দেশ পুনর্গঠনে কোন ধরনের কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হবে, আগামী দিনে দল কী বাস্তবায়ন করতে চায়, রাষ্ট্র কাঠামোয় কী কী পরিবর্তন আনা হবে—এসব বিষয় লিফলেটের মাধ্যমে জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে।
এই লিফলেটগুলোর আদলেই আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার চূড়ান্ত করা হচ্ছে। নির্বাচনি প্রচারণায় নামার আগেই সব কাজ শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে কেন্দ্রীয় প্রচার ও গণসংযোগে নামবে দলটি।
রাষ্ট্র মেরামতই ইশতেহারের মূল বার্তা
সূত্র জানায়, এবারের ইশতেহার গঠিত হবে বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা, জুলাই সনদ ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার সমন্বয়ে।
ইশতেহারের কেন্দ্রে থাকতে পারে—
• নির্বাচনি শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠন
• গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার
• বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
• প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ
• মানবাধিকার রক্ষা
• দুর্নীতিবিরোধী কাঠামো শক্তিশালীকরণ
দলের নীতিনির্ধারকরা জানান, জনগণকে রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলাই হবে বিএনপির প্রধান অঙ্গীকার।
প্রতিটি খাতে আলাদা ‘লিফলেট’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, লিফলেটে দেশের উন্নয়নে বিএনপির কর্মপরিকল্পনা, নাগরিকদের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নেওয়া পদক্ষেপ, রাষ্ট্র মেরামতে ৩১ দফাসহ নানান প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হবে।
শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, কৃষি ও খাদ্য, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্রীড়া, প্রশাসন, দুর্নীতি প্রতিরোধসহ প্রতিটি সেক্টরকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আলাদা আলাদা লিফলেট প্রকাশ করা হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি এলাকার সুবিধা-অসুবিধা, উন্নয়ন চাহিদা ও জনগণের প্রত্যাশাও প্রাধান্য পাবে বলে সূত্র জানায়।
তরুণ প্রজন্ম ও নারী ভোটারদের আকৃষ্ট করতে লিফলেটে বিশেষ উদ্যোগ থাকবে। এসব লিফলেট দেশের প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিতে নেতাকর্মীদের প্রতি বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হবে।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিয়ে বিএনপির রূপরেখা
শিক্ষাখাতে বাজেট বাড়ানো, স্কুল পর্যায় থেকেই ব্যবহারিক ও কারিগরি শিক্ষা চালুর পরিকল্পনা করছে বিএনপি। আইটি, খেলাধুলা, আর্ট-কালচার, ডেন্টাল হাইজিন, মেডিকেল টেকনিশিয়ানসহ বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষা চালুর কথা বলা হবে।
প্রাথমিক স্তর থেকে ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা এবং মাধ্যমিক স্তর থেকে আরও একটি ভাষা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। আরবি, জার্মান, ফরাসি, জাপানি ও চীনা ভাষা শেখার সুযোগ পাবে শিক্ষার্থীরা, যাতে তারা আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
আরও পড়ুন
ক্ষমতায় গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে জোর দেবে বিএনপি
বিএনপির ইশতেহার হবে গণমানুষের মুক্তির সনদ: সালাহউদ্দিন আহমদ
বিএনপিকে ‘শ্রমিক ইশতেহার’ দিলো অ্যাডভোকেসি অ্যালায়েন্স
ক্যাম্পাসে মেধাভিত্তিক ছাত্ররাজনীতির সংস্কৃতি, নিরাপদ পরিবেশ, হলের আবাসন সংকট নিরসন, লাইব্রেরি আধুনিকায়ন, নারী শিক্ষার প্রসার এবং দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি—এসব প্রতিশ্রুতিও লিফলেটে তুলে ধরা হবে।
আলিবাবা ও অ্যামাজনের মতো বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি, ১০ লাখের বেশি ফ্রিল্যান্সারের নিরাপদ লেনদেন নিশ্চিত করতে পেপাল ও ওয়াইজ চালু, ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান, প্রতিটি জেলায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প স্থাপন, ৫০ লাখ ফ্যামিলি কার্ড, পাঁচ বছরে ৫ কোটি গাছ লাগানো এবং চা শিল্পে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি দমনের পরিকল্পনাও থাকবে।
সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা
স্বাস্থ্যখাত নিয়ে আলাদা লিফলেট প্রকাশ করবে বিএনপি। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের আদলে ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা’ চালুর প্রতিশ্রুতি থাকবে।
প্রতিটি নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা, প্রতিটি গ্রামে একাধিক পল্লি চিকিৎসক নিয়োগ (৪০–৪৫ শতাংশ নারী), স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির ৫ শতাংশের বেশি বরাদ্দ, উপজেলা ও জেলা হাসপাতালের মানোন্নয়ন, ২৪ ঘণ্টা হেল্পলাইন, জরুরি চিকিৎসা ও রেফারেন্স সিস্টেম শক্তিশালীকরণের পরিকল্পনাও লিফলেটে তুলে ধরা হবে।
পাশাপাশি পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতায় বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তির কথাও রয়েছে।
কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা
কৃষিখাতে ফার্মার্স কার্ড চালু, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল পুনরুদ্ধার, আধুনিক ব্যারাজ নির্মাণ, পানি সংরক্ষণমূলক ধানচাষ সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দেবে বিএনপি।
কোল্ড স্টোরেজ সম্প্রসারণ, কৃষিভিত্তিক শিল্পে ১৩ লাখ নতুন কর্মসংস্থান, ড্রোন প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে তরুণদের কৃষিতে যুক্ত করার কথাও থাকতে পারে।
রাষ্ট্র সংস্কার ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার
লিফলেটে প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার, নির্বাহী আইন, বিচার বিভাগের ক্ষমতার ভারসাম্য, উচ্চকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বাতিল, ইভিএম নয়—পেপার ব্যালটে ভোট, জুডিসিয়াল কমিশন গঠন ও সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল পুনঃপ্রবর্তনের প্রতিশ্রুতি থাকবে।
এছাড়া বিগত ১৫ বছরের অর্থপাচার ও দুর্নীতির তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ, পাচার করা অর্থ ফেরত আনা, গুম-খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অবসান এবং ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ নীতি বাস্তবায়নের কথাও তুলে ধরা হবে।
নেতারা যা বলছেন
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগামী দিনে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যে ইশতেহার, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা তা হাজির করবো।’
স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘শিগগির ইশতেহার ঘোষণা করা হবে।’
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘ডে ওয়ান থেকে আমাদের পারফর্ম করতে হবে। এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান—এটা আমরা হোমওয়ার্ক করেই বলেছি। তারেক রহমানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে এবং তা বাস্তবায়ন করতে হবে।’
কেএইচ/এএসএ/এমএফএ/এমএস