দুর্নীতি-ঋণখেলাপিতে তিন আসনে প্রার্থীশূন্য বিএনপি

মুহাম্মদ ফজলুল হক
মুহাম্মদ ফজলুল হক মুহাম্মদ ফজলুল হক , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:৪৯ এএম, ২৬ ডিসেম্বর ২০১৮

অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপন সংক্রান্ত দুর্নীতি এবং ঋণখেলাপিসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত বিএনপি তথা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কয়েক নেতা একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য মনোনয়ন কিনলেও শেষ পর্যন্ত প্রার্থী হিসেবে টিকে থাকতে পারেননি।

তারা হলেন- চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) আসনে এমএ হান্নান, জামালপুর-১ (বকশিগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ) আসনে রশিদুজ্জামান মিল্লাত, মানিকগঞ্জ-৩ (হাটিপাড়া, ভাড়ারিয়া ও পুটাইল ইউনিয়ন সমূহ ব্যতীত মানিকগঞ্জ সদর এবং সাটুরিয়া উপজেলা) আসনে আফরোজা খান রিতা।

প্রথমে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসাররা এসব বিএনপি নেতার মধ্যে এমএ হান্নান ও আফরোজা খান রিতা মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেন। এর বিরুদ্ধে ব্যাংকের পক্ষ থেকে আবেদন করা হলেও তাদের মনোনয়ন বৈধই থেকে যায়। পরে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো নির্বাচন কমিশনে (ইসি) তাদের প্রার্থিতা বাতিলের আবেদন করলেও ইসি তাদের প্রার্থিতা বহাল রাখে। অপরদিকে রশিদুজ্জামান মিল্লাত একটি দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হওয়ায় তার মনোনয়নপত্র সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা বাতিল করেন। এর বিরুদ্ধে তিনি ইসিতে আবেদন করলে তার প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হয়।

এর প্রেক্ষিতে এমএ হান্নান ও আফরোজা খান রিতার প্রার্থিতার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো এবং রশিদুজ্জামান মিল্লাতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের প্রার্থী উচ্চ আদালতের দারস্থ হন। এ বিষয়ে শুনানি করে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেন। এরপর তারা মনোনয়ন ফিরে পেতে আপিল বিভাগে আবেদন করেন। সেখানে তাদের আবেদন না-মঞ্জুর হয়। ফলে তারা আর নির্বাচনের সুযোগ পাচ্ছেন না।

এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুর্টি অ্যার্টনি জেনারেল মো. মোতাহার হোসেন সাজু জাগো নিউজকে জানান, ঋণখেলাপি হওয়ায় বিএনপি নেতা এমএ হান্নান ও আফরোজা খান রিতার প্রার্থীতা ফিরে পাওয়ার কোনো সুযোগ বা সম্ভাবনা নেই।

তিনি আরও জানান, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ থাকায় দুদকের দায়ের করা একটি মামলায় জামালপুরের সাবেক এমপি এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত দণ্ডিত থাকায় তারও নির্বাচনে আসার কোনো সুযোগ নেই।

ঋণখেলাপি ও ন্যূনতম দুই বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত এসব প্রার্থীর আপিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন থাকায় আইন অনুযায়ী এসব নেতার নির্বাচনে অংশ নেয়ার পথ আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। আপিল বিভাগও দণ্ড স্থগিত রেখে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ না দেয়ায় তাদের কেউই আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না।

এ বিষয়ে রাষ্ট্র পক্ষের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, দণ্ড স্থগিত রেখে নির্বাচনে অংশ নেয়ার আবেদন আপিল বিভাগেও খারিজ হয়ে যাওয়ায় এবার দণ্ডিতদের নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ থাকছে না।

তিনি জানান, সংবিধানের ৬৬ (২) (ঘ) এবং আরপিও (গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ) অনুযায়ী দণ্ডিদের নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ নেই। এ অবস্থায় নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আপিলে কারো দণ্ড স্থগিত হলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। সে অনুযায়ী দণ্ডপ্রাপ্ত বেশ কয়েকজন হাইকোর্টে দণ্ড স্থগিতের আবেদন করেছিলেন। হাইকোর্ট আবেদনগুলো খারিজ করে তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন, ‘সংবিধানের ৬৬ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদে অনুযায়ী ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারও কমপক্ষে দুই বছর কারাদণ্ড হলে এবং তার মুক্তির পর পাঁচ বছর পার না হলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না।

