হারানো জিনিস খুঁজে পেতে দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর উদ্ভাবন

আহমাদুল কবির
আহমাদুল কবির আহমাদুল কবির , মালয়েশিয়া প্রতিনিধি মালয়েশিয়া
প্রকাশিত: ০৯:৩১ এএম, ০৪ জানুয়ারি ২০২৬
ছবি-সংগৃহীত

ডিজিটাল জীবনে জিনিস হারানো কিংবা অনলাইন প্রতারণা নিত্যদিনের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এক মুহূর্তের অসতর্কতায় হারিয়ে যেতে পারে মোবাইলফোন, মানিব্যাগ, ল্যাপটপ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র। আবার একটি ভুয়া লিংক, প্রতারণামূলক ফোনকল কিংবা মিথ্যা মেসেজে ক্লিক করেই কেউ হারাতে পারেন জীবনের সঞ্চয়।

অথচ এমন পরিস্থিতিতে মানুষের ভরসা আজও মূলত ফেসবুক পোস্ট, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ কিংবা পরিচিতজনদের কাছে সাহায্য চাওয়া। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হারানো জিনিস আর ফিরে আসে না, আর স্ক্যামের তথ্য দেরিতে ছড়ানোর কারণে আরও অনেক মানুষ প্রতারিত হন।

এই বাস্তব সমস্যার কার্যকর ও টেকসই সমাধান খুঁজতেই জন্ম নেয় ‘অ্যাওয়ার এক্সওয়ান (Aware X One)’। দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর উদ্যোগে তৈরি এই কমিউনিটি-চালিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য একটাই-হারানো জিনিস খুঁজে পাওয়ার বাস্তব সুযোগ তৈরি করা এবং প্রতারণা ঘটার আগেই মানুষকে সতর্ক করা।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে একটি সিস্টেমের জন্ম
অ্যাওয়ার এক্সওয়ান-এর অন্যতম উদ্যোক্তা শেরপুরের ঝিনাইগাতীর মো. শাহরিয়ার শাহনাজ শোভন, যিনি অনলাইনে ‘shuvonsec’ নামে পরিচিত। তিনি নাসা, সনি, মেটা, অ্যামাজন ও গুগলের মতো আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে গুরুত্বপূর্ণ সাইবার দুর্বলতা শনাক্ত করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সাইবারজায়ায় তথ্যপ্রযুক্তিতে ডিপ্লোমা অধ্যয়নরত।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে শোভন বলেন, একদিন আমার নিজের পাওয়ার ব্যাংক হারিয়ে যায়। তখন বুঝতে পারি জিনিস হারালে মানুষ আসলে কোথায় যাবে বা কী করবে, তার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। সবাই ফেসবুকে পোস্ট দেয়, কিন্তু বেশিরভাগ সময় কিছুই ফিরে আসে না। তখনই উপলব্ধি করি, সমস্যাটা মানুষের নয়, সমস্যাটা পুরো সিস্টেমের। সেই ভাবনাই অ্যাওয়ার এক্সওয়ান-এর ভিত্তি।

প্রযুক্তিগত ভিত্তি গড়ে তোলেন আরেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী
এই ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে শোভনের সঙ্গে যুক্ত হন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী উকাই কিং মারমা জয় (Ukay Khing Marma Joy)। তিনি একজন অভিজ্ঞ সিস্টেমস ও সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, যিনি সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার-উভয় ক্ষেত্রেই দক্ষ। এমবেডেড সিস্টেম, অটোমোটিভ-গ্রেড লিনাক্স অ্যাপ্লিকেশন, ফুল-স্ট্যাক প্ল্যাটফর্ম এবং বাস্তব ব্যবহারের উপযোগী নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি সিস্টেম তৈরিতে রয়েছে তার উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা।

