‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রধানমন্ত্রীর কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত ছিল’

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:১৬ পিএম, ২০ জানুয়ারি ২০১৯
ফাইল ছবি

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিজয় উৎসবের সমালোচনা করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেছেন, জনগণ মনে করে ভুয়া ভোটের সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। কারণ ভোটের আগের দিন রাতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জনগণের ভোটের অধিকারটা নিজের হাতে তুলে নিয়েছে। 

তিনি বলেন, নির্বাচনের আগের রাতে মহাভোট ডাকাতির পর সেই ভুয়া নির্বাচনকে জায়েজ করার জন্য সরকার যা যা করছে তা চরম হাস্যকর। গতকাল তারা জনগণের কোটি কোটি টাকা শ্রাদ্ধ করে ‘তথাকথিত’ বিজয়ের উৎসব উদযাপন করেছে। সারাদেশ থেকে বাসভর্তি ভাড়াটে লোকজন এনেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ভরতে পারেনি।

রোববার সকালে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বিএনপির এই নেতা।

শনিবার (১৯ জানুয়ারি) সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগ আয়োজিত বিজয় সমাবেশ হয়। গত ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৫৭ আসনে নিরঙ্কুশ জয় পায় আওয়ামী লীগ। নির্বাচনের প্রায় তিন সপ্তাহ পর গতকালের সমাবেশের মাধ্যমে সেই বিজয় উদ্‌যাপন করে দলটি। সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনে অংশ নেয়া সব দলকে ধন্যবাদ জানান। ভোটে আসা দলগুলোর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে জয়-পরাজয় একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। আমি বলতে চাই আওয়ামী লীগ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছে এটা সত্য।’

রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেন, ‘তারাই (আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী) অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে রাতভর ব্যালট বাক্সে নৌকা মার্কায় সিল দেয়া ব্যালট পেপারে ভরিয়ে দিয়েছে। ভোট জালিয়াতি করতে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র ক্ষমতাসীনদের পাশে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং গোপনে উৎকোচ দেয়া হলেও প্রকাশ্যে সরকারের বিভিন্ন বাহিনীকে ধন্যবাদ দেয়া উচি ছিল প্রধানমন্ত্রীর।’

৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ আখ্যায়িত করে বিএনপির নেতা বলেন, ‘গতকাল ভুয়া ভোটের সরকারপ্রধান যখন বাংলাদেশে ভোটাধিকার হরণের পর উৎসব করছেন তখন জাতিসংঘ মহাসচিবের বক্তব্য নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশে নির্বাচন অবশ্যই সঠিক ছিল না।’ বিবিসির হেডলাইন ছিল ‘গণতন্ত্র থেকে ছিটকে পড়েছে বাংলাদেশ।’ এ ছাড়া বিশ্ব মিডিয়ায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নির্বাচন ছিল বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ। এই নির্বাচনকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বলেছে প্রহসন, এই বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে বিপজ্জনক যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। পৃথিবীর খ্যাতনামা স্কলাররা বাংলাদেশের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে ইতিহাসের ‘নিকৃষ্টতম নির্বাচন’ বলে অভিহিত করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন প্রখ্যাত স্কলার বলেছেন, ‘বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনগোষ্ঠী নির্বাচনের ফলাফল চুরি করেছে।’

তিনি বলেন, ‘ভোটচুরির সব নোংরা কৌশল প্রয়োগ করে শেখ হাসিনা এবং তার দল ৯৭.৬৬ শতাংশ ফলাফল নিজের দলের জন্য ভাগিয়ে নিয়েছেন। মহা ভোট ডাকাতির মহা কেলেঙ্কারি আড়াল করতে ভুয়া ভোটের সরকার বৈধতা পেতে এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেনদরবার শুরু করেছে।’

রিজভীর ভাষ্য, এরকম ভুয়া ভোটের নির্বাচন বিশ্বের গণতন্ত্রকামী মানুষ ও তাদের নির্বাচিত সরকারের কাছে এর কোনো কানাকড়ি মূল্য নেই। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি এবং ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের মধ্যদিয়ে গণতন্ত্রের জন্য এদেশের মানুষের লড়াই ও অর্জনকে ম্লান করে দিয়েছে ভুয়া ভোটের এই অবৈধ শাসকগোষ্ঠী। জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া কোনো সরকার কখনোই টিকতে পারে না, ভয় দেখিয়েও বেশি দিন টেকা যায় না। ম্যাকিয়াভেলির নীতি অবলম্বন করে ক্ষমতায় থাকার দিন শেষ হয়ে গেছে।’

ভুয়া ভোটের মিথ্যা জয়ে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা পৈশাচিক উল্লাসে মেতে উঠেছে বলে মন্তব্য করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। তিনি বলেন, ‘কুৎসিত অপকর্ম করতে তারা এখন বেপরোয়া। এরা বিরোধী দলের সহায়-সম্পত্তি দখল ও লুটের পাশাপাশি নারীদের ওপর হানাদার বাহিনীর কায়দায় হিংস্র লালসায় ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এদের প্রাত্যহিক জীবন থেকে সৌজন্যবোধ ও হিতাহিত জ্ঞান লোপ পেয়েছে। এরা শকুনির দৃষ্টি নিয়ে সারাদেশে নির্ভয়ে শিকার করে বেড়াচ্ছে। এদের হাত থেকে মা-বোন-শিশু কেউই রেহাই পাচ্ছে না। মিথ্যা জয়ের আনন্দের আতিশয্যে এদের বিভৎস রূপ দেখে দেশবাসী ভীত-শঙ্কিত। এদের নিষ্ঠুরতায় বাংলাদেশ এখন আদিম অন্ধকার যুগে প্রবেশ করেছে।’

ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতি করে আসছেন রিজভী আহমেদ। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘ধানের শীষে ভোট দেয়ার অপরাধে নির্যাতিতা পারুল বেগমের আহাজারি ও গোঙানি থামতে না থামতেই নোয়াখালীর কবিরহাটে ঘরে ঢুকে অস্ত্রের মুখে মা ও ছেলে-মেয়েদের জিম্মি করে তিন সন্তানের মাকে স্থানীয় যুবলীগের কর্মীরা গণধর্ষণ করেছে। ধর্ষিতার স্বামী আবুল হোসেন ধানসিঁড়ি ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। তাকে নির্বাচনের আগে দুটি মিথ্যা মামলায় আটক করে কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছে অথচ এফআইআর-এ তার নাম পর্যন্ত ছিল না। বন্দী স্বামীর স্ত্রীকে এভাবে ক্ষমতাসীন যুব সংগঠনের নেতাকর্মীদের দ্বারা গণধর্ষণ শুধু হৃদয়বিদারকই নয়, মনুষ্যত্বহীনতার এক ভয়ঙ্কর দৃষ্টান্ত। এরা মানুষরূপী পশু।’

তিনি বলেন, ‘আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে বলেই আওয়ামী যুব ও ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের বেপরোয়াভাব এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। ভোট ডাকাতির জয়ে ক্ষমতাসীনরা অহংকার আর উন্মত্ততায় বিচার বুদ্ধি হারিয়ে বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।’ এ সময় নোয়াখালীর কবিরহাটে ঘরে ঢুকে নারী ধর্ষণের ঘটনায় তীব্র নিন্দা এবং অবিলম্বে দোষীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবুল খায়ের ভূঁইয়া, আতাউর রহমান ঢালী, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম আজাদ, সহ-দফতর সম্পাদক মুনির হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

কেএইচ/এসআর/এমএস