কোনো আদালতের দেয়া সাজার বিরুদ্ধে আপিল বিচারাধীন থাকলেও দণ্ড বাতিল না হওয়া পর্যন্ত সেটা কার্যকর থাকে। এটা নির্বাচনে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে পুরোপুরি বাধা। ফৌজদারি কার্যবিধিতে যা কিছুই থাকুক না কেন, এ ক্ষেত্রে সংবিধানের বিধানই প্রাধান্য পাবে।’ পরে আপিল বিভাগও এ আদেশ বহাল রেখেছেন।

বিএনপির প্রার্থিতা শূন্য তিন আসনের মধ্যে ঋণখেলাপির অভিযোগে সোনালী ব্যাংকের করা রিটের শুনানি নিয়ে গত ১৭ ডিসেম্বর বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি খায়রুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চ চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) আসনের প্রার্থী আবদুল হান্নানের মনোনয়নপত্র স্থগিত করেন। আবদুল হান্নান ওই আদেশের বিরুদ্ধে চেম্বার জজের কাছে গেলে ২৪ ডিসেম্বর শুনানি শেষে আদালত কোনো আদেশ দেননি। ফলে হাইকোর্টের আদেশ বহাল থাকায় আসনটিতে প্রার্থী শূন্য হয় বিএনপি।

এর আগে গত ২ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইকালে জেলা রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংক ও সোনালি ব্যাংক এম এ হান্নানকে ঋণ খেলাপি উল্লেখ করে। কিন্তু রিটার্নিং অফিসার প্রথমে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত না দিলেও যাচাই বাছাইয়ের শেষ সময়ে এম এ হান্নানকে বৈধ ঘোষণা করেন। পরে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নির্বাচন কমিশনে আপিল করলে সেখানেও এম এ হান্নানের পক্ষে মতামত যায়।

মানিকগঞ্জ-৩ : এই আসনে বিএনপির প্রার্থী সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতার পদত্যাগপত্র গৃহীত না হওয়ায় মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষণা করা হয়।

অন্যদিকে ঋণখেলাপির কারণে একই দলের নেত্রী আফরোজা খান রিতার প্রার্থীতাও আটকে যায় হাইকোর্টে। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী আফরোজা খান রিতার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশনের দেয়া সিদ্ধান্ত স্থগিত করে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। সোনালী ব্যাংকের করা রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে গত ১২ ডিসেম্বর বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন।

ঋণখেলাপির অভিযোগ এনে রিট করে সোনালী ব্যাংক। আদালতে সোনালী ব্যাংকের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী এম রোকনুজ্জামান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু। আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেন তিনি।

বাবা সাবেক মন্ত্রী হারুনুর রশীদ খান মুন্নু মারা যাওয়ায় এবার দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি আফরোজা খান রিতা।

জামালপুর-১ (দেওয়ানগঞ্জ-বকশীগঞ্জ) : এই আসনে বিএনপি প্রার্থী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের মনোনয়ন স্থগিত করে হাইকোর্টের দেয়া আদেশ বহাল রেখেছেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ। গত ১৮ ডিসেম্বর প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ ‘নো অর্ডার’ আদেশ দেন। এতে ওই আসনে প্রার্থী শূন্য হয়েছে বিএনপি।

গত ১৩ ডিসেম্বর জামালপুর-১ আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ হাইকোর্টে বিএনপি প্রার্থী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের মনোনয়নপত্র বাতিল চেয়ে রিট আবেদন করলে হাইকোর্ট তার মনোনয়নপত্র স্থগিত করেন। পরে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছিলেন মিল্লাত।

এর আগে গত ২ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ থাকায় দুদকের দায়ের করা একটি মামলায় এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত দণ্ডিত থাকায় তার প্রার্থিতা বাতিল করেছিলেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা আহমেদ কবীর। পরে নির্বাচন কমিশনে আপিল করে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছিলেন তিনি। প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার পর বিএনপি থেকে তাকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়া হয়।

এফএইচ/এমএমজেড/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।