জয়ের মূল দায়িত্ব ছিল এমন একটি প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরি করা, যা কেবল ধারণায় নয়, বাস্তব ব্যবহারে টেকসই হবে। বড় পরিসরে ব্যবহার হলেও যেন সিস্টেম ভেঙে না পড়ে, তথ্য নিরাপদ থাকে এবং ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা সহজ হয়-এই লক্ষ্যেই অ্যাওয়ার এক্সওয়ান-এর প্রযুক্তিগত ভিত্তি নির্মাণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

এই দুই উদ্যোক্তার সমন্বয়ে অ্যাওয়ার এক্সওয়ান দাঁড়িয়ে আছে এমন এক জায়গায়, যেখানে শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা চিন্তা ও বাস্তবমুখী ইঞ্জিনিয়ারিং একসঙ্গে কাজ করছে।

এক প্ল্যাটফর্মে হারানো জিনিস ও স্ক্যাম প্রতিরোধ
বর্তমানে হারানো বা পাওয়া জিনিসের তথ্য ছড়িয়ে থাকে অসংখ্য গ্রুপ ও টাইমলাইনে। এতে যেমন সঠিক তথ্য খুঁজে পাওয়া কঠিন, তেমনি ভুয়া দাবি ও নতুন প্রতারণার ঝুঁকিও তৈরি হয়। অ্যাওয়ার এক্সওয়ান এই সমস্যার সমাধানে চালু করেছে ভেরিফায়েড আইডেন্টিটি সিস্টেম, যেখানে ব্যবহারকারীর পরিচয় যাচাই করা থাকে। ফলে কে তথ্য দিচ্ছে এবং সেই তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য-তা সহজেই বোঝা যায়।

এছাড়া রয়েছে ট্রাস্ট স্কোরিং সিস্টেম, যা ব্যবহারকারীর পূর্ববর্তী আচরণ ও অবদানের ভিত্তিতে নির্ভরযোগ্যতা নির্ধারণ করে। নিয়মিত সঠিক স্ক্যাম রিপোর্ট করা কিংবা হারানো জিনিস ফেরত দিতে সহায়তা করলে ব্যবহারকারীর ট্রাস্ট স্কোর বাড়ে, যা পুরো কমিউনিটিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।

রিয়েল-টাইম অ্যালার্টে আগাম সতর্কতা
অ্যাওয়ার এক্সওয়ান-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো রিয়েল-টাইম লোকেশনভিত্তিক অ্যালার্ট। কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় হারানো জিনিস বা অনলাইন প্রতারণার ঘটনা রিপোর্ট হলেই আশপাশের ব্যবহারকারীরা সঙ্গে সঙ্গে নোটিফিকেশন পান। এর ফলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।

বিশেষ করে অনলাইন স্ক্যামের ক্ষেত্রে এই আগাম সতর্কতা অন্যদের একই প্রতারণার শিকার হওয়া থেকে রক্ষা করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

প্রযুক্তির সঙ্গে মানবিক দায়িত্ব
অ্যাওয়ার এক্সওয়ান শুধু একটি প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি একটি সামাজিক ও মানবিক উদ্যোগ। এখানে কমিউনিটির সদস্যরাই একে অপরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। হারানো জিনিস ফেরত পাওয়া যেমন আনন্দের, তেমনি অপরিচিত কাউকে প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা করাও একটি সামাজিক দায়িত্ব-এই মূল্যবোধই প্ল্যাটফর্মটির মূল চালিকাশক্তি।

সামনে এগোনোর গল্প
এরই মধ্যে অ্যাওয়ার এক্সওয়ান-এর লক্ষ্য ও কার্যক্রম তুলে ধরে একটি সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্র প্রকাশ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে প্ল্যাটফর্মটি বিস্তারের পরিকল্পনা রয়েছে।

উদ্যোক্তাদের আশা, ব্যবহারকারী সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হারানো জিনিস উদ্ধার এবং অনলাইন প্রতারণা প্রতিরোধে অ্যাওয়ার এক্সওয়ান একটি শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল সেফটি নেটওয়ার্কে পরিণত হবে।

বিস্তারিত জানতে: awarexone.com

এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]